‘খুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা নির্বাক’

আপডেট: 02:58:44 04/07/2020



img
img

হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা : রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্তে নীরব হয়ে পড়েছে খুলনার শিল্পাঞ্চল। বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দেওয়া মিল বন্ধের ঘোষণায় সাধারণ শ্রমিকরা পড়েছেন বিপাকে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং সামনের দিনগুলোতে পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচবেন- এটাই এখন তাদের ভাবনার বিষয়।
যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, শ্রমিকরা কোনোভাবে ঠকবেন না। বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন, ‘সরকার বিজেএমসি পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর সংস্কার ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে শ্রমিকদের সমুদয় পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে পাটকল শ্রমিকদের দায়িত্ব নিয়েছেন, কারও দুশ্চিন্তার কারণ নেই।’
তবে কারখানা বন্ধের ঘোষণায় কোনো শ্রমিক খুশি হতে পারেন না বলে মন্তব্য করেছেন প্লাটিনাম জুটমিলের শ্রমিক মো. সরোয়ার।
তিনি বলেন, 'চাকরির আর দুই মাস বাকি ছিল। কিন্তু মিল বন্ধ করে গোল্ডেন হ্যান্ডশেক ঘোষণায় খুশি হতে পারছি না। কারণ সরকার ঘোষণা দিলেও টাকা পাওয়ার বিষয়টি অনেক কঠিন। সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে টাকা দেওয়াতো আর শ্রমিকের হাতে টাকা আসা না।'
মিল বন্ধের ঘোষণায় শ্রমিক পরিবারগুলো কঠিন অবস্থায় পড়েছে বলে জানান ক্রিসেন্ট জুটমিলের শ্রমিক মো. মিন্টু।
তিনি বলেন, 'চাকরি হারিয়ে কেউ খুশি হতে পারে না। আমাদের মজুরি অনিয়মিত থাকলেও শিল্পাঞ্চলের ব্যবসায়ীরা বাকিতে পণ্য সামগ্রী দিতেন। তবে চাকরি না থাকায় এখন ওই সব ব্যবসায়ীও উদারতাকে সংকুচিত করে নিয়েছেন। আমরা আনন্দ সেদিনই করবো, যেদিন সরকার তার ঘোষণা অনুযায়ী শ্রমিকদের বকেয়া সম্পূর্ণ পরিশোধ ও যোগ্য শ্রমিকদের নতুনভাবে নিয়োগ দিয়ে পাটকলগুলো ফের চালু করবে।'
ক্রিসেন্ট জুটমিলের অপর শ্রমিক মতিয়ার রহমান বলেন, 'আমরা এখন আর সড়কে গিয়ে উচ্ছ্বাস করতে পারি না। ছেলে-মেয়ের মুখের দিকে তাকাতেও এখন লজ্জা হয়। টাকা না থাকায় তাদেরকে নিয়মিত খাবারও দিতে পারছি না।'
সার্বিক বিষয়ে প্লাটিনাম জুটমিলের সিবিএ সভাপতি শাহানা শারমিন বলেন, শ্রমিকরা নির্বাক হয়ে পড়েছেন। সিবিএ-ননসিবিএ নেতাদের নিয়ে তারা একটি বৈঠক করার পরিকল্পনায় রয়েছেন। বৈঠকে বসার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে তিনি অনীহা প্রকাশ করেন।
এদিকে পাটকল বন্ধ হলেও শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন। তিনি প্লাটিনাম জুটমিল গেটে শ্রমিকদের উদ্দেশে বলেন, এবার পাটকল শ্রমিকরা এককালীন পাওনা পাওয়ার নিশ্চয়তা পেয়েছেন। পাটকল বন্ধ হওয়ায় শ্রমিকদের সমুদয় পাওনার অর্ধেক নগদে ও বাকি অর্ধেক তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে দেওয়া হবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী গৃহীত পদক্ষেপ ও জারি করা প্রজ্ঞাপন লিফলেট আকারে শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
এছাড়া দিঘলিয়ার সেনহাটিতে স্টার জুটমিল প্রাঙ্গণে জেলা প্রশাসক বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল শ্রমিকদের পাওনা শতভাগ পরিশোধ করেই পিপিপি ভিত্তিতে মিলগুলো চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে ২০১৪ সাল থেকে অবসরে যাওয়া এবং বর্তমানে কর্মরত শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা এককালীন পরিশোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শ্রমিকদের পাওনা টাকায় যাতে কোনো মধ্যস্বত্ত্বভোগী ভাগ বসাতে না পারে সেজন্য সরকারি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পাওনা পরিশোধ করা হবে।
তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে অবসরে যাওয়া শ্রমিকদের বকেয়া পাওনা এককালীন পরিশোধে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। একইসঙ্গে পাটকল শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান হয়েছে বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
ওই সময় উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেরার পুলিশ সুপার এস এম শফিউল্লাহ, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইউসুপ আলী, উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হাফিজ-আল-আসাদ, শ্রম দফতর খুলনার পরিচালক মো. মিজানুর রহমান।
পাটকল বন্ধের ঘোষণায় সাধারণ শ্রমিকরা বিপাকে পড়লেও সঠিকভাবে পাওনা বুঝিয়ে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে কিছু শ্রমিক শুক্রবার বিকেলে খুলনার প্লাটিনাম জুবিলী জুটমিলে মিষ্টি বিতরণ করেন। পাশাপাশি বিজেএমসির খুলনা অফিসের সামনে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং পিপলস গোল চত্বরে খালিশপুর থানা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আনন্দমিছিল বের করা হয়। এছাড়া পাটকলগুলোর নিরাপত্তায় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রয়েছে পুলিশি পাহারা।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন