২০ বছর পর বিধবা ভাতা পেলেন করুণা

আপডেট: 01:44:24 17/12/2020



img

এস আলম তুহিন, মাগুরা : ২০ বছর পর বিধবা ভাতা পেলেন মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার ছোনগাছি গ্রামের গরিব করুণারানী। ইউনিয়ন লোকমোর্চা সদস্যদের সহায়তায় তিনি সরকারি এ সুবিধার অন্তর্ভূক্ত হলেন।
শ্রীপুর উপজেলা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরের গ্রাম ছোনগাছি। শ্রীকোল ইউনিয়নের এ গ্রামে অতিদরিদ্র ২৭ হাজার মানুষের বসবাস। গ্রামের ছোট্ট একটি টিনের ঘরে বাস করেন করুণারানী বিশ্বাস (৮২)। ২৫ বছর আগে তার স্বামী ধীরেননাথ বিশ্বাস মারা যান। রেখে যান পাঁচ মেয়ে আর দুই ছেলে। নিজের সামান্য কিছু জমি থেকেও নেই। দারিদ্র্য আর অর্থকষ্টের মধ্যে দিন চলতে থাকে করুণারানীর। কীভাবে সংসার চালাবেন আর ছেলে-মেয়েকে কীভাবে মানুষ করবেন, তার চিন্তার অন্ত নেই। এইভাবে দারিদ্র্যের সঙ্গে তীব্র সংগ্রাম করে চলতে থাকে তার জীবন। প্রতিবেশীদের কিছু সহযোগিতা নিয়ে দিন চলে তার। অর্থের অভাবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাতে পারেননি। তাই ছেলেরা পরের জমিতে শ্রমিকের কাজ করেন। প্রতিবেশীদের সহায়তায় দিয়েছেন মেয়েদের বিয়ে।
করুণা বলেন, ''স্বামী মরে যাওয়ার পর অনেক সংগ্রাম করেছি। আজও সংগ্রাম করছি। ছেলেমেয়েদের জন্য দুই বেলা দুই মুঠো অন্ন যোগাতে আমার সারাদিন কষ্ট করতে হয়েছে। ৬০ বছর হলে নাকি সরকার গ্রামের গরিব নারীদের বিধবা ভাতা দেয়। এ ভাতার জন্য আমি দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছি। এলাকার বর্তমান মেম্বার চাঁদ আলীর কাছে অনেকবার গেছি। দিয়েছি কাগজপত্র। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এলাকার অনেক নারী ভাতা পাচ্ছে, তাই শুনে গিয়েছিলাম। মেম্বাররা শুধু বলে, 'তোমারটা হয়ে যাবেনে।' কিন্তু হয়নি।''

কিছুদিন আগে ওয়েভ ফাউন্ডেশনের ‘রেসপন্স’ প্রকল্পের একটি কার্যক্রম কমিউনিটি স্কোর কার্ড বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ইউনিয়ন লোকমোর্চা সদস্যরা জানতে পারেন যে, করুণার বয়স হয়েছে, কিন্তু এখনো কোন বিধবা বা বয়স্ক ভাতা হয়নি। পরবর্তীতে প্রকল্পের একটি শেয়ারিং মিটিং-এ লোকমোর্চার সদস্যরা ইউপি চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানালে তিনি একজন মৃত ব্যক্তির কার্ডের পরিবর্তে করুণারানীর জন্য কার্ডের ব্যবস্থা করে দেন। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বিধবা ভাতা কার্ডে অন্তর্ভুক্ত হন করুণা। এখন থেকে তিনি প্রতি মাসে ৫০০ টাকা হারে সরকারের বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা পাচ্ছেন নিয়মিত ।
শ্রীপুরের ওয়েভ ফাউন্ডেশনের প্রকল্প সমন্বয়কারী মো. ওসমান গণি বলেন, ‘'অংশগ্রহণমুলক শাসন ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের মাধমে সরকারি সেবাসমূহের দায়বদ্ধতা’ প্রকল্প নিয়ে আমরা কাজ করছি। এলাকার দরিদ্র, প্রান্তিক এবং দুঃস্থ জনগোষ্ঠী যাতে একটি সুশাসিত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে মানসম্পন্ন জীবন-যাপন করতে পারে সেটাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ইউকেএইডের সহায়তায় ওয়েভ ফাউন্ডেশন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। আমাদের ইউনিয়ন লোকমোর্চা সদস্যরা যখন জানতে পারে, করুণা রানীর বয়স হয়েছে কিন্তু এখনো ভাতা পাননি, তখন তারা শেয়ারিং মিটিং করে চেয়ারম্যানকে অবহিত করলে তিনি যথাযথ ব্যবস্থা নেন। ইউনিয়ন লোকমোর্চার সার্বিক সহযোগিতায় আজ ভাতা পেল করুণা। আমরা লোকমোর্চার সহযোগিতায় ইউনিয়নের আরো অনেক করুণাকে খোঁজার চেষ্টা করছি, যাদের বয়স হয়েছে কিন্তু ভাতা পাননি। ওয়েভ ফাউন্ডেশন ও লোকমোর্চা সবসময় তাদেরকে সহযোগিতা করতে আগ্রহী।''
জেলা লোকমোর্চার সাধারণ সম্পাদক অলোক বোস বলেন, 'গ্রামীণ জনপদের সাধারণ দরিদ্র মানুষের অধিকার নিয়ে আমরা কাজ করছি। আজ লোকমোর্চা সার্বিক সহযোগিতায় শ্রীপুরের ছোনগাছি গ্রামের দরিদ্র করুণা ভাতা পাওয়াতে আমরা খুবই আনন্দিত। আমরা আরো এ রকম করুণাকে খুঁজে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছি।'
এ বিষয়ে শ্রীকোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোতাসিম বিল্লাহ সংগ্রাম বলেন, 'আমি চার বছর ধরে অত্যন্ত সফলতার সাথে এ ইউনিয়নে কাজ করছি। বর্তমানে বিধবা ভাতা দেওয়ার ব্যাপারে আমরা অনেক যাচাই-বাছাই করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে দিচ্ছি।'

তিনি অভিযোগ করে বলেন, 'এর আগে এ ইউনিয়নের প্রায় ৮০ জনকে বয়স বৃদ্ধি করে ভাতা প্রদান করা হয়েছিল। আমি সেগুলোর অনেকটা বাদ দেয়েছি। আমার ইউনিয়নে করুণা রানীর কথা শোনা মাত্রই আমি তাকে যাচাই-বাছাই করে ভাতা প্রদান করেছি।'
তিনি আরো বলেন, 'ইউপি সদস্যরা যদি আমাদেরকে সঠিক বয়সের মানুষ বাছাই করে দেন, তাহলে আমাদের কষ্ট অনেকটা সার্থক হয়। কিন্তু অনেক সময় ভুল বাছাইয়ের ফলে আমাদের মাসুল দিতে হয়।'

আরও পড়ুন