যশোর বিআরটিএ-তে 'বারো কুতুবের' প্রতারণার জাল

আপডেট: 09:45:36 21/01/2021



img

শহিদুল ইসলাম দইচ : যশোর বিআরটিএ দপ্তরে লাইসেন্স করে দেওয়ার নামে প্রতারণা করছে ১২ জনের একটি চক্র। এর মধ্যে দুইজন অফিসের কর্মী এবং অন্যরা 'দালাল' হিসেবে পরিচিত। চক্রটি দপ্তরটির প্রধান কর্তা কাজী মো. মোরসালিনের আশীর্বাদপুষ্ট বলে অভিযোগ। এই কর্মকর্তা চক্রের সদস্যদের আদর করে ‘বারো কুতুব’ বলে ডাকেন; যাদের মাধ্যমে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হন।
তথাকথিত ওই বারো কুতুব হলেন, অফিস সহকারী সাজু ও আবু মুছা, দালাল হিসেবে পরিচিত শহরের বকচর এলাকার বাসিন্দা বকুল, শাহিন, সুমন, তুহিন, রাব্বি, বেজপাাড়র বাসিন্দা মনিরুল, শহরতলীর বিরামপুরের আব্বাস, ঝিকরগাছার ইয়াছিন, বাগাআঁচড়ার তুহিন এবং ঝিনাইদহের রিপন।
যশোর বিআরটিএ অফিস নিয়ে প্রচার রয়েছে যে, এখানে টাকা দিলে যে কোনো কাজ অনায়াসেই করা সম্ভব। তবে এর জন্য ধরতে হবে নির্ধারিত চ্যানেল। আর ওই চ্যানেলে না গেলে দপ্তরটিতে স্বাভাবিক নিয়মে কোনো কাজ হতেই চায় না। দিনের পর দিন ঘোরানো হয় সেবাগ্রহিতাদের। এতে করে অতিষ্ট হয়ে দালালদের চ্যানেল ধরতে বাধ্য হন তারা। এ চ্যানেল ধরে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে কাজ হলেও অনেকে পড়েন প্রতারকের খপ্পরে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দূরদূরান্ত থেকে সাধারণ মানুষ যশোর বিআরটিএ অফিসে আসেন গাড়ির ফিটনেস, মালিকানা বদল, ট্যাক্স টোকেন ও ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ বিভিন্ন কাজ করাতে। ঘণ্টার পরে ঘণ্টা লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে অফিসে প্রবেশ করলেও 'কাগজপত্রের সমস্যা' বলে পরে আসতে বলা হয় সেবাপ্রত্যাশীদের। ঘুরতে ঘুরতে একপর্যায়ে দালাল চক্রের সহায়তা নিতে বাধ্য হন তারা। আর এ সুযোগে দপ্তরের বাইরে থাকা দশ দালাল কাজ ধরে অফিস সহকারী সুজা ও আবু মুছাকে দেন। এরপর তারা দপ্তরটির প্রধান কর্তা কাজী মো. মোরসালিনের মাধ্যমে কাজটি করে দেন।
মাগুরা সদর উপজেলার বাহারবাগ গ্রামের ফকর উদ্দিন মোল্লার ছেলে মো. সবুজ পারভেজ যশোর বিআরটিএ দপ্তরে চালক হিসেবে লাইসেন্স করতে এসে ওই চক্রের খপ্পরে পড়েন। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, 'লাইসেন্সের কাগজ জমা দিলে অফিস থেকে বলা হয় কাগজের ভুলত্রুটি আছে। এভাবে কয়েকবার ঘুরিয়েছে। পরে আমি দালালদের মাধ্যমে অফিস সহকারী সাজুর শরণাপন্ন হই। আমার সাথে আরো তিনজন লাইসেন্সের জন্য তার সাহায্য চান। এরপর তিনি চারটি ড্রাইভিং লাইসেন্স (মাইক্রোবাস) করতে ১৩ হাজার টাকা করে মোট ৫২ হাজার টাকা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন বাবদ তিন হাজার করে মোট ১২ হাজার টাকা নেয়। এর মধ্যে একটি লাইসেন্স করে দিয়েছে। কিন্তু আমারসহ তিনটি লাইসেন্স করে দেয়নি। তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি দেখা করে না। এখন মোবাইলে কল দিলেও ধরে না।'
রেজাউল নামে একজন সেবাপ্রত্যাশী বলেন, 'আমি ট্রাকের কাগজ করতে গেলে এক দালালের সাথে পরিচয় হয়। তিনি অফিস সহকারী সাজুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। ট্রাকের ফিটনেস ও মালিকানা বদল করাতে সাজু দুই লাখ টাকা দাবি করেন। দাবিকৃত টাকা দেওয়া হলেও সাজু কাজটি করে দেয়নি। প্রায় দুই বছর ধরে আমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এখন বলে কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না নতুন করে ব্যাংকে টাকা জমা দিলে কাজ করে দেবে।'
লুলু মিয়া নামে অপর একজন বলেন, 'যশোর বিআরটিএ অফিস এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। আমি ও আমার দুই পরিচিত ড্রাইভার তিনটি ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে দালালদের সহায়তায় অফিস সহকারী সাজুর কাছে ৪৮ হাজার টাকা দিয়েছি। সাজু যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে আমাদের ডেকে নিয়ে যায় এবং ওই টাকা গ্রহণ করে। প্রায় দেড় বছর ধরে টালবাহানা করছে সাজু। তার পেছনে পেছন ঘুরতে ঘুরতে হয়রান হয়ে গেছি। তার কাছ থেকে মাত্র ৫০০ টাকা আদায় করতে পেরেছি। বাকি টাকা চাইলে সাজু হুমকি-ধামকি দেয়।'
লুলু মিয়া আরো বলেন, 'বহু লোক সাজুর প্রতরণার শিকার। বিআরটিএ অফিস এলাকায় ঘুরতে ঘুরতে জেনেছি তার দশ দালাল খদ্দের ধরে দেয় আর সে টাকা হাতিয়ে নেয়।'
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সাজু ও মুছা দুইজনে মিলে ওই দশ দালালকে পুষে রেখেছেন। তাদের দিয়ে নিজেরা যেমন লাভবান হয়েছেন তেমনি দালালরা হয়েছেন সম্পদের মালিক। কেবল দালালি করেই তারা একেকজন বহুতল ভবনের মালিক।
সূত্র আরো জানিয়েছে, কেবল সাজু ও মুছা নন, এ অপকর্মের সাথে যশোর বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক কাজী মো. মোরসালিনও জড়িত। তার আস্কারায় এ দালাল চক্র ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। তিনি চক্রটিকে আদর করে ‘বারো কুতুব’ বলেও অভিহিত করেন।
অভিযুক্ত সাজুর বক্তব্য নিতে বিআরটিএ অফিসে খোঁজ করা হলে জানা যায়, তিনি বর্তমানে যশোর অফিসের অধীন নড়াইল বিআরটিএ-তে কর্মরত। সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, সাজু নড়াইলে থাকলেও যশোরের কাজ অনায়াসেই করে দেন। এজন্য তিনি মোবাইলে অফিস সহকারী মুছাকে বলেন। এরপর মুছা কাজ করে দেন।
খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে জানতে পেরে সাজু এ প্রতিবেদককে ফোন দেন। পরে তিনি নড়াইল থেকে ফিরে এসে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। যশোরে এসে তিনি সকল অভিযোগ শুনে প্রতারিতদের টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করেন এবং সংবাদ প্রকাশ না করতে অনুরোধ করেন।
জানতে চাইলে বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক কাজী মো. মোরছালিন দাবি করেন, তার দপ্তরে কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। এখন লাইসেন্সের আবেদন অনলাইনে করা সম্ভব।
তিনি আরো বলেন, সাজু নামে একজন ইতিপূর্বে তার অফিসে কর্মরত ছিলেন। তিনি এখন নড়াইল অফিসে কর্মরত। অফিসের কেউ যদি অনিয়ম ও প্রতারণার সাথে জড়িত থাকে তবে তদন্তসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 'আর আপনি যে দালালদের কথা বলছেন ওই বিষয় সম্পর্কে আমি কিছু জানি না।'
বিআরটিএ অফিসে অনিয়ম ও প্রতারণার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে যশোরের জেলা প্রশাসক মো. তমিজুল ইসলাম খান বলেন, 'বিআরটিএ একটি স্বতন্ত্র দপ্তর। তাদের বিষয়ে আমার হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।'
পুলিশ সুপার মুহাম্মাদ আশরাফ হোসেন বলেন, দালালি ও দুর্নীতির বিষয় হলে দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন ) বিষয়টি দেখবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কেউ থানায় প্রতারণার অভিযোগ দিলে তা খতিয়ে দেখা হবে।  
এবিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যশোরের উপ-পরিচালক নাজমুছ সাদাত বলেন, 'দুর্নীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা তা তদন্ত করে দেখবো। দুর্নীতি রোধ করাই আমাদের কাজ।'

আরও পড়ুন