সাত প্রতিবন্ধী নিয়ে সরলার কষ্টের জীবন

আপডেট: 07:17:29 03/12/2019



img

রহিদুল ইসলাম খান, চৌগাছা (যশোর) : চৌগাছায় এক পরিবারে সাত বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধীকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সরলা দেবী নামে এক নারী। তার অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকের ভুলের মাশুল হিসেবে তাকে এখন প্রতিবন্ধী সন্তানদের বোঝা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
চৌগাছা পৌরসভার ছয় নম্বর ওয়ার্ডের ঋষিপাড়ার বাসিন্দা নিরঞ্জনের স্ত্রী সরলা বালা। এলাকাটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। শহরের মেইন বাসস্ট্যান্ড থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে পাকা সড়কের পাশেই সামান্য জমির ওপর কাঁচা-পাকা ঝুপড়ি টাইপের বাড়ি সরলার। হতদরিদ্র সরলার জীবন চলে পাঁঠার মাধ্যমে বকরি পাল (প্রজনন) দিয়ে। একসময় বেশ কয়েকটি থাকলেও এখন মাত্র দুটি পাঁঠা তার সম্বল। স্বামী নিরঞ্জন করিমন (স্থানীয়ভাবে নির্মিত ইনজিনচালিত বাহন) চালাতেন। স্ট্রোকের পর প্যারালাইজড হয়ে বছর তিনেক হলো কোনোভাবে চলতে-ফিরতে পারেন।
সরলার চার ছেলের মধ্যে ছোট তিন ছেলে মোহন (১৯) এবং জমজ মিলন ও নয়ন (১৫) লাইগেশনের পর জন্ম নেওয়া। তারা তিনজনই শারীরিক এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। পাঁচ মেয়ের মধ্যে বড় অম্বালিকা (৩৫) শিশুবেলায় হামজ্বরে আক্রান্ত হয়ে এখন দৃষ্টিশক্তিহীন। সেজ মেয়ের দুই ছেলে বিদ্যুৎ (১৪) ও বিধান (১২) বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। তাদেরও নেই থাকার কোনো জায়গা। সরলার বাড়ির মধ্যেই থাকে তারা।
উপজেলা সমাজসেবা অফিস এসব প্রতিবন্ধীদের প্রতিবন্ধী আইডি কার্ড দিয়েই দায়িত্ব সেরেছে।
সরলার বাড়ি গিয়ে কথা বলতে চাইলে প্রথমে তিনি কথাই বলতে চাচ্ছিলেন না। ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন, ‘বাপু কত লোক আসে। বলে এ দেবো, ও দেবো। শুনে চলে যায়। কিছুই তো পাইনে। তোমাদের সাথে কথা বলতে আমার যে সময় নষ্ট হবে, সেসময়ে আমার কাজ করতে পারবো। এই দেখ, কাল সন্ধ্যা থেকে আমার একটা ছাগল হারিয়ে গেছে। সেই সকাল থেকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। পাচ্ছি না।’
কিছু সময় পর অবশ্য স্বাভাবিক হয়ে আসেন সরলা। ঘরের বরান্দায় বসতে দেন একটা মাদুর পেড়ে। বলেন, ‘শুনবা, আমার এই কাহিনি? তুমরা বাপু শিক্ষিত মানুষ। আমরা তো গরিব। আমার এইটুকুই আছে...’ বলে চলেন সরলা।
‘বিয়ের পর আমার পরিবার-পরিকল্পনার বিষয়ে কোনো ধারণা ছিল না। তোমাদের কাকাও (নিরঞ্জন) এসব নিয়ে ভাবতো না। এভাবেই আমার একে একে সাত সন্তান জন্ম নেয়। এর মধ্যে একটি সন্তান ছোট্টবেলায় মারা যায়। এরপর চৌগাছা সরকারি হাসপাতালের লোকেরা আমার বাড়িতে আসে। সে সময় হাসপাতালের টিএইচও ছিলেন ডা. অরুণকুমার বিশ্বাস। তাদের আশ্বাসে  ১৯৯৮ সালের শেষ দিকে কি ৯৯ সালের শুরুতে চৌগাছা হাসপাতালে আমার পেট কেটে লাইগেশন (অপারেশন) করা হয়। কিন্তু তার পরও ৯৯ সালে আমার পেটে সন্তান আসে। আমি হাসপাতালে গেলে তারা বলে, সন্তান আসেনি।’
‘‘তারা বলে, ‘তোমার পেটে কিছু হয়েছে।’ ২০০০ সালের জুন মাসে (জুনের ৫ তারিখ) আমার ছেলে মোহনের জন্ম হয় (বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী)। এরপর আমি আবারো হাসপাতালে গেলে আবারো অপারেশন (দিন তারিখ মনে করতে পারছিলেন না) করা হয়। এরপর আমি আবারো গর্ভবতী হয়ে পড়ি। এবার আমার জমজ সন্তান পেটে আসে। সন্তান পেটে আসলে আমি আবারো হাসপাতালে যাই। তখনও ডাক্তারা বলে, ‘তোমার পেটে কোনো সন্তান নেই।’ আমি বলি জমজ সন্তান আছে। এ নিয়ে ডাক্তারদের সাথে আমার কথাকাটাকাটি হয়। তারা জোর দিয়ে বলে তোমার পেটে সন্তান নেই। আর আমি বলি আছে। জমজ সন্তান আছে। এরপর তারা আমাকে যশোরে পাঠায় পরীক্ষা করতে। সেখানে ডাক্তাররা আমার পেট টিপেটিপে ব্যাথা করে দেয়। তখন আমি রাগ করে বলি, ‘আপনারা আমাকে ছেড়ে দেন। আমার পেটে জমজ সন্তান। আর আপনারা শুধু টিপে ব্যাথা করে দিচ্ছেন। পেটের মধ্যে যদি আমার সন্তানরা মারা যায়। আপনারা দায়িত্ব নেবেন?’ এরপর আমার কী যেন পরীক্ষা করা হয়। ডাক্তাররা নিজেরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। পরে আমাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২০০৪ সালে (১ জানুয়ারি ২০০৪) আমার জমজ ছেলে মিলন ও নয়নের (বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী) জন্ম হয়। ওদের জন্মের পর আমাকে হাসপাতালে ডেকে নিয়ে কিছু টাকা দেওয়া হয়। বলা হয়, ‘এনিয়ে তুমি কোন ঝামেলা করো না।’ আমি গরিব মানুষ। আমি কীই বা করবো তুমরাই বলো?’’
প্রতিবেশীরা জানান, সরলার বড় ছেলে মদন তার স্ত্রী নিয়ে আলাদা থাকেন; করিমন চালিয়ে নিজের সংসার চালান। বড় মেয়ে অম্বালিকা থাকেন বাবা-মায়ের সঙ্গে। অন্য মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন দম্পতি। তারা কোনোরকমে কাজকাম করে চলেন। সেজো মেয়ের দুই ছেলে। তারাও বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী। ওদের কোনো জমি নেই। বাবা-মায়ের কাছেন থাকেন। ছোট ছেলে দুটো (মিলন ও নয়ন) স্কুলে যায়। বুদ্ধি অপরিপক্ক হওয়ায় স্কুলে যাওয়া-আসাই সার।
সরলার স্বামী ও বড় মেয়ে প্রতিবন্ধী ভাতা পান।
চৌগাছা পৌরসভার ছয় নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আতিয়ার রহমান বলেন, ওই পরিবারের বড় মেয়ে এবং তার বাবাকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কার্ড অপ্রতুল হওয়ায় পরিবারের সব প্রতিবন্ধীর ভাতা দেওয়া যায় না।
চৌগাছা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নির্মলকান্তি কর্মকার বলেন, বর্তমানে কোন পরিবারে শতভাগ প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। ২০১৬ সালে একটি এনজিওর মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর একটি প্রতিশ্রুতি আছে দেশের সব প্রতিবন্ধীকে ভাতার আওতায় আনা। সেটি হলেই কেবল ওই পরিবারের সবাইকে ভাতা দেওয়া সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন