ভারত থেকে পানিপথে পেঁয়াজ আনতে অনাগ্রহ

আপডেট: 01:25:55 14/10/2020



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : বাংলাদেশের বাজার অস্থিতিশীল করে দেওয়ার মাসখানেক পর আবার পেঁয়াজ রফতানির শর্তসাপেক্ষ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে ভারত। তবে বিশেষ দুই জাতের পেঁয়াজ আনা যাবে শুধুমাত্র পানিপথ দিয়ে।
গত বছরের মতো বেঁধে দেওয়া এমন শর্তে এবারো নারাজ দেশের আমদানিকারকরা। তাছাড়া এখন মিয়ানমার, পাকিস্তান, চীনের মতো দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি চলমান থাকায় ভারতের এই দুই কম পরিচিত জাতের পেঁয়াজ এনে তা মার্কেটে চালানো যাবে কিনা তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে আমদানিকারকদের। তবে চট্টগ্রামের আমদানিকারকরা ভাবতে চাইলেও স্থলপথের আমদানিকারকরা এমন ঝুঁকিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন।
দেশের ইতিহাসে এ বছর সর্বাধিক পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে, এ দাবি কৃষি মন্ত্রণালয়ের। করোনার কারণে মাত্র তিন মাস বন্ধ ছিল আমদানি। তার আগে পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে তো বটেই, করোনার বাধা উঠে যেতেই আমদানি হয়েছে প্রতিদিন হাজার হাজার টন পেঁয়াজ। দেশের মোট চাহিদার চেয়েও বেশি পেঁয়াজ আনার পরেও ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেওয়ায় একলাফে সব ধরনের পেঁয়াজের দাম এখন ৮০ টাকার ওপরে। তবে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে একযোগে পেঁয়াজ আমদানির জন্য অনুমতি দিয়েছে সরকার। এ বছর ব্যাপক পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হওয়ায় প্রকৃত ঘাটতি কত সে বিষয়ে সব মহলে রয়েছে ধোঁয়াশাও। যতই সংকটের কথা বলা হোক না কেন, আড়তদারদের কাছে এখনো আছে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ। ফলে ভারত যে ঘুরপথে পেঁয়াজ রফতানির সুযোগের নামে বাংলাদেশি আমদানিকারকদের খরচ বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছে তাতে সাড়া দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী নন বেশিরভাগ আমদানিকারক।
চট্টগ্রাম ছাড়া স্থলবন্দর সাতক্ষীরার ভোমরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ ও দিনাজপুরের হিলির কোনো আমদানিকারক নদী কিংবা সাগরপথে পেঁয়াজ আমদানিতে উৎসাহ দেখাননি। অপরিচিত পথ হওয়ায় তারা এভাবে পেঁয়াজ আমদানি করবেন না বলে জানিয়েছেন। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের বিশেষত খাতুনগঞ্জের আমদানিকারকরা এই ঘুরপথে আমদানিতে ঝুঁকি দেখলেও এক কথায় রাজি নন। তারা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেই এ ব্যাপারে ভাবতে চান।
টানা এক মাস পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ রাখার পর গত রোববার ভারতের পক্ষে জানানো হয়, আপাতত স্থলপথ দিয়ে আর পেঁয়াজ রফতানি হবে না। তবে ব্যাঙ্গালুরু রোজ ও কৃষ্ণপুরাম নামে দুটি জাতের পেঁয়াজ স্বল্প পরিমাণে সীমিত আকারে রফতানির ব্যাপারে তারা আগ্রহী। তবে তা নিতে হবে সমুদ্রপথে। এমন নয়টি শর্ত দিয়ে পেঁয়াজ রফতানির কথা জানায় দেশটির সরকার।
ভোমরা স্থলবন্দরের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী মেসার্স কালাম ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী খোরশেদ আলী বলেন, ‘পানিপথে আমদানি করতে হবে এমন কোনো তথ্য আমাদের জানানো হয়নি। ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি ২২ ট্রাকে দশ হাজার টন ভারতীয় পেঁয়াজের আমদানি করার সুযোগ দেবে সে দেশের সরকার। যে কোনোভাবে ব্যবসায়ীরা এটি নিতে পারবে। ভারতের কলকাতা থেকে ভোমরা স্থলবন্দরের দূরত্ব কম হওয়ায় ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ এবং পচনশীল পণ্য আমদানির জন্য বেছে নেন এই বন্দরকে। তবে পানিপথে নেওয়ার শর্ত দিলে আমি পেঁয়াজ আমদানি করবো না।’
ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের বন্দর বিষয়ক সম্পাদক আমির হামজা বলেন, ‘ভারত সরকার গত বছরও পেঁয়াজ বন্ধ করার করার পর সৌজন্যতা দেখিয়ে বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ রফতানির অনুমোদন দিয়েছিল। তবে শর্ত ছিল সমুদ্র বা নদীপথে নিতে হবে। এবারো সেটা হতে পারে। তবে এ ব্যাপারে আমাদের কিছু জানানো হয়নি। তবে পানিপথে আমদানির শর্ত থাকলে মোংলা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের আমদানিকারকরা ছাড়া স্থলবন্দরের আমদানিকারকরা আমদানি করতে পারবে না।’
ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান নাসিম বলেন, ‘পানিপথে ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানির বিষয়ে আমাদের কিছু জানানো হয়নি।’
হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রফতানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন উর রশীদ বলেন, ‘যদি সমুদ্রবন্দর দিয়ে পেঁয়াজ নিতেই হয় তাহলে ভারত থেকে নেবো কেন? অন্যান্য দেশে পেঁয়াজের দাম কম রয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেমন মিশর, পাকিস্তান, তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খুলেছি, সেই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে সেইসব দেশ থেকে জাহাজযোগে পেঁয়াজ আসা শুরু করেছে, যা দেশের মার্কেটেও প্রবেশ করেছে। পর্যাপ্ত পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি দেওয়া রয়েছে। অতিসত্বর সেসব পেঁয়াজ দেশে চলে আসবে। এতে করে দেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম কমে আসবে।’
সম্প্রতি ভারত সরকার যেসব শর্তে ২০ হাজার টন পেঁয়াজ রফতানির অনুমতি দিয়েছে, সেই শর্ত মেনে পেঁয়াজ আমদানিতে আগ্রহী নন চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারকরা। তারা বলছেন, এভাবে শর্ত মেনে পেঁয়াজ আমদানিতে যেমন ঝুঁকি রয়েছে তেমনি ভারত সরকার যে পেঁয়াজ রফতানির অনুমতি দিয়েছে, সেই পেঁয়াজের মান ভালো না হওয়ায় সমুদ্র বা নদীপথে পেঁয়াজ আমদানি তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
আমদানিকারক মুনিরুল ইসলাম মানিক জানান, ‘সম্প্রতি অতিবৃষ্টি এবং বন্যায় পেঁয়াজ নষ্ট হওয়া এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয় ভারত সরকার। যার ফলে বাংলাদেশে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি পায়। কিন্তু, এখনো পুরনো এলসির পেঁয়াজই দেয়নি ভারত সরকার। এতে দেশের বাজারে বর্তমানে পেঁয়াজের দাম ঊর্ধ্বমুখী। আর এখন সেই নষ্ট পেঁয়াজই ভারত সরকার রফতানির অনুমতি দিয়েছে। যার ফলে এই পেঁয়াজের মান ভালো নয় এবং এই পেঁয়াজ আমদানিতে ঝুঁকি থাকায় আমরা আমদারিকারকরা ভারত সরকারের শর্ত মেনে পেঁয়াজ আমদানি করতে আগ্রহী নই।’
তিনি আরো বলেন, ‘যে দুটি রাজ্য থেকে (ব্যাঙ্গালুরু ও কর্নাটক) পেঁয়াজ রফতানির অনুমতি দিয়েছে; সেখানকার রফতানিকারকদের সঙ্গে আমাদের আমদানিকারকদের তেমন পরিচয় না থাকায় নদীপথে সেই পেঁয়াজ আমদানি আরো জটিল হবে। তবে উন্মুক্ত বাজার (যে কোনো রাজ্য) থেকে পেঁয়াজ রফতানির সুযোগ থাকলে পানিপথে সেই পেঁয়াজ আমদানি করা যেতো; সেক্ষেত্রে মানসম্পন্ন পেঁয়াজ আমাদের পক্ষে আমদানি করা সম্ভব হতো।’
আরেক আমদানিকারক বাবুল হাসানাত দুরুল বলেন, ‘সড়কপথের চেয়ে নদীপথে সময় বেশি লাগায় এবং ভারত ছাড়া অন্যান্য দেশ যেমন মিশর, তুরস্ক ও পাকিস্তান থেকে আমদানিকৃত পেঁয়াজের দাম কম পড়ায় নদীপথে এই ধরনের শর্ত মেনে পেঁয়াজ আমদানি করা সম্ভব নয়। আমরা সোনামসজিদ স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারকরা এভাবে পেঁয়াজ আমদানিতে আগ্রহী নই।’
এদিকে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজ আমদানিকারক সোনালী ট্রেডিং মালিক আফসার উদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশে ভারতের নাসিক এলাকার পেঁয়াজের চাহিদা বেশি। ভারত এখন কৃষ্ণপুরাম আর রোজ জাতের পেঁয়াজ রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এসব জাতের পেঁয়াজের চাহিদা বাংলাদেশে কম। তাই ওই পেঁয়াজগুলো সচরাচর আমদানিকারকরা আনতে চাইবেন না। তাও যদি স্থলবন্দর দিয়ে হতো তাহলে আনতেন, কিন্তু এখন নদীবন্দর দিয়ে আমদানিকারকদের আগ্রহ কম।’
একই কথা জানিয়েছেন খাতুনগঞ্জের ইরা ট্রেডার্সের মালিক পেঁয়াজ আমদানিকারক মো. ফারুক। তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিনে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ভারতের কিছু পেঁয়াজ এসেছে। বন্দর দিয়ে যেসব পেঁয়াজ আসছে, স্থানান্তরযোগ্য কন্টেইনারে করে নিয়ে আসায় পেঁয়াজগুলো একটু বিবর্ণ হয়ে যায়। কিছু পেঁয়াজ পচেও যায়। তাই বন্দর দিয়ে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি করতে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহী না। এটি যদি স্থলবন্দর দিয়ে হতো যত বেশি খরচই পড়ুক ব্যবসায়ীরা ভারতের পেঁয়াজ আনবে। কারণ দেশে ভারতীয় পেঁয়াজের চাহিদা আছে। কিন্তু সমুদ্রবন্দর দিয়ে হলে ব্যবসায়ীরা অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবে।’
তিনি আরো বলেন, পাশের দেশ মিয়ানমার ও দূরবর্তী চীন থেকেও পেঁয়াজ আসছে। মিয়ানমারের পেঁয়াজের মানও ভালো। তাই ভারত থেকে সমুদ্রপথে পেঁয়াজ আমদানির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা এসব বিষয়ও মাথায় রাখবে।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন