‘টপ সয়েল’ কাটায় অনুর্বর হচ্ছে ফসলি জমি

আপডেট: 09:49:38 08/03/2021



img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি: চুয়াডাঙ্গা জেলার ৯০টি ইটভাটায় ৩ লাখ ঘণফুট মাটি পুড়িয়ে উৎপাদন হচ্ছে ৪০ কোটি ৫০ লাখ ইট। জমির উপরি ভাগের মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রির মহাযজ্ঞ চলায় ফসলি জমি উর্বরা শক্তি হারাচ্ছে। অবৈধভাবে মাটি কেটে বিক্রি করার অপরাধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে অর্থদণ্ডের ছাড়া আর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই।
ইট পোড়ানো মৌসুমে ইটভাটা মালিকরা প্রশাসনসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করছে এক কোটি ৯৫ লাখ ২১ হাজার টাকা।
ইটভাটা রয়েছে এমন কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গ্রামগুলো ধোঁয়া আর ধুলোয় একাকার হয়ে গেছে। কয়লার পরিবর্তে যথেচ্ছ পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। অবৈধভাবে মাটি কেটে ট্রাক্টরে বোঝায় করে প্রধান সড়কের ধারে পাহাড়ের মত স্তুপ করে রাখা হয়েছে। এতে করে প্রধান সড়কে চলাচলে বিঘ্ন অযোগ্য ঘটছে।
বাংলাদেশ ইট প্রস্তুতকারক মালিক সমিতি চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব জানান, জেলায় ৯০টি ইটভাটা রয়েছে। প্রত্যেক ভাটায় এ মৌসুমে ৫৪ লাখ ইট উৎপাদন করতে তিন লাখ ঘনফুট মাটি পোড়ানো হচ্ছে। ইটভাটা বৈধভাবে চালু করতে হলে বিএসটিআই, পরিবেশ অধিদপ্তর, শিল্প কলকারখানা অধিদপ্তর, ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসকের ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। প্রত্যেক ভাটামালিককে ভ্যাট দিতে হয় তিন লাখ ৯৬ হাজার টাকা, বিএসটিআই ছয় লাখ টাকা, পরিবেশ অধিদপ্তরে নতুন ইটভাটা ২৫ হাজার টাকা ও ভ্যাট তিন হাজার ৭৫০ টাকা, পুরনো ইটভাটা সাড়ে ১২ হাজার ও ভ্যাট এক হাজার ৮৭৫ টাকা, শিল্প কলকারখানা অধিদপ্তর আট হাজার ৭৭৫ টাকা, ফায়ার সার্ভিস দশ হাজার টাকা, ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ১২ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা ও জেলা প্রশাসক ৪৫ হাজার টাকা।
তিনি আরো বলেন, ইটভাটা নির্মাণের ব্যাপারে নিয়মকানুন মানার ক্ষেত্রে খুলনা বিভাগের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চুয়াডাঙ্গা। চুয়াডাঙ্গায় জেলা প্রশাসনসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠানে মৌসুমে ভাটা মালিকদের বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয় এক কোটি ৯৫ লাখ ২১ হাজার টাকা।
ভাটা মালিক হাবিবুর রহমান লাভলু বলেন, আবহাওয়া ভালো থাকলে চুয়াডাঙ্গার ভাটাগুলোতে ইট উৎপাদন বেশি হয়। ভাটায় ব্যবহৃত মাটি নদী, খাল, বিল থেকে সংগ্রহ করা হয়। এজেলায় ৪-৫টি বাদে সব ভাটায় উৎপাদিত ইট মাপে ছোট আকারে তৈরি করে দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে, যা অন্যায়। ইটের প্রকৃত মাপ হবে ১০ ইঞ্চি লম্বা, ৫ ইঞ্চি চওড়া ও ৩ ইঞ্চি উচ্চতা কিন্তু সেটা থাকছে ৯ ইঞ্চি লম্বা, ৪ ইঞ্চি চওড়া ও আড়াই ইঞ্চি উচ্চতা। ওই ইটের দাম নেওয়া হচ্ছে অত্যান্ত বেশি।
প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার ভাটা মালিক ইকবাল মাহমুদ টিটু বলেন, ইট তৈরিতে মাটি প্রয়োজন। কিন্তু চুয়াডাঙ্গায় মাটি পাওয়া দুরূহ। অনেক সময় ব্যক্তি মালিকানার জমি থেকে মাটি সরবরাহ হয়। সেটা কোথা থেকে আনা হয় তা দেখা সম্ভব হয় না। এছাড়া সাবেক জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন আহমেদ নদী খনন ও বালি উত্তোলন কাজে উৎসাহিত করতেন। তখন মাথাভাঙ্গা ও চিত্রানদী এবং নবগঙ্গা খাল কেটে সেখান থেকে মাটি সংগ্রহ হতো। বর্তমান জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার নদী ও খাল এবং ব্যক্তি মালিকানা জমি থেকে মাটি না কাটার নির্দেশ জারি করেন। এরপর থেকে মাটি পাওয়ায় প্রতিনিয়ত সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দ্বীননাথপুর গ্রামের কৃষক জয়নাল (৬৫), হারিশ মিয়া (৫২), জীবননগর উপজেলার হাসাদহের আজব আলী (৫৫), একই গ্রামের আব্দুস সাত্তার (৫০) জানান, ফসলী জমি থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি করে দেয়ায় তাদের জমিতে প্রায় ৪ বছর ফসল ভাল হয়নি। জৈবসহ বিভিন্ন সার প্রয়োগ করে জমি প্রস্তুত করতেই তাদের সময় পার করতে হয়েছে। বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখীন হতে হয়েছে।   
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আলী হাসান বলেন, যেকোনো জমির ১২ ইঞ্চি ‘টপ সয়েল’। টপ সয়েল ফসল উৎপাদনের প্রধান উপাদান। এটা কেটে বিক্রি করে দিলে ওই জমির আর কিছুই থাকে না। মাটি কাটার এ ধরনের অরাজকতা ঠেকাতে না পারলে কয়েক বছর পরে এ জেলায় ফসল উৎপাদন দুষ্কর হয়ে পড়বে।
কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আতাউর রহমান বলেন, চুয়াডাঙ্গার ৮৫ শতাংশ ইটভাটার পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই। এরা কোনো আইন কানুন না মেনেই ভাটা নির্মাণ করেছে।
তিনি বলেন, মাত্র পাঁচজনকে নিয়ে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলায় কার্যক্রম চালু রাখতে হচ্ছে। এর ফলে অনেক কিছুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে অবৈধ ইটভাটা মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক বরাবর চিঠি পাঠানো হয়েছে।

আরও পড়ুন