‘সাজানো’ শিশু ধর্ষণ মামলা নিয়ে নড়াইলে তোলপাড়

আপডেট: 10:06:49 22/09/2020



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : শিশু ধর্ষণের অভিযোগ দিয়ে রুজু করা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ১৬ বছরের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী অপু বিশ্বাস নামে এক কিশোরকে। এই ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে বিচিত্র তথ্য।
পরিবার ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, একটি চক্র মামলার ভয় দেখিয়ে অভিযুক্ত কিশোরের পরিবারের কাছ থেকে মোটা টাকা হাতিয়ে নিতে গভিররাতে কথিত ধর্ষককে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। চক্রটি সংসদ সদস্য মাশরাফি ও নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের নাম ভাঙিয়ে এই অপকর্ম করেছে বলে অভিযোগ।
এদিকে, নড়াইল সদর হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ড শিশুটির শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পায়নি। এই মর্মে প্রতিবেদন জমা হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয় চক্রটি। ধর্ষণের রিপোর্ট পজেটিভ করতে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসারকে চাপ প্রয়োগ করে, না পেরে উল্টো চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে উৎকোচের অভিযোগ তুলে মানববন্ধনও করে। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ চিকিৎসকরা ১৫ সেপ্টেম্বর সাংবাদিক সম্মেলন করেন। গত ২০ দিন ধরে নড়াইলে শিশু ধর্ষণের এই কাহিনি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হচ্ছে।
৩০ আগস্ট বেলা ১১টায় নড়াইল পৌর এলাকার উজিরপুরে চার বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ তোলা হয়। ওইদিন রাত সাড়ে ১১টায় শিশুটিকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর আগে রাত নয়টার দিকে কথিত ধর্ষণের ঘটনা মীমাংশার জন্য শালিস করার চেষ্টা করেন স্থানীয় কয়েকজন। শালিসে আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে রাসেল বিল্লাহ ও সাকিব নামে দুই যুবক ‘এমপি মাশরাফির লোক’ পরিচয়ে অভিযুক্ত অপু বিশ্বাসকে বাড়ি থেকে ধরে এনে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
এলাকাবাসী জানান, শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে রাসেল বিল্লাহ ও সাকিব রাত একটার দিকে আবার অপু বিশ্বাসের বাড়িতে যান। তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চান। কিন্তু পরিবারের লোকেরা ভয়ে বাইরে আসেননি।
রাত সাড়ে এগারটার দিকে রাসেল বিল্লাহ কয়েকজন সাংবাদিকের উপস্থিতিতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসককে নানা ভয় দেখিয়ে ধর্ষণের আলামত আছে- এমন বক্তব্য দিতে বাধ্য করেন। জরুরি বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক সুব্রত নাগ বলেন, ‘আমি বলেছি, ধর্ষণের আলামত থাকতে পারে। তবে এই ব্যাপারে পরীক্ষা না করে আমার পক্ষে বক্তব্য দেওয়া সম্ভব না। মিডিয়ায় আমার খণ্ডিত বক্তব্য প্রচার করা হয়েছে। রাসেল বিল্লাহ আমাকে বক্তব্য দিতে বাধ্য করেছে।’
৩১ আগস্ট ডাক্তারি পরীক্ষায় শিশুটির শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পায়নি সদর হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ড। রাসেল বিল্লাহ ওই সময় আবাসিক মেডিকেল অফিসারকে ধর্ষণের পজেটিভ রিপোর্ট করতে হুমকি দেন বলে অভিযোগ।
নড়াইল সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মশিউর রহমান বাবু বলেন, ধর্ষণের রিপোর্ট করতে গাইনি, প্যাথলজিসহ চারটি বিভাগের পরীক্ষা প্রয়োজন হয়। সেই অনুযায়ী পরীক্ষা করে শিশুটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে- এমন কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
সরেজমিন ১৭ ও ১৯ সেপ্টেম্বর ঘটনা অনুসন্ধানে জানা যায় নানা তথ্য। মামলার তিন স্বাক্ষীর মধ্যে দুইজন প্রতিবেশী, একজন কথিত ধর্ষিত শিশুটির ফুফু।
এক নম্বর স্বাক্ষী সাগরী (৩০) বলেন, ‘‘কাতেবর চাচাকে বললাম, আমি কিছু জানি না। আমাকে স্বাক্ষী করেছেন কেন?’ উনি বললেন, ‘ক্যান তোরা কিছু বলতে পারবি না?’ তখন আমি বললাম, ‘আপনার মেয়ের তো কোথাও কোনো কাটা-ছিড়া, ফোলা দেখলাম না। তা আমি কি মিথ্যা স্বাক্ষী দেবো?’ উনি আমাকে বললেন, ‘তোদের নাম কেটে দেবো।’’
দুই নম্বর স্বাক্ষী রিক্ত (৩২) বলেন, ‘এটি একটি মিথ্যা ঘটনা সাজানো হয়েছে। সারাদিন মেয়েটি সুস্থ হয়ে আমাদের সামনে দিয়ে খেলে বেড়ালো, অথচ রাতে মেয়েটিকে হাসপাতালে ভর্তি করলো। কী মনে করে তারা ধর্ষণের মামলা দিলো জানি না। পরদির শুনলাম আমাকে স্বাক্ষী করা হয়েছে।’
কাতেবর মোল্যা ও তার স্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। বাড়িতে তালা। একটু পরে কথিত ধর্ষণের শিকার শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে মামলার তিন নম্বর স্বাক্ষী আনজিরা আসলেন। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি সাজানো না। তবে মেয়েটির যে রকম হবার কথা ছিল, সেরকম কিছু হয়নি।’
কাতেবর মোল্যার মেজ ভাই শাহাদত মোল্যা বলেন, ‘সারাদিন মেয়েটি খেলে বেড়ালো আর সন্ধ্যায় শুনলাম সে ধর্ষিত হয়েছে। আমি ছোটভাই কাতেবরকে বলেছিলাম, তুমি ধর্ষণের মামলা করতে যেও না। কিন্তু সে আমার কথা শুনলো না।’
মেজ ভাইয়ের স্ত্রী আখিরন নেছা বলেন, ‘মেয়েটি সারাদিন আমাদের বাড়িতে খেলেছে। যে ছেলেটির নামে অভিযোগ, সে হাবাগোবা। সারাদিন ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে মোবাইলে গেম খেলে। আমার দেবর এই ছেলেটির নামে মিথ্যা মামলা করেছে। সারাদিন কিছু শুনরাম না, রাতে শুনলাম অপুকে ধরে নিয়ে গেছে।’
সরেজমিনে দেখা যায়, অপু বিশ্বাসের বাড়িতে চলছে হাহাকার। বৃদ্ধা দাদি উঠানে বসে কান্নাকাটি করছেন। বিলাপ করে বলছেন, ‘আমার পাগল নাতিটাকে ওরা জোর করে নিয়ে গেল। সে বাড়িতে ছাড়া খেতে পারে না। আমি এতো করে বললাম, আমার আধপাগলা নাতিটাকে তোমরা নিও না। তারা নিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দিলো।’
ধর্ষণ মামলার আসামি অপু বিশ্বাসের বড়ভাই সজীব বিশ্বাস বলেন, ‘কয়েক বছর আগে আমাদের কাছ থেকে চার শতক জমি কেনে। কিন্তু সেই জমির টাকা শোধ করে না। টাকা চাইলে নানা টালবাহানা করে। এখন আমার ভাইয়ের নামে ধর্ষণ ঘটনা সাজিয়ে আমাদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেবার চেষ্টা করছে।’
অপুর বাবা শিশির বিশ্বাস বলেন, ‘‘আমার ছেলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। এলাকার সবাই তারে ‘পাগল’ বলে ডাকে। আমার ছেলের বয়স বাড়িয়ে তার কাছ থেকে পুলিশ জবানবন্দি নিয়েছে। আমার ছেলেকে ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় জড়ানো হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।’’
নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম অনিক বলেন, ‘আমাদের সংগঠন এবং মাশরাফির নাম ভাঙিয়ে যদি কেউ রাত-বিরাতে কোনো অন্যায় কাজের সাথে যুক্ত হয়, তাহলে বিষয়টির অবশ্যই প্রতিবাদ করছি। আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
এদিকে এ ঘটনায় মাশরাফির নাম ভাঙিয়ে আসামি করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ধর্ষণ ঘটনায় অনুসন্ধান চালানো স্থানীয় সাংবাদিক কাজী আনিসকে ফোনে হুমকি দেন রাসেল বিল্লাহ। একটি ভিডিও আপলোড করা নিয়ে ওই সাংবাদিককে তার পেশা নিয়ে কটূক্তি করে ভিডিও আপলোড করায় তিরস্কার করেন রাসেল।’
এই ঘটনার নেপথ্যে থাকা রাসেল বিল্লাহ ধর্ষণের রিপোর্ট পজেটিভ করতে চিকিৎসকদের চাপ দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন। বলেন, ‘আমি শুধু জরুরি মেডিকেল অফিসাসের পজেটিভ রিপোর্ট কীভাবে নেগেটিভ হলো- এটাই আরএমও-কে জিজ্ঞেস করেছি।’
রাত একটায় আসামি অপু বিশ্বাসের বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারে তার বক্তব্য, ‘সহানুভূতি দেখাতে গিয়েছিলাম।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কথিত ধর্ষণ মামলার আসামি অপু বিশ্বাস একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। স্থানীয় উজিরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র সে। তার জন্ম ২০০৪ সালের ১০ জুন। চলতি বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি সিভিল সার্জন অফিসের চিকিৎসক ডা. অলোককুমার বাগচী স্বাক্ষরিত প্রতিবন্ধী আবেদনপত্রে তাকে ‘বুদ্ধি প্রতিবন্ধী’ মর্মে শনাক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ডা. অলোককুমার বাগচী বলেন, ‘আমি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি, অপু বিশ্বাস একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। তাই তাকে ওই সনদ দেওয়া হয়েছে।’
কাতেবর মোল্যার ভগ্নিপতি আলী হাসান খন্দকার বলেন, ‘আমি আর এলাকার কাউন্সিলর রাজু একটি মীমাংশার কথা বলেছিলাম। এতবড় ঘটনা, এটাতো এমনি মাফ করা যায় না। কিন্তু সেটাতে শিশির বিশ্বাস রাজি না হওয়ায় আমরা মামলা করেছি।’
সকালের ঘটনায় মেয়েকে রাতে হাসপাতালে ভর্তি করালেন কেন? এমন প্রশ্ন করা হয় মামলার বাদী কাতেবর মোল্যাকে।  জবাবে তিনি বলেন, ‘ওই দিন বিকেলে আমি বাড়ি আসার পরে মেয়ের শরীর খারাপ দেখে ঘটনা শুনতে পারি।’
তবে মীমাংশার উদ্যোগের কথা স্বীকার করেন তিনি। জানান, ‘চারবার আমি শিশির বিশ্বাসকে ডাকতে গেছি। আমার কথা তারা কানেই তোলেনি।’
নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘এলাকার কিছু লোক আসামিকে ধরে দিয়েছে। আমরা প্রতিবন্ধী জানতে পেরে তার সাথে সেইভাবে ব্যবহার করেছি। আর ১৬১ ধারায় থানায় প্রত্যেকেরই জবাববন্দি নেওয়া হয়।’
বয়স প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটা বাদী তার এজাহারে উল্লেখ করেছে। পুলিশের চার্জশিট পর্যন্ত অপেক্ষা করেন।’

আরও পড়ুন