মণিরামপুর নির্বাচন অফিসে গণভোগান্তি

আপডেট: 08:42:13 09/09/2021



img

মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি: ভোটার স্থানান্তর, ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি, হারিয়ে যাওয়া জাতীয় পরিচয়পত্র পুনরুদ্ধারসহ নানা সমস্যায় মণিরামপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসে ভিড় জমে সেবাগ্রহীতাদের। কিন্তু সেবার বিপরীতে এই অফিসে আগতদের পড়তে হয় নানা ভোগান্তিতে। কখনও কর্মকর্তা থাকেন না, আবার থাকলেও অফিসের কর্মচারীদের রূঢ় আচরণে ক্ষুব্ধ হন সেবাগ্রহীতারা।
দীর্ঘদিন এমন অভিযোগ শোনা যায় মণিরামপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে। সরেজমিন অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল দশটা ১৫ মিনিট। মণিরামপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসের দোতলায় গিয়ে নির্বাচন কর্মকর্তার অফিস কক্ষের দরজা বন্ধ পাওয়া যায়। খোঁজ নিতে জানা গেল, দরজা বন্ধ করে ভেতরে এসির ঠান্ডা বাতাস খাচ্ছেন বজলুর রশিদ। তিনি মণিরামপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার দায়িত্বে। অফিসের সামনে ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে অর্ধ শতাধিক নারী-পুরুষ। দরজা বন্ধ থাকায় কেউ ভেতরে ঢুকতে পারছেন না।
তখন এই প্রতিবেদক ভেতরে ঢুকে নিজের পরিচয় দেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তড়িঘড়ি সেবাগ্রহীতাদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেন তিনি।
এই প্রতিবেদকের সামনে কয়েকটি আবেদন দেখা শুরু করেন কর্মকর্তা। প্রথমে ফাইল হাতে নেন মাহমুদকাটি থেকে আসা লতিফা খাতুন নামে এক বাক প্রতিবন্ধীর। সাথে এসেছিলেন এলাকার বিনোদ রায় নামে এক ব্যক্তি। কেন লতিফা এতদিন ভোটার হননি, স্বাক্ষর নেই কেন, এটা নেই কেন, ওটা নেই কেন- কর্মকর্তা রূঢ় ভাষায় নানা প্রশ্নে জর্জরিত করেন লতিফাকে। বাক প্রতিবন্ধী লতিফা নির্বাক। চেয়ারম্যানের প্রত্যয়ন, নাগরিক সনদ সবকিছু ঠিক থাকলেও লতিফার আবেদন গ্রহণ করতে চাননি তিনি। অবশেষে বিনোদ রায়ের কাছ থেকে লিখিত নিয়ে তিনি আবেদনটি গ্রহণ করেন।
চণ্ডিপুর গ্রাম থেকে স্ত্রী জেসমিন খাতুনের নতুন ভোটারের আবেদন নিয়ে আসেন বজলুর রশিদ। সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও গেল সপ্তাহের বুধবার তাকে ফেরত দেন এই নির্বাচন কর্মকর্তা। বৃহস্পতিবার (৯ সেপ্টেম্বর) সকালে আবার এসেছেন। এইদিনও তাকে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
বজলুর রশিদের মতো এই নির্বাচন কর্মকর্তার রূঢ় আচরণে ক্ষুব্ধ মাহমুদকাটি গ্রামের আছিয়া বেগম, বিজয়রামপুর গ্রামের সৌদি প্রবাসী বদিয়ার রহমানসহ অনেকে।
বদিয়ার রহমান বলেন, ‘সৌদি থাকায় ভোটার হতে পারিনি। কয়েকদিন ধরে নির্বাচন অফিসে ঘুরছি। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কর্মকর্তার টেবিলে আবেদন জমা দিয়েছি। সেখান থেকে হাওয়া হয়ে গেছে আমার আবেদন। তখন খোঁজাখুঁজি শুরু হলে খারাপ আচরণ করেন ওই কর্মকর্তা এবং পিওন হাসান। পরে জানা গেল পিওন হাসানই টেবিল থেকে হাতে করে আমার আবেদন নিয়ে গেছে।’
বদিয়ারের অভিযোগ, এই অফিসের কারও ব্যবহার ভালো না।
চণ্ডিপুর গ্রামের বজলুর রশিদ বলেন, “স্ত্রীকে ভোটার বানাবো বলে ফেব্রুয়ারি মাস থেকে নির্বাচন অফিসে ঘুরছি। আজ না কাল বলে ঘুরাচ্ছে। গত সপ্তাহের বুধবারে এসেছি, কাগজপত্র দেখে বললেন, ‘আপনার স্ত্রী রোহিঙ্গা কিনা যাচাই করতে হবে।’ সেদিন ফেরত দিলেন। বৃহস্পতিবার আবার আসলাম। আবারও একই কথা বলে ফেরত দেছে।”
বজলুর রশিদের অভিযোগ, এই কর্মকর্তার আচরণ খুব খারাপ। কথায় কথায় তিনি রেগে ওঠেন।
বিনোদ রায় বলেন, ‘এলাকার তিনজনকে ভোটার বানাবো বলে ৫-৬ দিন নির্বাচন অফিসে এসেছি। নানা ত্রুটি ধরে ফিরিয়ে দিয়েছে। কখনো এসে কর্মকর্তাকে না পেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। এখানকার কর্মকর্তা এবং তথ্য যাচাইকারী কারও আচরণ ভালো না।’
দেশের অন্যতম বৃহৎ উপজেলা মণিরামপুরে পাঁচ লাখের অধিক মানুষের বসবাস। একটি পৌরসভা ও ১৭টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় মোট ভোটার তিন লাখ ৩৬ হাজার ৯৮৮ জন। বৃহৎ এই উপজেলায় নির্বাচন কর্মকর্তা নেই দীর্ঘদিন। ৫-৭ মাস আগে পদোন্নতি নিয়ে বদলি হন এখানকার নির্বাচন কর্মকর্তা সহিদুর রহমান। এরপর কেশবপুর থেকে এসে মণিরামপুরে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন বজলুর রশিদ। সপ্তাহে মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার- দুইদিন তিনি এখানে অফিস করেন। বৃহস্পতিবার নতুন ভোটারের আবেদনের তথ্য সংগ্রহ করেন তিনি।
সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে কর্মকর্তা না থাকায় ভোগান্তিতে পড়তে হয় এখানে আগতদের।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ এই অফিসের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে তথ্য যাচাইকারী
সুমনকুমার, পিওন হাসান কারও আচরণ ভালো না।
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বজলুর রশিদ বলেন, ‘বড় উপজেলা। নিয়মিত কর্মকর্তার পদায়ন নেই। আমি কেশবপুর থেকে সপ্তাহে দুই দিন আসি। অনেক চাপ সামলাতে হয়। সেবাগ্রহীতারা খারাপ আচরণ করলে তখন তো মেজাজ গরম হতে পারে। আমিও তো মানুষ।’
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে যশোরের জ্যেষ্ঠ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।’

আরও পড়ুন