অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু, স্বপ্ন ভেঙেছে একটি পরিবারের

আপডেট: 08:58:28 30/03/2021



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : পৌরসভার অনুমোদন না নিয়ে গোপনে দোতলা বাড়ির গাঁথুনির কাজ করাচ্ছিলেন মণিরামপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অফিসের পেছনের বাসিন্দা আব্দুল হক।
মণিরামপুর বাজারের বড় ওষুধের দোকান আসমা ড্রাগ হাউজের মালিক তিনি। একতলা বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে গেছে পল্লী বিদ্যুতের উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন সংযোগের তার। কোনো দক্ষ রাজমিস্ত্রি ঝুঁকি নিয়ে সেখানে কাজ করতে চাননি। অবশেষে উপজেলার শেখপাড়া খানপুর এলাকার রাজমিস্ত্রি আল আমিন (২৫), মামুন হোসেন (১৯) এবং অন্য এক শ্রমিক দিয়ে চলছিল আব্দুল হকের বাড়ির কাজ।
৩-৪ দিন কাজ চলার পর বিপত্তি ঘটে ২৩ মার্চ বিকেল তিনটার দিকে। দোতলার লিন্টেলের কাজের জন্য রড বাঁধাই করে ওপরে তুলতে গিয়ে ছাদের উপর দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের তারে স্পর্শ করে রড। বিকট শব্দে ধরে ওঠা বিদ্যুতের আগুনে দগ্ধ হন মামুন। একইসাথে আহত হন আল-আমিন। তাদের উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। তখন তাদের যশোর জেনারেল হাসপাতালে রেফার করেন জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আলমগীর হোসেন সুমন। দুইদিন পর আল-আমিন বাড়ি ফিরে আসেন। গুরুতর অবস্থায় ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয় মামুনকে। সেখানে শনিবার (২৭ মার্চ) রাতে মৃত্যু হয় দগ্ধ মামুনের। এরপর ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ বাড়িতে এনে রোববার রাতে দাফন সম্পন্ন করা হয়।
মামুন উপজেলার শেখপাড়া খানপুর গ্রামের নাজির আহম্মেদের ছেলে। অসুস্থ ও দরিদ্র বাবা-মায়ের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন তিনি। মামুনের দিনে ৪০০ টাকার আয়ে চলত সংসার। তাকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখতেন বাবা নাজির আহম্মদ ও মা সুফিয়া খাতুন। একমাত্র ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন তারা। ছেলে হারানোর বেদনায় বারবার মূর্চ্ছা যাচ্ছেন। তবে একমাত্র ছেলের মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করছেন না মামুনের পরিবার। ঘটনাটিকে নিজেদের ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছেন।
মঙ্গলবার (৩০ মার্চ) বেলা সাড়ে ১১টায় মামুনের বাড়িতে গিয়ে লোকজনের ভিড় চোখে পড়ে। আত্মীয়-স্বজন পাড়াপড়শিরা সন্তানহারা বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে এসেছেন। সেখানে ছিলেন বাড়ির মালিক আব্দুল হক। কথা বলার ফাঁকে কেঁদে উঠছেন মামুনের মা সুফিয়া খাতুন।
তিনি বলেন, ‘ছেলেরে বিয়ে দিতে চাইছি। তার মধ্যি ও চলে গেল। আমার ছেলের মৃত্যু এভাবে লেখা ছিল।’
একই কথা মামুনের বাবা-চাচাদের। তারা মামুনের বাবা নাজির আহম্মদকে আব্দুল হকের হাতে তুলে দিয়েছেন। মামুনের বাবাও বিনা ক্ষতিপূরণে আব্দুল হকের সাথে সমঝোতা করে নিয়েছেন।
আব্দুল হক বলেন, ‘মামুনের চিকিৎসার সব খরচ দিয়েছি। তার কাফনের কাপড় পর্যন্ত কিনে দিয়েছি। এখন থেকে তারা আমার পরিবারের একটা অংশ। তাদের দায়িত্ব আমার।’
স্বজনদের দাবি, শরীরে নানা রোগ বাসা বাঁধায় কোনো কাজ করতে পারেন না নাজির আহম্মদ। মামুন যা আয় করতো, তাতে কোনোরকম চলে যেত। এখন তিনি নেই। তাদের ভরসার খুঁটি ভেঙে গেছে। বাড়ির মালিক আব্দুল হক যে দায়িত্ব নিয়েছেন সেটা যেন তিনি ঠিকমতো পালন করেন।
স্থানীয়রা বলছেন, আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে একটি তাজা প্রাণের মূল্য হয় না। মামুনের পরিবার সেটা বুঝেছেন। তবে বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে মালিক বা শ্রমিকদের আরো সচেতন হওয়া দরকার। কঠোর হওয়া দরকার পল্লী বিদ্যুৎ বা পৌর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্টদের। কারণ প্রায়ই এমনিভাবে মামুনের মতো অনেক শ্রমিককে বিদ্যুতের আগুনে দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে যেতে হয়। কাটাতে হয় মানবেতর জীবন। স্বপ্ন ভাঙে অসহায় অনেক পরিবারের।
দুই পক্ষের মধ্যস্থতাকারী মণিরামপুর পৌরসভার কামালপুর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বাবুল আকতার বলেন, আব্দুল হকের বাড়ির একতলা পর্যন্ত অনুমোদন ছিল। দোতলার অনুমোদন নেই। হকের দোতলার কাজ করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পর্শে আহত মামুনের চিকিৎসার সব খরচ দিয়েছেন হক। মামুন মারা যাওয়ার পর তার স্বজনরা ময়নাতদন্ত ছাড়া লাশ ফেরত চেয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী তার লাশ বাড়িতে এনে দাফন করা হয়েছে। কোনো সমস্যায় পড়ে মামুনের বাবা-মা আব্দুল হকের কাছে এলে তাদের সহায়তা দেওয়ার জন্য তাকে বলা হয়েছে।
স্থানীয় খানপুর ইউপি চেয়ারম্যান গাজী মোহাম্মদ বলেন, ‘সকালে আব্দুল হক লোকজন নিয়ে আমার কাছে এসেছিলেন। আমি তাকে মামুনের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি। দুস্থ হলেও মামুনের পরিবারের মতো ভালো পরিবার ওই মহল্লায় নেই। ওরা মামলা করতে চায়নি।
যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ মণিরামপুর সদর দপ্তরের জেনারেল ম্যানেজার অরুণ কুণ্ডু বলেন, ‘যেখানে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে ওই বাড়ির ছাদের ওপর দিয়ে ৩৩ হাজার ভোল্টেজ ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ অতিক্রম করেছে। নিয়ম অনুযায়ী পল্লীবিদ্যুৎ সংযোগ হতে কমপক্ষে দশ ফুট দূরত্বে ঘর নির্মাণ করতে হবে। বাড়ির মালিক সেটা অমান্য করে কাজ করাচ্ছিলেন। ঘটনাটি শোনামাত্র আমরা সতর্কতার জন্য মাইকিং করেছি। ওইঘর আর না গাঁথার জন্য বাড়ির মালিককে চিঠি করা হবে।’

আরও পড়ুন