সরকারি খাল ইজারা, বিপাকে মানুষ

আপডেট: 02:50:41 22/01/2020



img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : সরকারি খাল, পানি থাকে বারো মাস। এলাকার মানুষ নানা প্রয়োজনে এই খালের পানি ব্যবহার করেন। কৃষকরা পাট মৌসুমে পাট পচন দেন, আবার অনেকে খাল থেকে মাছ ধরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। গৃহস্থরা গরু-বাছুরের গা-গোসল এই খালেই করিয়ে থাকেন।
‘হরিনাকুন্ডু খাল’ নামের সেই উন্মুক্ত খালটি বর্তমানে সরকারি দলের প্রভাবশালী এক নেতাসহ ৭ জনের নামে ইজারা দেওয়া হয়েছে। ঝিনাইদহ জেলা পরিষদ দীর্ঘ প্রায় ১৫ কিলোমিটার লম্বা খালটি মাত্র সাড়ে ৫ লাখ টাকায় ৩ বছরের জন্য ইজারা দিয়েছে। আর উন্মুক্ত এই খালটি ইজারা দেওয়ায় খাল পাড়ের বাসিন্দাদের খালে নামা বন্ধ হয়ে গেছে। জরুরি প্রয়োজনেও তারা পানিতে নামতে বা পানি ব্যবহার করতে পারছেন না। ইজারাগ্রহীতারা পানিতে নামতে নিষেধ করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অথচ ইজারা শর্তে সাধারণ মানুষকে খাল ব্যবহার ও খালে বাঁধ দেওয়া যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে ঝিনাইদহের হরিনাকুন্ডু উপজেলার শহরের পশ্চিমপাশ দিয়ে একটি খাল বেরিয়ে গেছে। খালটিতে শুষ্ক মৌসুমেও পানি রয়েছে। তবে খালের বেশ কিছু স্থানে বাঁশের বেড়া দিয়ে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এভাবে বাঁধ দিয়ে সেখানে মাছ চাষ করা হচ্ছে। কয়েকটি স্থানে মাছ চাষের সুবিধার্থে মাটির বাঁধ দেওয়া হয়েছে। পানি প্রবাহের জন্য সামান্য জায়গা, সেখানে রয়েছে বাঁধ।
স্থানিয়রা বলছেন, সাতব্রিজ থেকে খালটি হিংগারপাড়া পর্যন্ত আনুমানিক ১৫ কিলোমিটার। সোজা রাস্তা দিয়ে গেলে এর দূরত্ব ৯ থেকে ১০ কিলোমিটার।
খাল পাড়ের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে জানান, উপজেলা আওয়ামীলীগের নেতা মোঃ সাজেদুল ইসলাম ওরফে টানু মল্লিকসহ কয়েকজন মিলে এই খালে মাছ চাষ করেন। যারা মাছ চাষ করেন, তারা জানিয়ে দিয়েছেন এই পানিতে নামা যাবে না। নামলে মাছের ক্ষতি হবে।
৫৫ বছর বয়সের এক ব্যক্তি জানান, ছোটবেলা থেকেই খালটি দেখছেন। খালে ইতোপূর্বে মানুষ গোসল করতো। বর্তমানে পানি বদ্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে গোসল করা যায় না। কিন্তু ইজারা দেওয়ার পূর্বে খাল পাড়ের গ্রামগুলোর বাসিন্দারা খালের পানি নানাকাজে ব্যবহার করে আসছিলেন। বিশেষ করে খাল পাড়ের একাধিক বাসিন্দা এখানে মাছ ধরে জীবন চালাতেন। আর পাট মৌসুমে পানিতে পাট জাগ দিতেন। গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের গরু-বাছুরের গোসল এই খালেই হতো। কিন্তু বর্তমানে কেউ খালে নামতে পারছেন না। স্থানীয়রা আরো জানান, ইতোপূর্বে একদফা মাছ চাষ করার সময় এলাকার মানুষের আপত্তির কারণে বাঁধগুলো কেটে দেওয়া হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বাঁধ কাটা হয়। এরপর ২০১৮ সালের শেষদিকে আবারো বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ শুরু করা হয়েছে। এবার তাদের বলা হচ্ছে, ইজারা নিয়ে মাছ চলছে।
সংশ্লিষ্ট অফিসে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ঝিনাইদহ জেলা পরিষদ ২০১৮ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭ জনের নামে দীর্ঘ প্রায় ১৫ কিলোমিটার ইজারা দিয়েছে। হরিনাকুন্ডু খালটি সাতব্রিজ থেকে সরকারি লালনশাহ কলেজ পর্যন্ত ঝিনাইদহ চাকলাপাড়ার জনৈক মোঃ মামুনুর রশীদ, লালনশাহ কলেজ থেকে দক্ষিণে বাজার ব্রিজ ও সেখান থেকে শ্মশানঘাট পর্যন্ত পার্বর্তীপুরের মাহবুব রশীদ ওরফে আজাদ, শ্মশানঘাট কাটাখাল থেকে পার্বর্তীপুর পর্যন্ত নারায়ণকান্দি গ্রামের মোঃ রকিবুল ইসলাম, পার্বর্তীপুর বাজার থেকে শুড়া মাদ্রাসা পর্যন্ত পার্বর্তীপুর গ্রামের মোঃ সাজেদুল ইসলাম এবং শুড়া মাদ্রাসা থেকে বরিশখালী উচুঁ ব্রিজ ও সেখান থেকে হিংগারপাড়া পর্যন্ত নিত্যানন্দপুর গ্রামের মোঃ সাজেদুল ইসলামের নামে ইজারা দেওয়া হয়েছে। মোট প্রায় ১৫ কিলোমিটার এই খালটি ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টাকায় তিন বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে।
জেলা পরিষদের এক কর্মকর্তা জানান, তারা ইজারা দিয়েছেন মাছ চাষের স্বার্থে। দেশে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য খালে মাছ চাষ করতে এই ইজারা। তবে তাদের শর্ত রয়েছে, বাঁশ দিয়ে বাঁধ দেওয়া যাবে না। মশারির কাপড় দিয়ে মাছ আটকে চাষ করা যাবে। এছাড়া খালের পানি জনসাধারণের ব্যবহারে বাধা দেওয়া যাবে না। এই শর্ত ভঙ্গ করলে ইজারা বাতিল হবে।
এ বিষয়ে জেলা পরিষদের সচিব রেজাই রাফিন সরকার জানান, খাল জনসাধারণ ব্যবহার করবে। এটা বন্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। ইজারা দেওয়া হলেও জনগণের ব্যবহার করতে দিতে হবে এই মর্মে শর্ত রয়েছে। কেউ এটার শর্ত ভঙ্গ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। বিষয়টি তিনি দ্রুত দেখবেন বলে জানান।
ইজারা নেওয়া ব্যক্তিদের একজন হরিনাকুন্ডু উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোঃ সাজেদুল ইসলাম ওরফে টানু মল্লিক জানান, তারা পানিতে নামতে কাউকে বাধা প্রদান করেননি। যারা ইতোপূর্বে মাছ ধরতেন, তাদের একটু সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া এই খালের পানিতে কেউ নামতে চায় না, পানি বদ্ধ থাকায় নামার উপযোগী নেই।
তিনি আরো বলেন, সরকারের সব নিয়ম মেনে জেলা পরিষদ থেকে ইজারা নিয়ে এই মাছ চাষ করা হচ্ছে।



আরও পড়ুন