সাতক্ষীরার শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি

আপডেট: 03:28:06 22/09/2021



img
img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরায় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনায় পানি উঠে গেছে। পানিতে থই থই করছে জেলার সাত উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। স্কুল খোলার আনন্দে শিক্ষার্থীরা নতুন করে প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু সেই আনন্দে ছাই দিয়েছে আশ্বিনের বৃষ্টি। গেল রোববার রাতের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে সাতক্ষীরা জেলার সাত উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জেলা সদরের ভোমরা রাশেদা বেগম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ছাপিয়ে পানি উঠেছে শ্রেণিকক্ষে। বিদ্যালয়টির নিচতলা সম্পূর্ণ পানিতে নিমজ্জিত। মাঠের কোমরপানি পার হয়ে শ্রেণিকক্ষে যাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। সিঁড়ির গোড়া পর্যন্ত পানি উঠে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের দোতলায়ও ক্লাস নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে অন্য কোনো স্থানে ক্লাস করানোর কথা ভাবছে শিক্ষা অফিস। কিন্তু কাছাকাছি কোনো ভবন না থাকায় তাও আপাতত সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে, সাতক্ষীরা শহরে নারীদের উচ্চ শিক্ষার একমাত্র বেসরকারি কলেজ ছফুরননেছা মহিলা কলেজ। কলেজটি বর্তমানে পানিতে ভাসছে। সামান্য একটু বৃষ্টি হলেই কলেজের শ্রেণিকক্ষে জমছে হাঁটুপানি। এই কলেজের সামনে (সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ সড়ক) সড়ক বিভাগের জায়গা অবৈধভাবে দখল করে কিছু ভূমিহীন নামধারী মানুষ পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে সেখানে গড়ে তুলেছেন বসতবাড়ি। ফলে সামান্য একটু বৃষ্টি হলেই কলেজের শ্রেণিকক্ষ পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।
জেলা শহরের একমাত্র বেসরকারি মহিলা কলেজের এই বেহালদশা যেন দেখার কেউ নেই।
সাতক্ষীরা শহরের ইটাগাছা-বাঁকাল এলাকায় প্রতিষ্ঠিত ছফুরননেছা মহিলা কলেজ। এখানে এইচএসসি থেকে শুরু করে অনার্স পর্যন্ত ছাত্রীরা লেখাপড়া করছেন। কলেজ চত্বরে শুধু নয়, শ্রেণিকক্ষের ভেতরে জমে আছে হাঁটুপানি। চারিদিকে চরে বেড়াচ্ছে পোকা-মাকড় ও সাপ। শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাপড়-চোপড় গুটিয়ে ঢুকছেন কলেজের মধ্যে। নারী শিক্ষক ও ছাত্রীরা তাদের পরিধেয় বস্ত্র গুটিয়ে মেইন ফলট দিয়ে কলেজের ভিতরে প্রবেশ করছেন।
ছফুরননেছা মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আশরাফুন নাহার জানান, সামান্য বৃষ্টি হলেই কলেজের ভেতরে হাঁটুপানি জমছে। পানি নিষ্কাশনের সব পথ বন্ধ। শিক্ষার্থীরা সাংঘাতিক কষ্ট পাচ্ছে। অফিসের যাবতীয় কাগজপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। জরুরিভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা দরকার। কলেজের মাঠ উঁচু করা প্রয়োজন।
বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য সাতক্ষীরা সদর আসনের সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি আরও বলেন, ‘জেলা শহরে নারীদের উচ্চ শিক্ষার জন্য একমাত্র বেসরকারি কলেজ এটি। প্রত্যাশা করছি এই প্রতিষ্ঠানের দিকে সবাই নজর দেবেন। কলেজের নানাবিধ সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছফুরননেছা মহিলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সাতক্ষীরার বিশিষ্ট সমাজসেবক আব্দুল মুতালেব ২০০২ সালে মারা যাওয়ার পর অধিকাংশ সময় ক্ষমতাসীন দলের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ প্রভাবশালী নেতারাই কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। কলেজের ঠিক সামনে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের ব্যাপারে কলেজ প্রশাসন বার বার সভাপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও অজ্ঞাত কারণে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
এই প্রতিষ্ঠানের বর্তমান সভাপতি সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির। ছাত্রীদের দাবি, কলেজের এসব দুর্ভোগ লাঘবে জেলা প্রশাসক জরুরি পদক্ষেপ নেবেন।
এদিকে, সাতক্ষীরা সদরের মাছখোলা হাইস্কুল, মাছখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিতে ডুবে আছে কয়েক মাস। এতদিন স্কুল বন্ধ থাকায় সমস্যা হয়নি। সম্প্রতি স্কুল খুলে দেওয়ার পর দোতলায় ক্লাস নেওয়া হচ্ছে বলে জানান জেলা শিক্ষা অফিসার এসএম আব্দুল্লাহ আল মামুন।
অন্যদিকে, জেলা সদরের বড়দল প্রাইমারি স্কুলের অবস্থাও একই। সেখানেও জমেছে পানি।
জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার নলতা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নলতা মোবারকনগর বাজার ও তৎসংলগ্ন এলাকা পানিতে ডুবে গেছে।
নলতা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মোনায়েম বলেন, এক রাতের বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে নলতা হাইস্কুল, কেবি আহছানিয়া জুনিয়র স্কুল, নলতা শরিফের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও রাস্তাঘাট।
তিনি আরও বলেন, পানি নিষ্কাশনের পথ দখল করে মাছের ঘের করার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে পানিতে নিমজ্জিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। কবে নাগাদ সম্ভব হবে তা-ও অনিশ্চিত।
শিক্ষক হাবিবুর রহমান বলেন, মঙ্গলবার ভ্যানে চড়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পানি পার হয়ে স্কুলের বারান্দায় পৌঁছায়। পানি পার হতে না পেরে অনেকেই বাড়ি ফিরে যায়।
কালিগঞ্জ উপজেলার ভদ্রখালি প্রাইমারি স্কুলের মাঠে হাঁটুপানি। পানি ঢুকেছে শ্রেণিকক্ষেও। ফলে সেখানেও ক্লাস করা অসম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আশাশুনির প্রতাপনগর ফাজিল মাদরাসা, প্রতাপনগর ইউনাইটেড অ্যাকাডেমি, কল্যাণপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কুড়িকাহুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুড়িকাহুনিয়া মহিলা মাদরাসা, প্রতাপনগর মহিলা মাদরাসা, কল্যাণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, প্রতাপনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পানিতে ডুবে গেছে বলে জানান সাইদুল ইসলাম, মিলন বিশ্বাস, রুহুল আমিনসহ স্থানীয় অনেকেই। তারা জানান, স্থানীয় প্রতাপনগর তালতলা জামে মসজিদ, কুড়িকাহুনিয়া পাঞ্জেগানা মসজিদ ও উপজেলাগামী প্রধান সড়ক এবং গড়ইমহল খালের কাঁঠালতলা রাস্তাটি পানিতে নিমজ্জিত। এতে করে কুড়িকাহুনিয়া, শ্রীপুর, দৃষ্টিনন্দন, গোয়ালকাটি, সনাতনকাটি, গোকুলনগর, নাকনাসহ সাত গ্রামের মানুষ নৌকায় যাতায়াত করছেন। এলাকার কবরস্থানগুলোর ওপরে কোমরসমান পানি। এছাড়া গড়ইমহল খালের ধারের শ্মশানটিও বিলীন হয়ে গেছে। এতে করে এলাকার চার গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বী মৃত মানুষের দাহ করার কোনো জায়গা নেই।
এদিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা পরিষদ চত্বর, বিজিবি ক্যাম্প, ঋশিল্পী, বিসিক শিল্পনগরীসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। পানি থই থই করছে এসব সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে।
সাতক্ষীরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার এসএম আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, একদিনের ভারি বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস করানো সম্ভব হচ্ছে না। বিকল্প ব্যবস্থায় ক্লাস করা যায় কি-না সে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জেলার শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, আশাশুনি, দেবহাটা, তালা ও কলারোয়ার নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খোঁজ নেওয়া হয়েছে। কালিগঞ্জের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি উঠে গেছে। পানি নিষ্কাশন না হলে এসব প্রতিষ্ঠানে ক্লাস করা কঠিন।
জেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, শুধু হাইস্কুল নয়, মাদরাসা ও প্রাইমারি স্কুলও জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

আরও পড়ুন