হার না মানা জ্যোতি

আপডেট: 11:05:38 05/06/2020



img

স্টাফ রিপোর্টার : এ বছর এসএসসিতে বিজ্ঞানবিভাগ থেকে ৯৯২ নম্বর পেয়ে (জিপিএ-৫) উত্তীর্ণ হয়েছে প্রতিবন্ধী জ্যোতি হোসেন।
তার গলা থেকে পা পর্যন্ত অবশ থাকে। হুইল চেয়ারে চলাচল করে মায়ের সহযোগিতায়। মেধাবী এই শিক্ষার্থী  শিক্ষাজীবন শেষ করে আবহাওয়াবিদ হতে চায়।
শিক্ষার্থী জ্যোতি হোসেন জন্ম থেকে প্রতিবন্ধী নয়। ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে নানিবাড়ি থেকে ফেরার পথে ভ্যান থেকে পড়ে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয় সে। এরপর চলাচলের শক্তি হারায়। স্পাইনাল ইনজুরির কারণে তার এই অবস্থা।
যশোরের ঝিকরগাছা শহরের পারবাজার কমিশনারপাড়ার বাসিন্দা মালয়েশিয়া প্রবাসী কাদের হোসেন ও রেক্সোনা হেসেনের মেয়ে জ্যোতি। সে চলতি বছর ঝিকরগাছা পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেয়।
তার মা রেক্সোনা বলেন, দুই মেয়ের মধ্যে জ্যোতি বড়। পরেরজন জেবা নবম শ্রেণিতে পড়ে ২০০৭ সালের অক্টোবর মাসে নার্সারিতে পড়ার সময় (বয়স সাড়ে চার বছর) দুর্ঘটনায় জ্যোতির পুরো শরীর অকেজো হয়ে পড়ে। হুইলচেয়ারে শুরু হয় পথচলা। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাম হাত দিয়ে লেখালেখি করতে থাকে। চিকিৎসার একপর্যায়ে ডান হাতে লিখতো। বাড়ির পাশে পারবাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়াশুনা করার সময় শিক্ষকদের অসহযোগিতায় স্কুল ছাড়তে বাধ্য হতে হয় তাকে।
হার না মানা জ্যোতি বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বে ঝিকরগাছা পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। মা তাকে প্রতিদিন হুইলচেয়ারে করে স্কুলে আনা নেওয়া করতে থাকেন। মায়ের কঠোর পরিশ্রমে জ্যোতি লেখাপড়া চালিয়ে যায়। কিন্তু ডান হাতে দ্রুত লেখা তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
প্রতিদিন ৮-১০ ঘণ্টা পড়াশুনা করলেও দুশ্চিন্তা, দ্রুত লিখতে না পারলে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল সম্ভব হবে কি না। পরীক্ষার আগে প্রতিবেশী আরেক শারীরিক প্রতিবন্ধী মিষ্টি পরামর্শ দেন তার জন্যে একজন শ্রুতিলেখক নিতে। এরপর স্কুলের সহকারী প্রধানশিক্ষক নুরুল আমিন মুকুল যশোর বোর্ডে যোগাযোগ করে জ্যোতির ছোটবোন জেবাকে শ্রুতি লেখক হিসেবে মনোনীত করাতে সক্ষম হন।
ঝিকরগাছা এমএল পাইলট সরকারি বিদ্যালয় কেন্দ্রের একটি কক্ষে ঝিকরগাছা উপজেলার একমাত্র শ্রুতি লেখক নিয়ে সে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।
রেক্সোনা জানান, ‘মেয়েটি খুবই মেধাবী; তার খাওয়া-দাওয়া, চলাচল সবকিছুই আমাকে করতে হয়। ঢাকায় সিআরপিতে নিয়ে গেছি। তারা বছরে দুইবার তাকে নিয়ে যেতে বলেছেন। ডাক্তাররা আশ্বস্ত করেছেন, ঠিকমতো চিকিৎসা-থেরাপি চললে একসময় সে নিজেই হাঁটাচলা করতে পারবে।’
‘ঢাকায় গেলে প্রতিবার কমপক্ষে ত্রিশ হাজার টাকা খরচ। তার বাবা আর দুই বছর পর দেশে ফিরবেন। আমাদের সহায় সম্পত্তি তেমন নেই। চিকিৎসা আর উচ্চশিক্ষার জন্যে এখন বেশ টাকা পয়সার প্রয়োজন। সরকারের পক্ষ থেকে এখন যদি কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায়, তবে মেয়েটি ভালো রেজাল্ট করবে বলে বিশ্বাস করি,’ বলেন মা রেক্সোনা।
তিনি বলেন, সরকার প্রাইমারি আর হাইস্কুলে প্রতিবন্ধীদের চলাচলে উপযোগী সিঁড়ির ব্যবস্থা করেছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনকি চাকরির জন্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেও একই ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
ঝিকরগাছা পাইলট বালিকা বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক নূরুল আমিন মুকুল বলেন, ‘জ্যোতি খুবই মেধাবী মেয়ে। স্কুলে পড়াকালে তার কাছ থেকে কোনো প্রকার অর্থ নেওয়া হয়নি। নিয়মিত তার বাসায় গিয়ে খোঁজ-খবর নিয়েছি। তার জন্যে দোতলা বাদ দিয়ে নিচতলায় ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সে  বসতে পারতো না। তার জন্যে আলাদা টেবিলও তৈরি করে দেওয়া হয়। সুযোগ পেলে সে অনেকদূর যেতে পারবে বলে বিশ্বাস করি।’
জ্যোতি তার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলে, ‘এ সাফল্য আমার মা, বোন, শিক্ষকমণ্ডলীর। তাদের কাছে আমি চিরঋণী। ভালো করে লেখাপড়া শিখতে চাই; যেন কারোর বোঝা হয়ে না থাকতে হতে হয়। আমার খুব ইচ্ছে- আবহাওয়াবিদ হওয়ার। না হলে আইনজীবী। শারীরিকভাবে অক্ষম তাই ভাষা আর বুদ্ধি দিয়ে যা করা যাবে, ভবিষ্যতে সেটিই পেশা হিসেবে বেছে নিতে চাই।’

আরও পড়ুন