মাগুরায় দুই খুনের জেরে পুরুষরা ঘরছাড়া নিরাপত্তাহীন নারীরা

আপডেট: 03:39:28 23/11/2020



img
img

এস আলম তুহিন, মাগুরা : মাগুরা সদরের হাজরাপুর ইউনিয়নে সামাজিক বিরোধ নিয়ে দুটি হত্যাকাণ্ডের জের ধরে নন্দলালপুর ও ছাচানী গ্রামে অব্যাহতভাবে চলছে বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাটের ঘটনা।
প্রতিপক্ষের বাড়িতে থাকা মালামাল, গরু, ছাগল, গবাদি পশু লুটপাটের পাশাপাশি শত-শত ফলবতী বৃক্ষ কেটে ফেলা হচ্ছে। হামলা-মামলার ভয়ে পুরুষেরা গ্রাম ছেড়েছেন। বাড়ির নারী সদস্যদের দিন কাটছে নিরাপত্তাহীনতায়। সব মিলিয়ে গ্রাম দুটিতে বিরাজ করছে চরম আতংক।
তবে পুলিশ বলছে, গ্রাম দুটিতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সদর উপজেলার নন্দলালপুর গ্রামে আধিপত্য বিস্তার ও সামাজিক দলাদলি নিয়ে শরিফুল মোল্লা ও জাকির হোসেন লিটন নামে দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। শরিফুল ও লিটন- দুইজনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরোধের জের ধরে গত ১৬ নভেম্বর রাতে প্রতিপক্ষ শরিফুল মোল্যার লোকজন কুপিয়ে হত্যা করে জাকির হোসেন লিটনকে। এই খুনের পর হামলা-মামলার ভয়ে শরিফুল মোল্লার সমর্থকরা গ্রাম ছেড়েছেন। এই সুযোগে প্রতিপক্ষের সমর্থকরা এ গ্রামের ২৫ থেকে ৩০টি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। বাড়ির সব মালামালের পাশাপাশি লুট হয়ে গেছে গরু, ছাগল পর্যন্ত। এখনো ভাঙচুর, লুটপাট অব্যাহত থাকায় বাড়ির নারী ও শিশুদের দিন কাটছে চরম আতংকে।
নন্দলালপুর গ্রামের সঞ্জু ও রঞ্জুর রহমানের মা আমেনা বেগম বলেন, তারা সামাজিক দলের সঙ্গে থাকলেও তার ছেলেরা মারামারি খুনোখুনির সঙ্গে জড়িত নয়। তারপরও লিটন খুনের পর ভয়ে তার ছেলেরা বাড়ি ছেড়েছেন। এই সুযোগে প্রতিপক্ষ দলের লোকেরা দিনদুপুরে তার বাড়িঘরে হামলা করে ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে। তার গোয়াল থেকে নয়টি গরু ও দশটি ছাগল লুট হয়েছে। বাড়িঘর ভাঙচুর করেছে।
তবে নিহত লিটনের এক চাচাতো ভাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ করলেও শরিফুল এলাকার দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ। এর আগে শরিফুল তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে লিটনের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট করেছে। এলাকার অনেক মানুষ নানাভাবে তার অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার।
এদিকে, গত ১ নভেম্বর একই ইউনিয়নের ছাচানী গ্রামে মাছুদ মোল্লা নামে অপর এক আওয়ামী লীগ কর্মীকে প্রতিপক্ষ কুপিয়ে হত্যা করে। হাজরাপুর ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বারিক মোল্লা ও একই ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আবু কালামের মধ্যে সামাজিক বিরোধের জের ধরে এই খুনের ঘটনা ঘটে। নিহত মাছুদ মোল্লা ছিলেন বারিক মোল্লার সমর্থক। এই খুনের পর থেকে ছাচানী গ্রামে চলে আসছে ব্যাপক বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট। বারিক মোল্লার সমর্থকরা প্রতিপক্ষ আবু কালামসহ তার সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর-লুটপাট চালায়। আবু কালামের পাকা বাড়ি মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। অধিকাংশ বাড়ির গরু-ছাগল লুট হয়েছে। বিশেষ করে তারা আবু কালামসহ তাদের সমর্থকদের কয়েক শত লিচুগাছসহ বিভিন্ন ফলের গাছ কেটে ফেলেছে। বর্তমানে হামলা-মামলার ভয়ে এ গ্রামের আবু কালাম সমর্থক পুরুষরা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যে কারণে নারী সদস্যদের দিন কাটলেও; রাত কাটছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়।
ছাচানী গ্রামের বাদশা মিয়ার স্ত্রী জাকেরা বেগম বলেন, মাছুদ হত্যার জের ধরে প্রতিপক্ষরা তার বাড়ি পাঁচটি ঘর ভাঙচুর করে, সব মালামাল লুট করেছে। ওজু করার বদনা পর্যন্ত নিয়ে যায়। তার ও আবু কালামের কয়েকশ’ লিচু গাছ করাত দিয়ে কেটে ফেলেছে। পুরুষরা হামলা-মামলার ভয়ে বাড়ি উঠতে পারছে না। নারীরাও চরম নিরাপত্তাহীনতায় আছেন। কারণ প্রতিপক্ষরা নারীদের হুমকি দিয়েছে বাড়ি না ছাড়লে ইজ্জত নেওয়া হবে, গায়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হবে। যে কারণে রাতে তারা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেও বাইরে বের হতে সাহস করেন না।
তবে প্রতিপক্ষ নিহত মাছুদের বাবা দাউদ মোল্লা বলছেন, আবু কালাম ও তার ছেলেরা এলাকায় নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। তারা শুধু তার ছেলে মাছুদকে কুপিয়ে হত্যা করে থেমে থাকেনি। তারা গ্রামে লুটপাট চালিয়ে তাদের ঘাড়ে দায় চাপাচ্ছে।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মুহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, হাজরাপুর ইউনিয়নে নন্দলালপুর ও ছাচানী গ্রামে সামাজিক বিরোধ নিয়ে দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দুটি গ্রামে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। খুনের ঘটনার পর গ্রাম দুটিতে উত্তপ্ত অবস্থা বিরাজ করলেও এখন শান্ত। পুলিশ সকল ঘটনার যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে।

আরও পড়ুন