রাজনীতির মোড়

আপডেট: 10:51:19 16/02/2020



img
img

চন্দন দাস, বাঘারপাড়া (যশোর) : রাজনীতির মোড়। কেউ বলেন, ‘রাজনীতির বাজার’। বছর ১৫ আগে এ নামকরণ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এখানে যারা বিকিকিনি করেন বা সময় কাটাতে আসেন, তাদের সবাই খেটে খাওয়া মানুষ। এর মধ্যে বেশিরভাগই কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। এখানে যে অন্য পেশার মানুষের পা পড়ে না, তা বললে ভুল হবে। আসেন জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। ভোরবেলায় সূর্যিমামা উঁকি দেওয়ার সাথে সাথেই ভীড় বাড়ে এখানে। রাজনীতির আলোচনায় চায়ের কাপে ঝড় তোলেন তৃণমূলের মানুষেরা। দুই উপজেলাবাসীর উপস্থিতি যেন পরিণত হয় মিলনমেলায়।
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার বন্দবিলা ইউনিয়নের প্রেমচারা গ্রামে ‘রাজনীতির মোড়’-এর অবস্থান। এ গ্রামের উত্তর-পূর্ব পাশে মাগুরা জেলার শালিখা উপজেলার তালখড়ি ইউনিয়নের ভরতপুর গ্রাম। শুধু এ দুই উপজেলার দুই গ্রামের বাসিন্দারাই নন, রাজনীতির মোড়ে গেলে দেখা মিলবে আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষের।
বাঘারপাড়া উপজেলার দক্ষিণ চাঁদপুর গ্রামের বয়োবৃদ্ধ কৃষক ইদ্রিস আলী জানান, ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে ‘রাজনীতির মোড়ে’ মানুষ আসতে শুরু করেন। এদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ পেশায় কৃষক। মাঠের কাজে যাওয়ার আগে তারা এক কাপ গরম চা পান করতে আসেন এখানে। আবার মাঠের কাজ শেষে সন্ধ্যাবেলা আড্ডা জমান তারা। এই মানুষেরাই রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেন।
শালিখা উপজেলার ভরতপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, ‘‘২০০৫ সালে প্রেমচারা গ্রামের হাকিম আলী নামে এক ব্যক্তি চায়ের দোকান বসান এখানে। একমাত্র ওই চায়ের দোকানে আশপাশের গ্রামের মানুষেরা চা খেতে এসে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন। তখন থেকেই এ মোড়টির নাম দেওয়া হয় ‘রাজনীতির মোড়’। সাইনবোর্ড টানানো হয় এ নামে। আমি তখন থেকেই রাজনীতির মোড়ে দু’বেলা চা খেতে আসি। এখনো সব দলের লোকই (বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থক) এখানে আসেন। নানা বিষয়ের সাথে আলোচনা হয় সমসাময়িক রাজনীতি নিয়েও।’
তবে বাঘারপাড়ার উপজেলার দক্ষিণ চাঁদপুর গ্রামের বৃদ্ধ আমজাদ আলী জানান, ২০০৫ সালে স্থানীয় ইউনুস আলী নামে একজন ‘রাজনীতির মোড়’ নামে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেন এখানে। সেই থেকে রাজনীতির মোড়ের নাম প্রচার হতে থাকে। স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন চলাকালীন দুই উপজেলার প্রার্থী-ভোটাররা মিলিত হন এখানে।
শালিখার ভরতপুর গ্রামের বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধ আব্দুল গফফার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘বছর পনের আগে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) গঠন হওয়ার পর একদিন শীতের সকালে র‌্যাবের একটি দল এখানে এসে জানতে চান, ‘রাজনীতির মোড় নাম কেন?’ জবাবে তারা বলেন, গ্রামের খেটে-খাওয়া মানুষ এখানে চা খেতে এসে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেন। যে কারণে এ নাম দেওয়া হয়েছে।’’
সে সময় র‌্যাব সদস্যরাও মাঝে মাঝে এখানে চা খেতে আসতেন বলেও উল্লেখ করেন এই বৃদ্ধ।
‘রাজনীতির মোড়’-এর চা দোকানি আরমান সিকদার বলেন, ‘আমার বাবা হাকিম আলী সিকদার প্রথম এখানে একটি চায়ের দোকান বসান। ২০১৬ সালে বাবা মারা যাওয়ার পর আমি দোকানটি আরো বড় করে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা এখানে বেশি ভিড় হয়। বাঘারপাড়া ও শালিখা উপজেলার কয়েক গ্রামের মানুষ এখানে আসে নিয়মিত।’
শালিখা উপজেলার তালখড়ি ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজ মণ্ডলের সঙ্গে কথা হয় ‘রাজনীতির মোড়’-এ বসে। তিনি বলেন, ‘‘আমি এখানে নিয়মিত চা খেতে আসি। আমার এলাকার অনেকেই আসেন এখানে। এখানকার স্থানীয় মানুষেরা বাজারটির নাম দিয়েছেন ‘রাজনীতির মোড়’।’’
বাঘারপাড়া উপজেলার বন্দবিলা ইউপি চেয়ারম্যান সবদুল হোসেন খান বলেন, ‘প্রেমচারা এলাকা এক সময় সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। ভালো-মন্দ মানুষের আনাগোনা ছিল এখানে। তবে এখন আর সে অবস্থা নেই। তৃণমূল মানুষেরা সময় কাটাতে আসেন রাজনীতির মোড়ে। সকাল-সন্ধ্যা সীমান্তবর্তী দুই উপজেলার মানুষেরা এখানে চা খেতে এসে রাজনীতির আলোচনায় মশগুল থাকেন। যে কারণে ব্যতিক্রমী এ নাম দিয়েছেন এখানকার মানুষ।’