ভ্যাকসিন নেওয়ার হার কমেছে

আপডেট: 02:30:33 05/03/2021



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক: করোনাভাইরাস প্রতিরোধে টিকা নেওয়ার হার কিছুটা কমেছে। প্রথমদিকে জনগণের মধ্যে সংশয় ছিল। তবে ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। চিকিৎসক, রাজনৈতিক নেতা, জাতীয় দলের ক্রিকেটারসহ দেশের বিভিন্ন পেশার প্রথম শ্রেণির মানুষকে টিকা নিতে দেখে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ে। তবে বর্তমানে টিকা নেওয়ার হার আবার কমে এসেছে। বয়সসীমা বেধে দেওয়া, সচেতনতার অভাব, বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভয় এবং অন্যান্য আরও ইস্যুতে টিকা নেওয়ার হার কমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
টিকা নেওয়ার হার অনেক কমে এসেছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পাবলিক হেলথ অ্যাডভাইজারি কমিটির সদস্য জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘ফার্স্ট টেকার’ যারা ছিলেন তারা টিকা নিয়ে নিয়েছেন, সাধারণত এই সংখ্যাটা অল্প সংখ্যক হয়। এই ফার্স্ট টেকার শেষ হয়ে গেছে প্রায়।
এ অবস্থায় টিকাদানের কৌশল বদলানোর কথা বলেন আবু জামিল ফয়সাল। তিনি বলেন, মানুষকে বোঝাতে হবে, টিকার আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে, যারা এখন পর্যন্ত টিকা নিয়েছেন সেই সংখ্যাটা শহরকেন্দ্রিক। কিন্তু গ্রাম বা ঢাকার ভেতরেই বস্তিবাসী, ভাসমান মানুষসহ কয়েকটা শ্রেণি টিকার বাইরের আছেন। তাদেরকে টিকাদান কর্মসূচির ভেতরে আনতে হবে।
এ জন্য তিনি প্রচারণা বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার কথা বলেন। বিশেষ করে বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাকে যুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মানুষের মনে এক ধরনের ধারণা হয়েছে যে টিকাদান অনেকদিন ধরে চলবে জানিয়ে চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হাসান শাহরিয়ার খান বলেন, রেজিস্ট্রেশন করছে কম, আবার রেজিস্ট্রেশন করেও অনেকে আসছেন না-এমন উদাহরণও রয়েছে আমাদের।
সঙ্গে কিছু গুজব রয়েছে। টিকা নেওয়ার পরও কয়েকজন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন-এমন খবর গণমাধ্যমে এসেছে, এ থেকেও মানুষ কিছুটা ভীত হয়েছে।
যদিও আমরা চেষ্টা করছি, এসব বিষয়গুলো ওভারকাম করতে, বলেন তিনি।
‘আবার গ্রামে করোনা নিয়ে সচেতনতা ছিল না, সেটা টিকার নেওয়ার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে’, যোগ করেন তিনি।
গত ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টিকা এবং নিবন্ধন ঠিকমতো হচ্ছিলো জানিয়ে হাসান শাহরিয়ার খান আরও বলেন, ওই সময়ের পর থেকেই টিকা নেওয়ার হার এবং নিবন্ধনের হার কমতে থাকে। বিশেষ করে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে একেবারেই কমে যায়। তবে বুধবার (৩ মার্চ) এর আগের দিনের চেয়ে সংখ্যাটা বেড়েছে। একইসঙ্গে গ্রামে নিবন্ধনের হার কম, সেদিকে প্রশাসনকে নজর দিতে হবে।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধী জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। সেদিন থেকে বুধবার (৩ মার্চ) পর্যন্ত টিকা নিয়েছেন মোট ৩৪ লাখ ৬০ হাজার ১৫৯ জন। এদের মধ্যে পুরুষ ২২ লাখ ২১ হাজার ২৬৯ জন ও নারী রয়েছেন ১২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯০ জন। টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে ৭৮৪ জনের মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
প্রথম দিন টিকা নিয়েছিলেন ৩১ হাজার ১৬০ জন, ঠিক চার দিন পরেই (১০ ফেব্রুয়ারি) টিকা নেওয়ার সংখ্যা দেড় লাখ ছাড়িয়ে যায়। তার ঠিক একদিন পর (১১ ফেব্রুয়ারি) টিকা নেওয়ার সংখ্যা হয় পাঁচ লাখ ৪২ হাজার ৩০৯ জন। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি একদিনে টিকা নেন এক লাখ ৯৪ হাজার ৩৭১ জন। ১৪ ফেব্রুয়ারি টিকা গ্রহীতার সংখ্যা দাঁড়ায় মোট ৯ লাখ ছয় হাজার ৩৩ জনে। টিকাদান কার্যক্রম শুরুর ১০ দিন পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট টিকা নেন প্রায় ১৬ লাখ।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি একদিনে সবচেয়ে বেশি মানুষ টিকা নেন, দুই লাখ ৬১ হাজার ৯৪৫ জন।
তবে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে টিকাগ্রহীতা এবং টিকার জন্য নিবন্ধন দুটোই কমতে শুরু করে। বুধবার (৩ মার্চ) টিকা নিয়েছেন এক লাখ ১৮ হাজার ৬৫৪ জন। এর আগের দিন (২ মার্চ) টিকা নিয়েছেন এক লাখ ১৪ হাজার ৬৮০ জন। আর ১ মার্চ টিকা নিয়েছেন এক লাখ ১৬ হাজার ৩০০ জন। ২৮ ফেব্রুয়ারি টিকা নিয়েছেন এক লাখ ২৫ হাজার ৭৫২জন আর ২৭ ফেব্রুয়ারি টিকা নিয়েছেন এক লাখ ৩৩ হাজার ৮৩৩জন।
ঢাকার ভেতরে টিকা দেওয়া হাসপাতালগুলোর মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতাল একটি। সেখানে তিন মার্চে টিকা নিয়েছেন ৬১০ জন, দুই মার্চ নিয়েছেন ৩৯৮ জন, আর এক মার্চ নিয়েছেন ৮৫ জন।
গত ৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি শুরুর প্রথম দিনে এই হাসপাতালে টিকা নিয়েছেন ৪৯ জন, ৮ ফেব্রুয়ারি ১০৫ জন, ৯ ফেব্রুয়ারি ১৭৫ জন, ১০ ফেব্রুয়ারি ৩০৩ জন, ১১ ফেব্রুয়ারি ৩০২ জন, ১৩ ফেব্রুয়ারি ৪৬৬ জন, ১৪ ফেব্রুয়ারি ৩৩১ জন, ১৫ ফেব্রুয়ারি এক হাজার চারজন, ১৬ ফেব্রুয়ারি এক হাজার ২৪৮ জন, ১৭ ফেব্রুয়ারি এক হাজার ৩৯২ জন, ১৮ ফেব্রুয়ারি এক হাজার ৩৫২ জন, ২০ ফেব্রুয়ারি এক হাজার ৪৯ জন, ২২ ফেব্রুয়ারি ৭২২ জন, ২৩ ফেব্রুয়ারি ৮২২ জন, ২৪ ফেব্রুয়ারি ৬৮০ জন, ২৫ ফেব্রুয়ারি ৬৭৯ জন, ২৭ ফেব্রুয়ারি ৮১২ জন আর ২৮ ফেব্রুয়ারি টিকা নিয়েছেন ৫৪২ জন।
হাসপাতালটিতে টিকাদান কর্মসূচি কেমন চলছে জানতে চাইলে হাসপাতালের টিকা কার্যক্রমের ফোকাল পারসন কিঙ্কর ঘোষ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, টিকা দেওয়ার চাপ নেই, একেবারেই নেই।
কেন চাপ নেই, জানতে চাইলে কিঙ্কর ঘোষ বলেন, আমার কাছে মনে হয় নিবন্ধনের বয়সসীমা ৪০ বছর করার পর থেকেই টিকার দেওয়ার জন্য যে ভিড় ছিল সেটা কমে গেছে। টিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ এক হাজার ৩০০ জনকে টিকা দেওয়ারও রেকর্ড রয়েছে শিশু হাসপাতালের। তবে গত কয়েকদিন সেটা কয়েকগুণ কমে এসেছে।
টিকা নেওয়ার হার কমে যাওয়ার পেছনে নাগরিকদের উদাসীনতা, সচেতনতার অভাব, মাঠ পর্যায়ে ভুল তথ্য ছড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয়কে দায়ী করেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।
ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, আমরা মাঠ পর্যায়ে কথা বলেছি এ নিয়ে। সেখান থেকে জানা গেছে, দ্বিতীয় ডোজ যেহেতু রোজার ভেতরে পড়বে, অনেকেই এ নিয়ে চিন্তায় আছেন।
তবে এ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর কাজ করছে, জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তখন আমাদের কৌশল কী হবে সে নিয়ে আমরা কাজ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘দ্বিতীয়ত প্রাথমিকভাবে মাঠ পর্যায়ে একটা বার্তা গিয়েছিল, যে একটি নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে টিকা দেওয়া শেষ হবে। তখন ভীষণভাবে টিকা নেওয়ার চাপ ছিল। তবে পরে যখন দেখা গেল বার্তাটি ভুল ছিল, তখন টিকা নেওয়ার বিষয়ে সবার মধ্যে উদাসীনতা চলে আসে। সবার ধারণা, টিকাতো নিতেই পারবো, আজ হোক বা কাল। এতে আর্জেন্সিটা কমে গেছে।’
তিনি গ্রামের দিকে যারা উপজেলা পর্যায় থেকে দূরে থাকে, তাদের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে টিকা নেওয়ার বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জিং বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এ অবস্তায় মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেসব ইউনিয়নে ১০ থেকে ২০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে, সেসব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানেও এখন টিকা কর্মসূচি প্রসারিত করা হবে। এখন আমরা ইউনিয়ন পর্যায়ে যেতে শুরু করবো, যাতে করে যারা উপজেলা পর্যায়ে আসছে না, তারাও যেন টিকা পায়।

সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন