হাসপাতালের বেডে তিন বছর, খোঁজ নেন না সন্তানরা

আপডেট: 12:29:35 19/04/2020



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : তিনবছর ধরে হাসপাতালের বেডে অসহায় দিন কাটছে নুরুল ইসলাম নামে ৮৫ বছরের এক বৃদ্ধর। স্ত্রী বা সন্তানদের কেউ খোঁজ না নেওয়ায় মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বেডে নিঃসঙ্গ দিন কাটে তার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও মানবিক দিক বিবেচনা করে রোগীর মতোই সেবা দিচ্ছেন তাকে।
নুরুল ইসলামের আদি বাড়ি নোয়াখালী জেলার রায়পুর উপজেলার চড়পাতা গ্রামে। তিনি চার ছেলে ও তিন মেয়েসন্তানের জনক। তার মধ্যে বড় ছেলে ইসমাইল হোসেন মারা গেছে বাল্যকালে। বাকি তিন ছেলে সেলিম হোসেন, কামরুল হাসান ও আলমগীর হোসেনকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করেছেন। ছেলেরা সবাই এখন ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত। তিন মেয়েকেও বিয়ে দিয়েছেন। তারা সবাই স্বামী-সন্তান নিয়ে ‘সুখে’ আছেন। ছোট মেয়ে নয়ন বেগম ছাড়া কেউ তাদের বৃদ্ধ বাবার খবর নেন না।
নুরুল ইসলামের স্ত্রী রিজিয়া বেগম বেঁচে আছেন। তিনিও স্বামীকে ছেড়ে ঢাকায় ছেলেদের কাছে থাকেন।
প্রায় ৭০ বছর আগে বাবা বজলুল হকের (বর্তমানে মৃত) হাত ধরে মণিরামপুরের বিজয়রামপুরে আসেন নুরুল ইসলাম। এখানে বড় বোন রাবেয়া বেগমকে বিয়ে দেন। সেই বাড়িতেই থাকতেন নুরুল ইসলাম। পাঁচ বছর আগে সেই বোন মারা গেছেন। তারপর ঢাকায় চলে যান নুরুল। সেখানে ঠাঁই না হওয়ায় বৃদ্ধ বয়সে মণিরামপুর হাসপাতালে আশ্রয় নেন তিনি। বর্তমানে বাম হাত ও বাম পায়ে বল পাচ্ছেন না এই বৃদ্ধ। বার্ধক্যজনিত রোগ নিয়ে চিকিৎসক ও নার্সদের বদান্যতায় বসবাস করছেন হাসপাতালের বেডে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, শুধু নুরুল ইসলাম নন, অসহায় এমন ৫-৬ জন রোগী নানা রোগ নিয়ে প্রায়ই হাসপাতালের বেডে পড়ে থাকেন। করোনা আতঙ্কের কারণে বাকিরা হাসপাতাল ছাড়লেও পড়ে আছেন শুধু নুরুল ইসলাম।
শনিবার রাতে হাসপাতালে কথা হয় নুরুল ইসলামের সঙ্গে। সেখানে পুরুষ ওয়ার্ডে তিনিসহ আরেকজন রোগী আছেন। ওই রোগীও সকালে হাসপাতাল ছাড়বেন। তখন একা থাকতে হবে এই বৃদ্ধকে।
নুরুল ইসলাম বলেন, ‘জীবনের ১৫টি বছর প্রবাসে কাটিয়েছি। নিজে লেখাপড়া না জানলেও যা আয় করেছি তা দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছি। নিজের এক-দেড় বিঘা জমি ছিল। সেটাও বিক্রি করে ছেলেদের দিয়েছি। ছেলেরা এখন ঢাকায় বাংলাবাজারে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। আমার খোঁজ আর নেয় না।’
তিনি বলেন, ‘বিয়ে করার পর ছেলেরা আর খোঁজ নেয় না। আমাকে তাদের সাথে রাখে না। মোবাইল করলে আমার কণ্ঠ শুনে ফোন রেখে দেয়। ছোট মেয়েটা (নয়ন) রাঙ্গামাটিতে থাকে। সে মাঝেমাঝে খবর নিত। এখন সেখানে গণ্ডগোল চলছে। তাই খোঁজ নিতে পারছে না।’
নুরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি হাসপাতালের সবাইকে এবং সামনের দোকানদারদের বলে দিয়েছি, মৃত্যুর পর যেন আমার লাশ মাছনা মাদরাসায় (মণিরামপুরে) দিয়ে দেয়। সেখানে আমার দাফনের ব্যবস্থা করতে বলেছি।’
যতক্ষণ এই বৃদ্ধের সঙ্গে কথা হয়েছে, ততক্ষণ তার দুই চোখ দিয়ে পানি ঝরেছে। তার কোনো ক্ষতি যাতে না হয়, তা দেখার জন্য তিনি বারবার সুবর্ণভূমিকে অনুরোধ করেছেন। এমনকি এতকষ্টের মধ্যেও ছেলেদের অভিশাপ দেননি তিনি। তাদের সম্মানের কথা ভেবে গণমাধ্যমে কিছু না লিখতেও অনুরোধ করেন নুরুল।
মণিরামপুর হাসপাতালের নার্স হাওয়া পারভিন বলেন, ‘এই হাসপাতালে আমার চাকরির বয়স দুই বছর। প্রথম থেকেই এই বৃদ্ধকে আমি হাসপাতালে দেখছি। কিছুদিন থাকার পর তিনি চলে যান। আবার দুই-চারদিন পরে এসে ভর্তি হন। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছেন। প্রয়োজনীয় সব ওষুধ হাসপাতাল থেকে দেওয়া হচ্ছে।’
তবে মোবাইল নম্বর না পাওয়ায় বৃদ্ধর ছেলেদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। মণিরামপুরের বিজয়রামপুরে তার ভাগনেদের সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ দেখালে তিনি নিষেধ করেন।
মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. শুভ্রারানী দেবনাথ বলেন, ‘নুরুল ইসলামের মতো এমন অসহায় ৫-৬ জন রোগী নিত্য নানা রোগ নিয়ে হাসপাতালের বেডে পড়ে থাকেন। আমরা তাদের হাসপাতাল থেকে ওষুধ দিই। কিছু ওষুধ সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে কিনে দেওয়া হয়। মানবিক দিক বিবেচনা করে হাসপাতালের নিয়ম মেনে তিন সপ্তাহ পরপর তাদের নতুন করে ভর্তি করানো হয়।’
করোনা আতঙ্কের কারণে নুরুল ইসলাম বাদে বাকিরা হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছেন বলে জানান ডা. শুভ্রা।

আরও পড়ুন