সেই নারী ওসির স্বামীর বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু!

আপডেট: 10:20:15 09/04/2020



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : চিকিৎসা প্রদানে ডাক্তার-নার্সদের অবহেলায় স্বামীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন নড়াইলের নড়াগাতি থানার ওসি রোকসানা খাতুন; যিনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কোনো থানার প্রথম নারী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা
বৃহস্পতিবার সকালে যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ওই পুলিশ ইনসপেক্টরের স্বামী রেলওয়ে কর্মী আহসানুল ইসলাম। কার্ডিয়াক অ্যাটাকে অসুস্থ হওয়ায় তাকে হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছিল বলে চিকিৎসকরা জানান।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করছেন। উল্টো দুষছেন তার স্বজনদের।
হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, ওসি রোকসানা খাতুন আহাজারি করছেন। বলছেন, ‘এই শুনছো, তোমার মেয়ে নিয়ে এখন আমি কী করবো? তোমার মেয়ে একা একা খায় না তুমি ছাড়া। এই ডাক্তাররা কোনো ট্রিটমেন্ট দিলো না। পুলিশ এতো সেবা দিচ্ছে অথচ পুলিশ পরিবার আজকে সেবা পাচ্ছে না।’
স্বামীর লাশের পাশে বসে কাঁদতে কাঁদতে এই পুলিশ কর্মকর্তা আরো অভিযোগ করেন, যশোর জেনারেল হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সদের অবহেলায় তার স্বামীর (৪৮) অকাল মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি এতো লোকের সেবা করে বেড়াচ্ছি, অথচ শুধু ডাক্তারের অবহেলায় আমার স্বামী মারা গেল। আমার সন্তানরা এতিম হলো।’
জরুরি এই রোগীর অক্সিজেন না দেওয়ার অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘তারা কিছুই করেনি। তারা ওয়ার্ডে রেখে চলে গেছে। না কোনো ডাক্তার, না কোনো আয়া। আমার দুনিয়াডা অন্ধকার করে দিলো ডাক্তারদের অবহেলা।’
‘‘আমার ছোট ছোট দুটো বাচ্চা। সে (স্বামী) হাসপাতালে আসতে ভয় পায়। বলছিল, ‘সবাই আমাকে করোনা রোগী ভাববে।’ আমি বলেছি, ‘যা ভাবে ভাবুক। তুমি যাও।’ কয়, ‘ডাক্তাররা আমারে কোথায় ফেলায় রাখবেনে।’ আমি কই, ‘না ডাক্তাররা ফেলায় রাখবে না।’ কয়, ‘তুমি ফোন করো, ফোন করো।’ আমি বলে দিছি, তারপরও কোনো ডাক্তার আসেনি। একটি ইমার্জেন্সি রোগীকে আইসিইউতে না নিয়ে কীভাবে ওয়ার্ডে ফেলে রাখে? ডাক্তার আইছে পরে। এসে দেখাচ্ছে যে, আমরা অক্সিজেন দিছি, এ দিছি, সে দিছি। কিচ্ছু না। কীভাবে একটা মানুষকে বিনা চিকিৎসায় মারে?’’
‘‘ও আমাকে ফোন করে বলেছে, ‘আমার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমারে বেডে রেখে দেছে।’ আমি বললাম, ‘আইসিইউতে দিতে বলো।’ বলতেছে, ‘ডাক্তার নাই, ডাক্তার নাই।’’
ওসি রোকসানা খাতুন জানান, তার স্বামী আহসানুল ইসলাম বাংলাদেশ রেলওয়েতে বেনাপোলে পি ম্যান হিসেবে কর্মরত। তিনি যশোর কোতয়ালী থানার স্টাফ কোয়ার্টারে থাকেন। আজ সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে হঠাৎ করে স্বামী আহসানুলের বুকে ব্যথা ওঠে, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। কিছু সময়ের মধ্যে তিনি যশোর কোতয়ালী থানার ওসি-কে ফোন দিয়ে তার স্বামীকে হাসপাতালে পাঠান। যশোর জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগ তাকে ভর্তি নিয়ে করোনারি কেয়ার ইউনিটের সিসিইউ ওয়ার্ডে পাঠায়।
এই নারী কর্মকর্তার অভিযোগ, সেইসময় দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসক ওষুধ লিখে রোগীর পায়ের কাছে স্লিপ রেখে চলে যান। শ্বাসকষ্ট হলেও তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়নি।
তিনি আরো জানান, পরে ফোন দিলে তার স্বামী ফোন রিসিভ করেননি। পাশের বেডের রোগীর স্বজনরা ফোন ধরে চিকিৎসায় অবহেলার কথা জানান এবং বলেন, রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। ওষুধ আনতে হবে। এসময় পাশের বেডের রোগীর স্বজনদের তিনি ওষুধ কিনে আনতেও অনুরোধ করেন। পরে তিনি স্বামীর মৃত্যুর খবর পান।
হাসপাতালের রেজিস্ট্রার অনুযায়ী সকাল দশটার দিকে ওই রোগী মারা যান।
রোকসানা প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ ঘটনার বিচার দাবি করেন।
তবে হাসপাতালের চিকিৎসকরা দাবি করছেন, কার্ডিয়াক অ্যাটাকে মারা যাওয়া ওই রোগীর চিকিৎসায় কোনো অবহেলা করা হয়নি।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক দিলীপকুমার রায় বলেন, ‘করোনারি কেয়ার ইউনিটে ভর্তির পর চিকিৎসক তাকে দেখে চিকিৎসাপত্র দেন। হাসপাতাল থেকে যা সরবরাহ করার, তা রোগীকে দেওয়া হয়। কিন্তু বাইরে থেকে ওষুধ আনার দরকার ছিল। তবে রোগীর পাশে তার কোনো লোক না থাকায় সেটা আনা হয়নি। তাছাড়া রোগী মাত্র দশ মিনিট সময় দিয়েছে। ফলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।’
অক্সিজেন কেন দেওয়া হয়নি- এমন প্রশ্নে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বলেন, ‘অক্সিজেন দেওয়ার দায়িত্ব নার্সের। কেন তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়নি তা এখনো সংশ্লিষ্ট বিভাগের চিকিৎসকরা আমাকে জানায়নি।’

আরও পড়ুন