অভয়নগরে শালিসে বিধবাকে মারধর

আপডেট: 07:40:45 11/09/2021



img

স্টাফ রিপোর্টার: ‘গুজব ছড়ানোর’ অভিযোগে যশোরের অভয়নগর উপজেলায় শালিসে বৈঠকে এক বিধবাকে (৩৭) মারধর করার অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া তাকে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছে। বর্তমানে ওই বিধবা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন।
অভয়নগর উপজেলায় সুন্দলী ইউনিয়নের রামসরা গ্রামে গত ৩০ আগস্ট সকালে এক শালিস বৈঠকে বিধবাকে ঝাঁটা ও জুতা দিয়ে মারধরের ঘটনা ঘটে। বৈঠকে বিধবার ক্ষমা চাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ওই নারীকে শালিস বেঠকের মাঝে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাইতে বলা হচ্ছে। তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখমণ্ডলের ঘাম মুছছেন। এরপর তিনি নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করছেন। কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে চা পান করছেন সুন্দলী ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ইউনিয়ন কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সভাপতি স্বপন সরকার।
ওই নারী জানান, দশ বছর আগে তার স্বামী মারা যান। দুটি মেয়ে, সবারই তিনি বিয়ে দিয়েছেন। গ্রামের বাইরের দিকে ফাঁকা জায়গায় ঘর করে সেখানে তিনি একাই থাকেন।
তিনি বলেন, গ্রামের একটি হিন্দু মেয়ে পাশের গ্রামের একটি মুসলমান ছেলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেছে বলে এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে। মেয়েটির সাথে একই শ্রেণিতে পড়ালেখা করে গ্রামের একটি ছেলের সঙ্গে দেখা হলে তিনি গুজবের ব্যাপারে সত্য-মিথ্যা জানতে চেয়েছিলেন। ছেলেটি বিষয়টি বাড়িয়ে মাতব্বরদের কাছে নালিশ দেয়। এরপর  গুজব ছড়ানোর অপবাদ দিয়ে গত ২৯ আগস্ট রাতে স্বপন সরকার ও নীলকমল মণ্ডলের নেতৃত্বে কিছু লোক তার বাড়িতে যায়। পরদিন ৩০ আগস্ট সকালে তাকে গ্রামের চার রাস্তার মোড়ে যেতে বলা হয়। এরপর সকালে গ্রামের কয়েক লোক বাড়ি থেকে তাকে ধরে শালিস বৈঠকে নিয়ে যান। সেখানে স্থানীয় ইউপি মেম্বার তুষারকান্তি বিশ্বাস, আওয়ামী লীগ নেতা স্বপন সরকার, কলেজশিক্ষক বিকাশ মণ্ডল, স্কুলশিক্ষক নীলকমল মণ্ডলসহ দুই শতাধিক লোক উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে হঠাৎ গ্রামের নারায়ণ বৈরাগী (৪৮) নামে একব্যক্তি তাকে কয়েকটি লাথি মারেন। এরপর তার স্ত্রী অঞ্জলী বৈরাগী (৩৭), বোন হবু বৈরাগী (৫২), চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী কালী বৈরাগী (৫০) এবং অপর চাচাতো ভাইয়ের স্ত্রী ষষ্ঠী বৈরাগী (৫২) তাকে ঝাঁটা দিয়ে মারতে থাকেন। এরপর নারায়ণ বৈরাগীর মেয়ে অর্পি বৈরাগী (১৯) পা থেকে জুতো খুলে তাকে পেটান। ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে প্রকাশ্যে এমন নির্যাতন চলতে থাকে। এতে তিনি ভীত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তাকে দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে বলা হয়। চাপে পড়ে তিনি ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন। এরপর ভয়ে ও লজ্জায় তিনি বাড়ি থেকে বের হননি। একা না থাকতে পেরে তার মাকে বাড়িতে এনে রেখেছেন।
বিধবা বলেন, ‘মাতব্বররা পরে আমার বাড়িতে এসে সেদিনের ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। আমার সাথে কারোর দ্বন্দ্ব নেই। আমি কোনও গুজব ছড়াইনি। অথচ শুধু গুজব ছড়ানোর অপবাদ দিয়ে আমার ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে। আমি এর বিচার চাই। বর্তমানে আমি ভীষণ ভয়ে আছি।’
জানতে চাইলে সুন্দলী ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ইউনিয়ন কমিউনিটি পুলিশিং কমিটির সভাপতি স্বপন সরকার বলেন, ‘ভিডিওতে দেখেন আমি চা খাচ্ছি। আমি ওই সময় বিলে যাচ্ছিলাম। সেখান থেকে আমাকে মিটিংয়ে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। বিধবাকে মারধরের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। মিটিংয়ে তাকে মারধর করা হয়নি। বাড়িতে ঘরোয়াভাবে মিটিং হয়েছিল। সেখানে মারধর করা হয়।’
সুন্দলী ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য তুষারকান্তি বিশ্বাস বলেন, ‘ঘটনা ঘটেছে এটা সত্য। একটা সমস্যা হয়েছিল। বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা বসেছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে হবু বৈরাগী চড়াও হয় এবং বিধবাকে দুটো বাড়ি মারে। এরপর মেয়ের পরিবার মিটিংয়ে দোষ স্বীকার করে। তাকে এভাবে মারধর করা ঠিক হয়নি।’
তিনি দাবি করেন, মিটিংয়ে বিধবার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এরপর তিনি দোষ স্বীকার করে সবার সামনে ক্ষমা চান। ক্ষমা চাইতে তাকে বাধ্য করা হয়নি।
বিধবাকে ঝাঁটা দিয়ে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে হবু বৈরাগী বলেন, ‘যে মেয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে সে আমার ভাইয়ের মেয়ে। আর যে বিধবা অপবাদ দিয়েছেন তিনি আমার কাকাতো ভাইয়ের স্ত্রী। অপবাদ দেওয়ায় আমার ভাইয়ের মেয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। এজন্য রাগে ক্ষোভে মিটিংয়ের মধ্যে আমি আমার ভাইয়ের স্ত্রীকে ধরতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে উপস্থিত লোকজন আমাকে ঠেকিয়ে দেন। আমি তাকে মোটেই ঝাঁটা দিয়ে মারিনি।’
জানতে চাইলে সুন্দলী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বিকাশ রায় কপিল বলেন, ‘ঘটনাটি আমি পরে শুনেছি। সেদিন যা ঘটেছে তা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও নিন্দনীয়।’

আরও পড়ুন