সরকার-হেফাজত সখ্য : লাভ-ক্ষতির হিসেব

আপডেট: 09:31:14 25/09/2020



img
img

আকবর হোসেন

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন কওমি মাদরাসা-ভিত্তিক ধর্মীয় সংগঠন হেফাজতে ইসলামের আমির আহমদ শফী। চট্টগ্রামের একটি মাদরাসার প্রধান হিসেবে তিনি অনেকের কাছেই শ্রদ্ধা পেয়েছেন। রাজনীতিতে তিনি আলোড়ন তোলেন ২০১৩ সালের মে মাসে ঢাকায় বিশাল এক সমাবেশ করে। তবে দ্রুতই তিনি সরকারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন এবং এমন কিছু দাবি আদায় করে নেন, যা বাংলাদেশকে আরো বেশি ইসলামিকরণের দিকে নিয়ে যায় বলে তার অনেক সমালোচক মনে করেন।
এখন থেকে প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে, ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে, গণভবনে আলেমদের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুপ্রিম কোর্টের সামনে ভাস্কর্য স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেন।
ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলতে হেফাজতে ইসলাম যে দাবি তুলেছিল, তার সঙ্গে একমত পোষণ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, "সুপ্রিম কোর্টের সামনে মূর্তি আমিও পছন্দ করিনি।"
ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হেফাজতে ইসলামের আমির আহমদ শফীসহ কওমি মাদরাসার নেতারা।
প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর হেফাজতে ইসলাম নেতাদের চোখেমুখে দৃশ্যত এক ধরনের প্রশান্তি দেখা গিয়েছিল, যা ফুটে উঠেছিল টেলিভিশনের পর্দায়।
একই অনুষ্ঠানে কওমি মাদরাসার 'দাওরায়ে হাদিস' শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার মাস্টার্সের সমান মর্যাদা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।
হেফাজতে ইসলামের আমির ও চট্টগ্রামের প্রভাবশালী হাটহাজারী মাদরাসার সাবেক পরিচালক আহমদ শফী গত শুক্রবারে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার আগে ছাত্র আন্দোলনের মুখে তিনি মাদরাসায় তার পদ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
২০১৩ সালের পর থেকে গত সাত বছরে হেফাজতে ইসলামের বেশ কিছু দাবি কার্যত সরকার মেনে নিয়েছে।
তবে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য দাবির প্রতি সরকার কর্ণপাত করেনি। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ব্লাসফেমি আইন প্রণয়ন, নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তিদানের ব্যবস্থা করা এবং প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
এছাড়া ‘কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা’ করার দাবিও সরকার আমলে নেয়নি।
কিন্তু তারপরেও ইসলামপন্থী এই সংগঠনের ভেতরের অনেকেই মনে করেন, ওই সময়ের মধ্যে হেফাজতে ইসলামের নেতা হিসেবে আহমদ শফী যতগুলো দাবি সরকারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করাতে সক্ষম হয়েছেন, সেটি অতীতে কখনো হয়নি।
ক্ষমতাসীনদের সাথে সমঝোতা করেই হোক আর চাপ প্রয়োগ করেই হোক, হেফাজতের দাবি মানাতে সক্ষম হয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত আমির আহমদ শফী।
বিবিসি বাংলাকে দেওয়া ২০১৭ সালের মার্চ মাসের এক সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম স্বীকার করেছিলেন, হেফাজতে ইসলামের সাথে সরকারের এক ধরনের আপস হয়েছে।
"রাজনীতিতে বলুন, সরকার পরিচালনায় বলুন, সবসময়ই ছোটখাটো অনেক সময় আপস করতে হয় বৃহত্তর স্বার্থে। যেমন, এর আগে নারী নীতি নিয়ে কথা হয়েছিল। তখন আমি নিজেই আলেম-ওলামাদের সঙ্গে বসেছি, তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি," বলছিলেন মি. ইমাম।
তিনি বলেন, "তারপর শিক্ষানীতি নিয়ে যখন কথা হয়েছে, তখন আমাদের সরকারের থেকে ক্যাবিনেটেই সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে যে, এই নীতিমালাগুলোতে এমন কিছুই থাকবে না, যেটি শরিয়া-পরিপন্থী, কোরান হাদিসের পরিপন্থী। আসলে থাকেওনি।"
"তার ফলে বিষয়টিকে বলতে পারি, ডিফিউজ করা হয়ে গেছে। না হলে এটা একটা খারাপ রূপ ধারণ করতে পারতো। ওই সুযোগটি তো আমরা দেবো না।"
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, হেফাজতে ইসলাম যেসব দাবি উত্থাপন করেছিল, সেগুলোর মধ্য দিয়ে আহমদ শফী কার্যত বাংলাদেশে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং গতিপ্রকৃতিতে একটি পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন।
ঢাকার শাপলা চত্বরে একটি সমাবেশ আয়োজনের মধ্য দিয়ে হেফাজতে ইসলামের উত্থান হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে তাদের খুব বেশি সময় লাগেনি।
'নাস্তিক ব্লগারদের' শাস্তির দাবিতে হেফাজতে ইসলাম শুরুতে মাঠে নামলেও বেশ দ্রুত তাদের দাবির সংখ্যা বাড়তে থাকে।
সবচেয়ে আলোচিত ছিল তাদের ১৩ দফা দাবি, যেগুলো সরাসরি পূরণ না হলেও পরবর্তীতে সরকার এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে যেগুলো হেফাজতে ইসলামের দাবির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করেন অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক।

কওমি মাদরাসার স্বীকৃতি
শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে এসে সরকারের তরফ থেকে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্স সমমানের হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন নেতা আহমদ শফীর সমঝোতার কারণেই সেটি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করা হয়।
হেফাজতে ইসলামের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং ঢাকার লালবাগ মাদরাসার শিক্ষক মুফতি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, আহমদ শফীর সাথে সরকারের সমঝোতা হয়েছে কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড-কেন্দ্রিক।
"কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতি যেভাবে আহমদ শফী সাহেব চেয়েছেন, সরকারপ্রধান সেটাই করেছেন," বলেন সাখাওয়াত হোসেন।
তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ফারুক খান বলেন, হেফাজতে ইসলামের দাবি অনুযায়ী কওমি মাদরাসার ডিগ্রিকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি।
বরং তার মতে, কওমি মাদরাসা-শিক্ষা আধুনিকায়ন করার জন্যই এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
"আমরা ভেবেছি যে, কওমি মাদরাসার সর্বোচ্চ স্তরকে যদি স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাহলে এই শিক্ষাব্যবস্থার অন্য স্তরগুলোতে তারা আধুনিক সিলেবাস আনবে। তারা ধর্মীয় শিক্ষার সাথে সাথে আধুনিক শিক্ষায়ও শিক্ষিত হবে," বলেন আওয়ামী লীগের এই নেতা।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে ২০১৭ সালে যে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছিল, সেটিকে সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে হেফাজতে ইসলাম আন্দোলন শুরু করে।
এ পর্যায়ে হেফাজতে ইসলামের দাবির প্রতি সমর্থন দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পরবর্তীতে ওই ভাস্কর্যটি সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে সরিয়ে পেছনের দিকে স্থাপন করা হয়।

নারী উন্নয়ন নীতি
২০১১ সালে সরকার একটি নারী উন্নয়ন নীতিমালা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের দাবির মুখে সেটির বাস্তবায়ন স্থগিত হয়ে যায়। এ নিয়ে সরকার আর অগ্রসর হয়নি।
নীতিমালায় সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে নারীদের সমঅধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
হেফাজতে ইসলামের বক্তব্য ছিল, এটা কোরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী।

পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন
২০১৬ সালে হেফাজতে ইসলাম অভিযোগ করেছিল যে, স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে ইসলামি ভাবধারা বাদ দিয়ে ‘নাস্তিক্যবাদ এবং হিন্দুত্ব পড়ানো হচ্ছে’।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণির বাংলা বইয়ে 'ইসলামি ভাবধারার' ১৭টি বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, সাতটি নতুন কবিতা এবং গল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যেগুলো ছিল, সংগঠনটির মতে, 'ইসলামি ভাবধারার বিপরীত'।
সব মিলিয়ে হেফাজতে ইসলামের তরফ থেকে পাঠ্যপুস্তকে ২৯টি বিষয় সংযোজন এবং বিয়োজনের দাবি লিখিতভাবে তুলে ধরা হয়।
২০১৭ সালে যে পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ করা হয়, সেখানে হেফাজতের দাবি অনুযায়ী মোট ২৯টি লেখার সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে বলে ওই সময়ে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছিল।
এ ব্যাপারে মুফতি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, "পাঠ্যপুস্তককে নতুন করে ঢেলে সাজানোর দাবি হেফাজতের ছিল না। হেফাজতের দাবি ছিল, পাঠ্যপুস্তকে যে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা হয়েছিল, সেটাকে বাতিল করে পূর্বের অবস্থায় নিয়ে আসা।"

হেফাজতের অর্জন বাংলাদেশকে কোন দিকে নেবে
বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের একটি অংশ হেফাজতে ইসলামের তীব্র সমালোচনা করে।
তাদের অভিযোগ, হেফাজতে ইসলামকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে সরকার যে ছাড় দিয়েছে, তা ভবিয্যতে বাংলাদেশে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও দেশের গতিপথ পরিবর্তন করে দেবে।
এমন সমালোচনাও রয়েছে যে হেফাজতের অনেক দাবি মেনে নেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের সমাজে ইসলামিকরণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
কিন্তু এর পাল্টা যুক্তিও আছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মের যে প্রভাব অনেকদিন ধরেই ছিল, সেটি আরো প্রকাশ্য এবং দৃঢ় হয়েছে হেফাজতের ইসলামের উত্থানের মধ্য দিয়ে।
"জমিন যদি প্রস্তুত না থাকে, তাহলে এভাবে তো তাদের আচমকা উপস্থিতি সম্ভব নয়," বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক ও রাজনীতির পর্যবেক্ষক শান্তনু মজুমদার।
তিনি স্মরণ করেন যে, শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের সময় সরকারের বাইরে বড় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সমর্থন দিয়েছিল।
তার মতে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনা করে হেফাজতে ইসলামের সাথে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সংঘাতে জড়াতে চায়নি।
"ক্ষমতাসীনরা বুঝতে পারছে যে, এই শক্তির সাথে যদি আমি সংঘাতে যাই, তাহলে বাংলাদেশের সমাজের যে অবস্থা, সেই সমাজে আমাদের আরো এক দফা ইসলামবিরোধী হিসেবে ব্র্যান্ডেড হওয়ার ঝুঁকি থাকে। "
গত সাত বছরে আহমদ শফীর নেতৃত্বে উত্থাপন করা যেসব দাবি পূরণ হয়েছে, সেগুলো হেফাজতে ইসলামকে বেশ খুশি করেছে- তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
হেফাজতে ইসলামের অনেক নেতা মনে করেন যে, গত সাত বছরে তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়েছে 'আদর্শগত দিক' থেকে।
মুফতি সাখাওয়াতের মতে, আওয়ামী লীগের সাথে আলেমদের দূরত্ব থাকার কারণে একটা শ্রেণি সরকারের কাঁধে ভর করে 'নাস্তিক্যবাদ পরিচর্যা' করার চেষ্টা করেছে।
তিনি বলেন, "আমাদের ভয় হয়েছিল যে, এদেশে প্রকাশ্যে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা হবে, টুপি-দাড়ি-হিজাব থাকলে কটাক্ষ করা হবে। এ ধরনের সিচুয়েশন তৈরি করার চেষ্টা করেছিল কিছু মানুষ।"
"ওই ষড়যন্ত্রটা কিছুটা হলেও ধূলিসাৎ হয়েছে, নস্যাৎ হয়েছে। এটাই হেফাজতে ইসলামের সবচেয়ে বড় অর্জন।"
তবে আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক খান বলেন, হেফাজতে ইসলামের যেসব দাবির সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলাদেশে হতে পারতো, সেগুলো সরকারের পক্ষ থেকে মেনে নেওয়া হয়নি।
"আমরা হেফাজতকে শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখেছি। তারা যখন আমাদের সাথে কথা বলেছে, আমরা সেটা পর্যবেক্ষণ করেছি।"
'ধর্মীয় উন্মাদনা' সৃষ্টি করতে পারে, এমন কোন দাবি মানা হয়নি বলেও উল্লেখ করেন মি. খান।
[বিবিসির বিশ্লেষণ]

আরও পড়ুন