‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণার দাবি বাম জোটের

আপডেট: 07:20:48 24/03/2020



img

স্টাফ রিপোর্টার : বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) যশোর জেলা শাখা বর্তমান ভয়াবহ পরিস্থিতিকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণার দাবি জানিয়েছে।
আজ মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো স্মারকলিপিতে জোটটি ‘অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা, চিকিৎসা ক্ষেত্রে চরম অরাজকতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তাহীনতার’ কঠোর সমালোচনা করেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে তারা আট দফা দাবি তুলে ধরেছে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ‘আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে জানাচ্ছি যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনা ভাইরাস সংক্রমণকে বিশ্বব্যাপী মহামারী ঘোষণা এবং চীন, ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের ভয়ংকর পরিণতি লক্ষ্য করার পরও সরকার গত তিন মাসে যথাযথ উদ্যোগ ও প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি। এই মহাদুর্যোগ মোকাবেলায় জাতীয়ভাবে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের কথা এখনো বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। বিদেশফেরতদের বিষয়ে উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা, সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা, চিকিৎসা ক্ষেত্রে চরম অরাজকতা, চিকিৎসা সামগ্রী এমনকি চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও সরঞ্জামের ব্যবস্থা এখনো করা হয়নি। চিকিৎসা ক্ষেত্রে নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় মহামান্য আদালতকে রুল জারি করতে হয়েছে।’
‘এর ফলে সারাদেশের মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। জনজীবনে ভীত-সস্ত্রস্ত এক নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যেখানে সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। দ্রব্যমূল্য, ক্ষুদ্র ঋণ, এনজিও ঋণের কিস্তির বোঝায় নিম্নবিত্ত ও গরিব মানুষ দিশেহারা। শিল্প, কল-কারখানা, শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেই। এমতাবস্থায় ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জাতীয় দুর্যোগ ঘোষণা করা হোক।’
বামপন্থীদের জোটটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে যে দাবি করেছে, তা হলো :
১) করোনা সংক্রমণের ভয়াবহতাকে ‘জাতীয় দুর্যোগ’ ঘোষণা করে সর্বাত্মক প্রস্তুতি ও সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে। সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল এবং চিকিৎসক ও ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিশিষ্ট ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের ব্যক্তির সমন্বয়ে সর্বক্ষণিক মনিটরিং সেল গঠন কার্যকর পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
২) করোনা মোকাবেলায় অবিলম্বে বাজেট পুনর্বিন্যাস করে তাৎক্ষণিকভাবে কমপক্ষে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করতে হবে। এই টাকায় পর্যাপ্ত করোনা কিট, পিপিই, কমপক্ষে এক লাখ স্বাস্থ্য স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। সংকটের বিস্তৃতি ও প্রতিরোধ বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যে ২০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ করতে হবে; যা নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করতে হবে।
৩) কিছু হাসপাতালকে বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে; যেখানে কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন ও চিকিৎসা একই হাসপাতালে হবে। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামসহ প্রতিটি জেলা-উপজেলার স্টেডিয়ামগুলোকে ফিল্ড হাসপাতালে পরিণত করতে হবে। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় সাময়িক হাসপাতাল এবং সেনাবাহিনীর ডাক্তারদেরকে নিয়োগ দিতে হবে। হোম কোয়ারেন্টাইনের নামে ভীতি ছড়ানো বন্ধ করে বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বুঝাতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের জায়গা বৃদ্ধি করা। প্রয়োজনে তারকা হোটেলসমূহ এবং জেলার ভালো হোটেল এ কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
৪) করোনা পরীক্ষার জন্য জেলা-উপজেলায় পর্যাপ্ত বিশেষায়িত প্যাথলজিকাল ল্যাবরেটরি স্থাপন করা এবং স্থাপিত ল্যাবগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট কয়েকটিকে করোনা পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত করতে হবে, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে না পারে। প্রয়োজনে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক সাময়িক রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এই দুর্যোগে কাজে লাগাতে হবে।
৫) ভর্তুকি মূল্যে শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের জন্য চাল, ডালসহ স্যানিটাইজার ও সাবান সরবরাহসহ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও মূল্যবৃদ্ধির সিন্ডিকেটের হোতাদের শাস্তি দিতে হবে। স্যানিটাইজারের উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
৬) জনঘনত্বপূর্ণ এলাকা যেমন বস্তি, স্বল্প আয়ের মানুষের আবাসস্থল, ভাসমান মানুষদের জন্য সুরক্ষা, সচেতনতা, পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ গৃহকর্মী, গাড়িচালক, অফিস সহকারীসহ স্বল্প আয়ের মানুষেরা যাতে সংক্রমিত হতে না পারে, কমিউনিটি ট্রান্সমিশন ঘটতে না পারে।
৭) গার্মেন্টসসহ শিল্পকারখানার শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা করতে হবে। করোনার অজুহাতে শ্রমিক ছাঁটাই চলবে না। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিক আক্রান্ত হলে চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে। অবস্থা ভেদে গার্মেন্টস শ্রমিকসহ অন্যান্য শ্রমজীবী কর্মীকে সবেতনে ছুটি দিতে হবে।
৮) ডাক্তার, চিকিৎসাসেবাকর্মী, সংবাদকর্মী, পরিবহনকর্মী, পুলিশসহ জনসম্পৃক্ত কাজে যুক্তদের জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) যশোর জেলার সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক জিল্লুর রহমান ভিটু, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি যশোর জেলা কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী) জেলার সমন্বয়ক হাচিনুর রহমান, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ যশোর জেলা কমিটির সম্পাদক তসলিম-উর-রহমান প্রমুখ।

আরও পড়ুন