ভেঙেছে বাঁধ, ভেঙেছে চিংড়িচাষিদের কপালও

আপডেট: 06:50:29 03/04/2021



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরার আশাশুনি সদরের পশ্চিমপাড়ার আব্দুস সামাদ সরদারের ছেলে রুহুল আমি সরদার। নিজের চাষযোগ্য জমি নেই। আছে শুধু ভিটেবাড়ি। অন্যের ছয় বিঘা জমি লিজ নিয়ে মাছের ঘের করেছিলেন। একাজে এনজিও থেকে নিতে হয় ঋণ। বড় স্বপ্ন ছিল তার। গত অগ্রহায়ণে ছেড়েছিলেন মাছের পোনা। ঘেরে মাছের পোনা বড় হয়ে বিক্রির প্রায় উপযুক্ত হয়েছিল। গোনে গোনে আটন ঝেড়ে দেখতেন রুহুল আমিন। বাগদার সাইজ দেখে মন ভরে যেত তার। সংসারে সুদিনের আশায় মনে মনে বুনতেন নানা স্বপ্নের জাল। কিন্তু গত পূর্ণিমার গোনে খোলপেটুয়া নদীর বাঁধ  ভেঙে সেই স্বপ্নের জাল ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে রুহুল আমিনের। এখন তিনি নিঃস্ব। ঋণ শোধের চিন্তায় তার রাতের ঘুম হারাম।

শুধু রুহুল আমিন নন, এ অবস্থা একই এলাকার হজরত আলী, রফিকুল ইসলাম, প্রতিবন্ধী আজহারুল ইসলামসহ শত শত মাছচাষির। বাঁধ ভাঙার সাথে যেন কপাল ভেঙেছে তাদের। উপকূলজুড়ে মাছচাষিদের মধ্যে বিরাজ করছে বোবা কান্না।
মাছচাষিরা জানান, আশাশুনির সদর ইউনিয়নের দয়ার ঘাটের রিংবাঁধ ভেঙে মাছের ঘেরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বাঁধ ভেঙে প্লাবনে সদর ইউনিয়নের বাগদা চিংড়ি ঘের মালিক মহিতুর রহমানের ২০ বিঘা, প্রফেসর বজলুর রহমানের ৫৫ বিঘা, দীপনকুমার মণ্ডলের সাত বিঘা, আব্দুস সালামের ১৫ বিঘা, খোকন গাজীর আট বিঘা, মফিজুল ইসলাম লিংকনের সাত বিঘা, শাহিন রেজার নয় বিঘা, আসাদুজ্জামান খোকনের আট বিঘা, শরিফুল ইসলাম টোকনের ১১ বিঘা, সোলায়মান হক কাজলের চার বিঘা, সাদিক আনোয়ার ছট্টুর দশ বিঘা, আজিজুল ইসলাম ছোটনের সাত বিঘাসহ কয়েক শত বাগদা চিংড়ি মাছের ঘের পানিতে ভেসে গেছে। এতে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তারা আরো জানান, কেউ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে, কেউ সমিতি (এনজিও) থেকে ঋণ নিয়ে আবার কেউ ধার-দেনা করে জমির হারি অর্ধেক পরিশোধ করে মাছ চাষ করেছেন। তাদের স্বপ্ন ছিল এক মাসের মধ্যে মাছ ধরা শুরু হবে এবং এই মাছ বিক্রি করে করে হারির টাকা ও ঋণ পরিশোধ করে ঘুরে দাঁড়াবেন। কিন্তু ২৯ মার্চ ‘সুপারমুন’ পূর্ণিমার গোনে বাঁধ ভেঙে পানিতে ঘের ভেসে যাওয়ায় তাদের সে স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। এখন তারা সংসার চালাবেন কীভাবে আর ব্যাংক, এনজিও বা মহাজনের টাকা পরিশোধ করবেন কীভাবে- সে চিন্তায় হতাশ হয়ে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ঘের মালিকরা বিনাসুদে সহজ শর্তে আবার যাতে ঋণ নিয়ে মাছ চাষ করতে পারেন- সে ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আশাশুনি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শহীদ সৈকত মল্লিক বলেন, ‘আশাশুনি উপজেলায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। এখানে চিংড়ি চাষের ঘেরের সংখ্যা ১৩ হাজার ১৭৯। এর মধ্যে আশাশুনি সদর ইউনিয়নে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে ৩৬০ হেক্টর জমির ৩১৫টি ঘের। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত ঘের মালিকদের তালিকা করেছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের উচ্চ দপ্তরে পাঠিয়েছি।’
আশাশুনি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবিএম মোস্তাকিম বলেন, ‘দিন আসে দিন যায়, বদলায় অনেক কিছু। শুধু বদলায় না আশাশুনি উপজেলার জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধের চিত্র। ষাটের দশকের সেই বেড়িবাঁধের এখন আর অস্তিত্ব নেই। আমাদের মাসিক সভায়ও পাওয়া যায় না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। স্থানীয়রা স্বেচ্ছাশ্রমে রিংবাঁধ বাঁধে প্রতিবার। বারবার ভাঙে বাঁধ। বারবার ভাসে মাছের ঘের। বারবার ভাসে উপকূলের মানুষ। কিন্তু একবারও বাঁধা হয় না মূলবাঁধ।’
এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপকূল রক্ষা বাঁধ ভেঙে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পাঁচ নম্বর পোল্ডারের পশ্চিম দুর্গাবাটি এলাকার সাইক্লোন শেল্টার-সংলগ্ন অংশে প্রায় ২০০ ফুট বাঁধ খোলপেটুয়া নদীতে বিলীন হলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়। ভাঙনকবলিত অংশ দিয়ে নদীর সাথে সমানতালে লোকালয়ে জোয়ার-ভাটা চলায় প্রায় সাত হাজার বিঘা জমির চিংড়ি ঘেরসহ শত শত মিষ্টি পানির পুকুর লবণ পানিতে তলিয়ে গেছে। প্রায় ছয় হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ার পাশাপাশি তিন শতাধিক বাড়ি-ঘরে নদীর পানি প্রবেশ করেছে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য এসএম জগলুল হায়দারসহ পাউবো’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে বলেছেন, বেড়িবাঁধ ভাঙনের কারণে উপকূলের চিংড়ি চাষিরা সর্বস্বান্ত হয়ে গেছেন। তারা অবলম্বে বিষয়টি নিরসনে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

আরও পড়ুন