মোচিক শ্রমিক ইউনিয়নের কমিটি হলো গোপনে!

আপডেট: 09:32:13 09/03/2021



img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : মোচিক শ্রমিক ইউনিয়নের ১৩টি পদের সবাই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, সেটাও গোপনে। ইউনিয়নের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়নি, শ্রমিকরা পাননি ভোটের তফসিল। মনোনয়নপত্র বিক্রি থেকে শুরু করে ভোটের কোনো পক্রিয়া প্রকাশে হয়নি। এমনকি সংগঠনটির গঠনতন্ত্রে নির্বাচন প্রক্রিয়া শ্রম অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হওয়ার সুষ্পষ্ট আইন থাকলেও সেটাও করা হয়নি।
সংগঠনের সদস্যরা বলছেন কখন তফশিল ঘোষণা, কখন ভোটার তালিকা প্রকাশ, সর্বোপরি ভোট হয়ে গেল তারা কেউ কিছুই জানতে পারলেন না। এখন ভোট দেওয়ার দাবি করতেও ভয় পাচ্ছেন তারা। এমনকি বদলি আর হামলার আশংকায় শ্রমিকরা ভোট নিয়ে কথা বলার সাহসই হারিয়ে ফেলেছেন।
ঝিনাইদহ কালীগঞ্জ উপজেলায় ১৯৬৫ সাল প্রতিষ্ঠা করা হয় মোবারকগঞ্জ চিনিকল। যে চিনিকলের শ্রমিকদের প্রয়োজনে ১৯৭৪ সালে গঠিত হয় মোবারকগঞ্জ চিনিকল শ্রমিক ও কর্মচারি ইউনিয়ন নামের শ্রমিক ইউনিয়ন। ইতিপূর্বে সংগঠনটির কার্যনির্বাহী পরিষদ ছিল ২৫ সদস্য, বর্তমানে ১৩ সদস্যের। দুইবছর পর ভোটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের আইন রয়েছে। ২০১৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে সভাপতির পদসহ চার পদে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।  
কিন্তু এবার ভোটের গোটা প্রক্রিয়া করা হয়েছে গোপনে টেবিলে বসে। শ্রমিক নেতারা বলছেন, ইতিপূর্বে জোর করে ২/৪ টি পদ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাশ করানো হতো, এবার ভোট প্রক্রিয়ায় বন্ধ করা হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সমর্থনপুষ্ট কিছু নেতা ও স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধির বন্ধুরা নির্বাচন না করে আবারো দুইবছরের জন্য ক্ষমতায় থাকতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। তারা গোপন নির্বাচনের ফলাফল শ্রম অধিদপ্তরে জমা দিয়েছেন। অবশ্য শ্রম অধিদপ্তরে জমা দেওয়া ওই ফলাফল গ্রহণ করেনি। তারা সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি আদেশের প্রেক্ষিতে ট্রেড ইউনিয়নের কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন উপ-পরিচালক ও রেজিস্ট্রার ইব ট্রেড ইউনিয়ন্স, কুষ্টিয়ার তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হওয়ার আবশ্যকতা জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন।
শ্রমিকনেতারা আরো জানান, চিনিকলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের যোগদান ও বিগত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিদায় উপলক্ষে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় গত ১৪ জানুয়ারি চিনিকল ক্যাম্পাসে। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। সেখানে বর্তমান পরিষদের ২-১ জন ও সাধারণ শ্রমিকদের ২-১ জন বর্তমান পরিষদের গুণগান করে তাদের আবারো রাখার প্রস্তাব করেন; যা ছিল সাজানো। এরপর থেকে শুরু হয় চক্রান্ত। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আঞ্চলিক শ্রম দপ্তর কুষ্টিয়া থেকে পাঠানো এক চিঠি দেখে তারা হতাশ হয়েছেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে মোবারকগঞ্জ চিনিকল শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের নির্বাচন ২০২১-এর বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনী ফলাফল ও ভোটার তালিকা অত্র দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে। যার কিছুই তারা জানেন না।  
গোপন নির্বাচনের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, তারা চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচনী তফশিল ঘোষণা করেছেন। যেখানে ৭ ফেব্রুয়ারি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ ও পদভিত্তিক প্রতীক প্রকাশ, একই দিন সকাল দশটা থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি বিকেল তিনটা পর্যন্ত ভোটার সংশোধনী আবেদন গ্রহণ, ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে নয়টায় চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ, একই দিন সকাল দশটা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র বিক্রি, একই সাথে ওই দিনই সকাল সাড়ে দশটা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র গ্রহণ, যাচাই-বাছাই শেষে ওই দিনই বিকেল পাঁচটায় পদভিত্তিক প্রার্থীতালিকা প্রকাশ, ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল আটটা হতে বিকেল চারটা পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার, ১৩ ফেব্রুয়ারি পদভিত্তিক প্রতীকসহ চূড়ান্ত প্রার্থীতালিকা প্রকাশ এবং ২২ ফেব্রুয়ারি সকাল আটটা হতে একটানা বিকেল চারটা পর্যন্ত মোবারকগঞ্জ চিনিকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভোটগ্রহণ, ভোট গ্রহণ শেষে ওই দিনই বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণা।
ঘোষিত তফশিলে আরো দেখা যায়, মোচিক শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের কার্যকরী পরিষদের ০২ ফেব্রুয়ারি তারিখে মোচিক/ শ্রঃইউঃ/২০২১-২২/০২ স্মারকের চিঠি ও গঠনতন্ত্র মোতাবেক সোহেল আহম্মেদকে আহ্বায়ক, মো. রফিকুল ইসলামকে যুগ্ম আহ্বায়ক, মো. মনিরুজ্জামান, মো. আবুল হোসেন ও মো. কবির আলমকে সদস্য করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি অস্থায়ী নির্বাচনী কার্যালয় (মোচিক সাধারণ ক্লাব অফিস) সভা করে এই তফশিল ঘোষণা করা হয়। সভায় নির্বাচনের বিষয়ে সার্কুলার করার জন্য মোচিকের সকল নোটিস বোর্ড, ক্যান্টিন, নির্বাচনের অস্থায়ী কার্যালয়ের নোটিস বোর্ডে সাঁটানোসহ প্রয়োজনে অনান্য মাধ্যমেও প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়।
অথচ কোনো কিছুই না করে 'বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৩টি পদে নির্বাচিত' উল্লেখ করে ফলাফল তৈরি করা হয়েছে। নির্বাচনে যাদের বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে তারা হলেন সভাপতি পদে মো. গোলাম রসুল, সহ-সভাপতি পদে মো. ফজের আলী, সাধারণ সম্পাদক পদে মো. শরিফুল ইসলাম-৩, সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে মো. রফিকুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ফিরোজ আহমেদ, কোষাধ্যক্ষ পদে মো. মশিয়ার রহমান, দপ্তর সম্পাদক পদে মো. সায়েম বিশ্বাস, প্রশাসন ও হিসাব বিভাগের কার্যনির্বাহী সদস্য মো. সাইদুর রহমান (পিকু), ইক্ষু বিভাগে মো. মহি উদ্দীন-২, মোছা. সালমা খাতুন, পরিবহন বিভাগে মো. নজরুল ইসলাম-৩ এবং কারখানা বিভাগের সদস্য মো. রবিউল ইসলাম ও মো. আক্তারুজ্জামান।
শ্রমিকনেতারা জানান, বর্তমান পরিষদের ইক্ষু বিভাগের সদস্য আনসার আলী চাকরি থেকে সদ্য অবসরে যাওয়ায় ওই স্থানে মোছা. সালমা খাতুনের নাম দেওয়া হয়েছে। বাকি সবগুলো পদেই পুরনোরা বহাল রয়েছেন।
এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া আঞ্চলিক শ্রম দপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানান, একটি ফলাফল তাদের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। যেটা সঠিক নিয়মে না হওয়ায় তারা গ্রহণ করেননি।
শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচনের যে ফলাফল জমা দেওয়া হয়েছে সেখানে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে চিনিকলের কর্মচারী সোহেল আহম্মেদের নাম রয়েছে। তিনি জানান, তারা ভোটের কোনো ফলাফল জমা দেননি। তিনি এখনো দায়িত্ব নেননি।
শ্রম অধিদপ্তরের চিঠির বিষয়ে জানানোর পর বলেন, সেটা সাধারণ সভার কাগজ দিয়েছেন।
আর বর্তমান কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জানান, চিনিকল বাঁচানোর স্বার্থে পুরনো কমিটি আবারো থেকে যাক- এটা শ্রমিকরা চান। যে কারণে ভোট না করার কথা হয়েছে।
কীভাবে নতুন পরিষদ তৈরি হবে জানতে চাইলে 'সবকিছু হয়ে যাবে' বলে উল্লেখ করেন। এভাবে নেতা হওয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত প্রশ্ন করলে 'উত্তর দিতে পারছেন না' বলে জানান তিনি।

আরও পড়ুন