সাতক্ষীরায় চলছে রস-গুড় তৈরির প্রস্তুতি

আপডেট: 01:47:38 05/12/2019



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : বাঙালির শীতের দিনের অন্যতম আকর্ষণ খেজুরগুড়ের তৈরি পিঠা-পায়েশ। প্রাচীন কাল থেকে অবিভক্ত ভারতে খেজুরগুড়ের জন্য সাতক্ষীরা-যশোর বিখ্যাত ছিল।
দিন বদলের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। শুধু পরিবর্তন হয়নি খেজুরের রস সংগ্রহ এবং গুড়-পাটালি তৈরির পদ্ধতি। শীত মৌসুমের আগমনে গাছিরা খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সাতক্ষীরার জেলার বিভিন্ন গ্রামে ইতোমধ্যে গাছিরা খেজুরগাছ তোলার (মাথা পরিস্কার) কাজ শুরু করেছেন।
অল্পদিনের মধ্যেই গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষ থেকে সুমধুর রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে শুরু হবে গুড়-পাটালি তৈরির উৎসব। গ্রামে গ্রামে খেজুরের রস জ্বালিয়ে পিঠা, পায়েশ, মুড়ি-মুড়কি ও নানা রকমের মুখরোচক খাবার তৈরি করার ধুম পড়বে। সকালে এবং সন্ধায় কাঁচা রস খেতে খুবই মজাদার। রসে ভেজা কাঁচি খোসা পিঠার (চিতই পিঠা) স্বাদই আলাদা। নলেন, ঝোলা ও দানা গুড়ের সুমিষ্ট গন্ধেই যেন অর্ধ ভোজন। রসনা তৃপ্তিতে এর জুড়ি নেই।
ব্রিটিশ আমলে খেজুরগুড় থেকে চিনি তৈরি করা হতো। এই চিনি ‘ব্রাউন সুগার’ নামে পরিচিত ছিল। এই চিনি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেত। ১৮৯০ সালের দিকে আখ থেকে সাদা চিনি উৎপাদন শুরু হলে খেজুরগুড় থেকে তৈরি চিনির উৎপাদনে ধস নামে। একে একে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। খেজুরের গুড় থেকে চিনি তৈরি না হলেও এখন পর্যন্ত বাঙালির কাছে খেজুর গুড়-পাটালির কদর কমেনি।
তবে বিজ্ঞানের এই যুগে এখনো রস থেকে গুড়-পাটালি তৈরিতে মান্ধাতার আমলের পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। গুড়-পাটালি তৈরিতে আধুনিকতা আনা গেলে এটিও রপ্তানি পণ্যের তালিকায় স্থান পেত বলে মনে করেন চাষিরা।
অন্যান্য গাছের মতো খেজুরগাছের বিশেষ যত্নের দরকার হয় না। প্রাকৃতিক নিয়মেই মাঠে পড়ে থাকা খেজুরের আটি (বীজ) থেকে চারা জন্মায়। সৃষ্টি হয় খেজুরের বাগান।
খেজুরগাছ ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এখন জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গুড়, পাটালির উৎপাদন বহুলাংশে কমে গেছে। এখন আর আগের মতো মাঠ ভরা খেজুরবাগানও নেই, নেই মাঠে মাঠে রস জ্বালানো চুলা। পরিসর কমে এসেছে অনেক। পর্যাপ্ত নলেন গুড়, পাটালি পাওয়া দুষ্কর। মৌসুমে যা তৈরি হয় তা নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়।
আবহমান কাল থেকে বাংলায় নবান্ন উৎসব পালনে খেজুরগুড়ের কদর অনেক। সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, কালিগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনি, পাটকেলঘাটা, কলারোয়ার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, গাছিরা গাছ পরিস্কার বা তোলার উপকরণ গাছি দা, দড়ি তৈরিসহ ভাঁড় (মাটির ঠিলে) ক্রয় ও রস জ্বালানোর জায়গা ঠিক করাসহ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত রয়েছেন।
জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার গাছি করিম হোসেন বলেন, ‘‘শীতের মৌসুমে একশ’ থেকে দেড়শ’ খেজুরগাছ তুলতাম। আগের মতো এখন আর খেজুরগাছ নেই। ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের কারণে দিন দিন বিলুপ্তির পথে খেজুরগাছ।’

আরও পড়ুন