রঙিন মাছে কোটিপতি

আপডেট: 11:00:51 24/09/2021



img
img
img

কে এম আনিছুর রহমান, কলারোয়া (সাতক্ষীরা): একেক মানুষের একেক রকম শখ। কারও ফুল চাষ, কারো কৃষি কাজ, কারও পাখি পালন করতে ভালো লাগে। আবার অনেকেই অ্যাকুরিয়ামে রঙিন মাছ পোষেন। এই শৌখিন বিষয়টি একান্তই ভালো লাগার। কিন্তু কখনও কখনও এটাও হয়ে ওঠে জীবন সংসারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এমন একজন শৌখিন মানুষ সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ব্রজবাক্স গ্রামের মৃত আব্দুল হাকিমের বড় ছেলে সাইফুল্লাহ গাজি। রঙিন মাছ চাষ করে পাল্টে গেছে তার জীবন। অর্থ উপার্জনের পাশাপাশি তাকে দেশব্যাপী পরিচিতিও এনে দিয়েছে। এখন তাকে সবাই চেনেন ‘রঙিন মাছের কারিগর’ হিসেবে।
পানিতে ভাসছে নানা রঙের মাছ। লাল, নীল, কমলা, কালো, বাদামি, হলুদ রঙের মাছের ছড়াছড়ি। গোল্ড ফিশ, কমেট, কই কার্ভ, ওরেন্টা গোল্ড, সিল্কি কই, মলি, গাপটি, অ্যাঞ্জেল প্রভৃতি বর্ণিল মাছ দেখলে চোখ জুড়ায়, মন ভরে যায়।
কলারোয়ার তরুণ উদ্যোক্তা সাইফুল্লাহ গাজী রঙিন মাছের চাষ তার জীবনকে রাঙিয়েছেন। সাইফুল্লাহ মাত্র ৬২০ টাকা নিয়ে অ্যাকুরিয়াম মাছের চাষ শুরু করেন। আর সেই মাছ চাষ তাকে আজ বানিয়েছে কোটিপতি। এক সময় বিদেশ থেকে আমদানি করা অ্যাকুরিয়াম মাছ শৌখিন ব্যক্তিদের বাসা-বাড়িতে শোভা পেত। কিন্তু উদ্যমী সাইফুল্লাহর চেষ্টায় দেশেই তা উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
সাইফুল্লাহ গাজির কারবারে বর্তমানে দেড় কোটি টাকা মূলধন। ২০টি পুকুরে বিভিন্ন প্রকারের অ্যাকুরিয়ামের মাছ চাষ করছেন তিনি। বিশাল মূলধন খাটানোর পাশপাশি ৫০ জন বেকারের কর্মসংস্থান করেছেন সাইফুল্লাহ।
প্রতিদিন সকালে পাত্রে শব্দ করে মাছকে খাওয়ার দাওয়াত দেন সাইফুল্লাহ। শব্দ শুনে পুকুরের এক কিনারে জমা হয় সব রঙিন মাছ। এরপর খাবার ছিটিয়ে দিলেই নিমিষেই সেগুলো সাবাড় করে তৃপ্ত হয় মাছেরা। সাইফুল্লাহ ও তার স্ত্রী জেসমিন সুলতানার ডাক ও মাছেদের সাড়া দেওয়ার এক অপূর্ব দৃশ্য দেখে অবাক স্থানীয়রা ছাড়াও মাছ ব্যবসায়ীরা।
সফল উদ্যোক্তা সাইফুল্লাহ গাজী বলেন, ‘বাবা-মায়ের সাত ছেলে-মেয়ের মধ্যে আমি বড় ছেলে। সংসারে খুব অভাব থাকায় বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারিনি। একপর্যায়ে ১৯৯৭ সালে অভাবের তাড়নায় প্রতিবেশি দেশ ভারতে কাজে যাই। সেখানে টেক্সটাইল মিলে কাজ করার পাশাপাশি একটি গ্রামীণ এলাকায় যাই। সেখানে বেশ কয়েকটি পুকুরে নানা রঙের মাছ চাষ দেখতে পাই। দুই বছর সাত মাস পর ১৯৯৯ সালে দেশে ফিরে এসে রঙিন মাছের চাষ নিয়ে বাড়িতে আলাপ- আলোচনা করি। কিন্তুকেউ সম্মতি দেয়নি।’
‘উপায়ন্তর না পেয়ে ওই বছর আবার বাড়ি ছাড়ি। ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে কাজ শুরু করি। কিন্তু পর্যাপ্ত আয় হতো না। তখন মিরপুর-১৩ নাম্বারে একটি অ্যাকুরিয়াম মাছের দোকান চোখে পড়ে। আবার আগ্রহ তৈরি হয় এই মাছ চাষের প্রতি। কিন্তু মূলধন তো ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘মাসের বেতনের টাকার মধ্যে ৬২০ টাকা হাতে ছিল। সেই টাকায় পরেশ নামে এক বন্ধুর কাছ থেকে ২০০৪ সালে কয়েকটি মাছ নিয়ে বাড়িতে রওনা হই। বাড়িতে অ্যাকুরিয়ামের মাছগুলোকে এনে মাটিতে রিং স্লাব বসিয়ে পালন করা শুরু করি। এক সময় মাছগুলো ডিম দেয়। কিন্তু পুরুষ মাছের অভাবে ডিমগুলো থেকে বাচ্চা উৎপন্ন হচ্ছিল না। এভাবেই অ্যাকুরিয়াম মাছ চাষ শুরু।’
সাইফুল্লাহ গাজি বলেন, প্রথমে দশ রকমের মাছ আনলেও নয় ধরনের মাছকেই বাঁচানো যেত না। তবে পাঁচ বছরের অক্লান্ত সাধনায় নয় ধরনের মাছ বাঁচাতে সক্ষম হই। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ৬২০ টাকার মূলধন এখন দেড় কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০টি পুকুর এবং ৮৮টি হাউজে ২৬ প্রজাতির মাছ চাষ করা প্রজেক্টে এখন ৫০ জন শ্রমিক কাজ করছেন।’
তিনি জানান, তার চাষ করা অ্যাকুরিয়াম মাছ ঢাকার কাঁটাবন, খুলনা ও রাজশাহীসহ দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। রঙিন মাছের জন্য দেশের সবচেয়ে বড় বাজার রাজধানীর কাঁটাবনের ব্যবসায়ীদের অনেকেই তার কাছ থেকে রঙিন মাছ নিয়ে যান। এ ছাড়া খুলনার মাছ ব্যবসায়ী বকুল, রবিন, যশোরের নয়ন, দীপক, অসীম, সাতক্ষীরার রুহুল আমিনসহ দেশের অনেক ব্যবসায়ী তার কাছ থেকে রঙিন মাছ সংগ্রহ করেন।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশ মাছ রফতানি করার ইচ্ছা রয়েছে সাইফুল্লাহর। পাশাপাশি দরকার বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা। ইতিমধ্যে সাইফুল্লাহ রঙ বদলিয়ে ‘সিল্কি’ নামে একটি মাছ উদ্ভাবন করেছেন। অনেকটা জরির মতোই দেখতে সেগুলো। সে জন্যই নাম দিয়েছেন সিল্কি। রঙ পরিবর্তন করা এ মাছের চাহিদাও রয়েছে। তবে প্রযুক্তির অভাবে পরিপূর্ণ চাষ করতে পারছেন না। সরকারের তরফ থেকে প্রযুক্তি পেলে আরও ভালো কিছু করতে পারতেন তিনি।
সাইফুল্লাহ জানান, বর্তমানে ২০টি পুকুর লিজ নিয়ে রঙিন মাছ চাষ করছেন। প্রতিটি মাছ সর্বনিম্ন দশ আর সর্বোচ্চ ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এই ব্যবসাকে ঘিরেই বড় ছেলের নামে ‘রেজা অ্যাকুরিয়াম ফিস’ নামে একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাচ্ছেন।
সাইফুল্লাহর স্ত্রী জেসমিন সুলতানা বললেন, ‘২০০৪ সালে মাত্র ছয় জোড়া পোনা মাছ দিয়ে আমরা চাষ শুরু করি। সেই থেকে স্বামীর সঙ্গে মাছ চাষে সহযোগিতা করে আসছি। ব্যবসা বাড়াতে তখন হাতে টাকা ছিল না। পরে ঢাকা আহছানিয়া মিশন থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে মাছ চাষ সম্প্রসারণ করি। এখন আমার স্বামী একজন সফল উদ্যোক্তা। আমার স্বামীর মতো সারা দেশে রঙিন মাছ চাষের প্রায় দুই হাজার ৬০০ উদ্যোক্তা রয়েছে। বর্তমানে আমরা দুই ছেলেকে নিয়ে আল্লাহর ইচ্ছায় খুবই ভালো আছি।’
সাইফুল্লাহর কাছ থেকে উৎসাহ পেয়ে একই গ্রামের আব্দুল মাজেদ, বাবু, সেন্টু ও ঘেনা নামে কয়েক ব্যক্তি রঙিন মাছ চাষ করছেন। তারা বলছেন, পুকুরের পরিবেশ একটু ভালো রাখলে, চুন ব্যবহার করলে, স্বচ্ছ পানি থাকলে এবং জীবাণুমুক্ত পানি হলে সেখানে রঙিন মাছ উৎপাদন করা যায়। কিচিং গোরামি, মিল্কি কই কার্প, কই কার্প ও কমিটিসহ ২৫-২৬ প্রজাতির রঙিন মাছ তারা উৎপাদন করছেন।
তারা বলেন, সহজ শর্তে ব্যাংক থেকে ঋণ পেলে এ ব্যবসা আরো সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
বিদেশ থেকে রঙিন মাছ আমদানি করে পপুলার অ্যাকুরিয়াম সেন্টার নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এর অংশীদার শহীদুল ইসলাম জানান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর থেকে রঙিন মাছ আমদানি করা হয়। আগে মাসে ১০০ রঙিন মাছের কার্টন আমদানি করতেন। এখন ৩০ থেকে ৪০ কার্টন মাছ আমদানি করছেন। কারণ দেশেই এখন রঙিন মাছ উৎপাদন হচ্ছে। দামও অনেক কম।
তিনি আরো বলেন, বিদেশের এক জোড়া গোল্ড ফিশের দাম পড়ে দুই হাজার টাকা। চিংড়ির জোড়া ৬০০ টাকা। এর বেশি দামও আছে। তা ছাড়া ওই সব রঙিন মাছের খাবারের দামও বেশি। তাই মানুষ এখন দেশে উৎপাদিত রঙিন মাছ বেশি কিনছে।
কলারোয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রবীন্দ্রনাথ এই উদ্যোগকে ‘ভালো’ উল্লেখ করে বলেন, ‘এর চাষপ্রণালি অন্য মাছের মতো। শুধু আলাদা কিছু খাবার দিতে হয়। রঙিন মাছের চাহিদা থাকায় খামারিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। আমরাও চাষিদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।’