ভারত আচরণ না বদলালে অস্বস্তি দূর হবে না

আপডেট: 12:50:59 20/08/2020



img

কাদির কল্লোল : বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কের শীতলতা বা অস্বস্তি নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনার মাঝে ঢাকায় দেশ দুটির পররাষ্ট্র সচিবদের এক বৈঠক থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের আলোচনা ঠিক নয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, নানা আলোচনার বিপরীতে দুই দেশের ''ভালো সম্পর্কের'' বিষয়টিকে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত তুলে ধরার ব্যাপারে তারা একমত হয়েছেন।
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে এখন যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তিনি এটাকে ''সোনালি অধ্যায়'' হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে ঢাকায় দুই দিনের আকস্মিক সফরে এসে মি. শ্রিংলা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বার্তা দিয়েছেন বলে বলা হচ্ছে। কিন্তু সে বার্তার ব্যাপারে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।
যদিও দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিবরা এখন ''ভালো সম্পর্ক'' ও ''সোনালি অধ্যায়ের'' কথা বলেছেন, কিন্তু বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের সম্পর্কের শীতলতা কাটাতে মি. শ্রিংলার এই সফর কার্যকর হবে কিনা- সেই সন্দেহ রয়েছে বিশ্লেষকদের।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান মনে করেন, বড় দেশ হিসাবে ভারত প্রতিবেশি ছোট দেশগুলোর সমর্থন তাদের পেছনে আছে বলে একরকম ধরেই নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ গত কয়েক বছরে ভারতের বিভিন্ন নীতির কারণে অনেক ক্ষুব্ধ হয়েছে।
তিনি বলেন, তিস্তা চুক্তি, রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত সমর্থন ভারতের কাছে পায়নি। তারপরেও প্রতিবেশিদের মধ্যে ভারতের সবচেয়ে ভালো বন্ধু যদি কেউ থাকে সেটা হলো বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ কখনই আগ বাড়িয়ে কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যেখানে ভারতের সাথে তাদের সম্পর্ক খারাপ হয়।
রওনক জাহান বলেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বাংলাদেশ যদি নিজের স্বার্থে কখনো মনে করে যে, চীনের সাথে তাদের সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে, সেটা বাংলাদেশকে করতে হবে।
ভারতের আচরণের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে চীন একটা জায়গা করে নিচ্ছে। এই অঞ্চলে নেপাল-শ্রীলংকাও চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
রওনক জাহান বলেছেন, প্রতিবেশি দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ঘাটতির বিষয়টা হয়তো ভারত এখন অনুধাবন করছে। সেজন্য ভারত বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের শীতলতা হয়তো কাটানোর চেষ্টা করছে।
কিন্তু ভারত আচরণ পরিবর্তন না করলে শুধু আলোচনা করে বা ভালো ভালো কিছু কথা বলেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্বস্তি দূর করা যাবে না বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
যখন দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট আলোচনায় এসেছে। মহামারি পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং ভ্যাকসিন ইস্যুতে বাংলাদেশ এবং চীনের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হয়েছে।
এছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক যোগাযোগ ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যেমন নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে, একইসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের গণমাধ্যমেও দেশটির রাজনৈতিক মহলের অস্বস্তির বিষয় শিরোনাম হয়েছে।
করোনাভাইরাস দুর্যোগের পাঁচ মাস পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এই প্রথম কোনো দেশে অর্থাৎ বাংলাদেশে উড়ে এসেছেন।
আর এমন পটভূমিতেই দুই দেশের সম্পর্কের বিষয়ই আলোচনায় অগ্রাধিকার পেয়েছে ঢাকায় দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিবের বৈঠকে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, নানা জল্পনা-কল্পনার জবাবে তারা দুই দেশের ভালো সম্পর্কের বিষয় মূলধারার সংবাদ মাধ্যমে তুলে ধরার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।
"দুই দেশের যে সমস্ত নিউজপোর্টাল বা অন্যান্য যে সমস্ত সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে ইদানীংকালে যে সব খবর আমরা দেখতে পেয়েছি, সে ব্যাপারে আমরা পরস্পরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। এবং আমরা একমত হয়েছি যে, আমাদের সম্পর্কের যে বর্তমান অবস্থা বা উন্নত অবস্থায় আমরা আছি, আমরা আপনাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সেই মেসেজটা যেন দিতে পারি। আমরা মূলধারার সংবাদমাধ্যমে আমাদের ভালো সম্পর্কের বিষয় তুলে ধরবো।"
তিনি আরো জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরো বেগবান করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বার্তা নিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ঢাকায় এই ঝটিকা সফরে এসেছিলেন।
মি. শ্রিংলা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও দেখা করে প্রায় এক ঘণ্টা সময় ধরে তারা আলোচনা করেছেন।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেই বৈঠকের কথা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্বীকারই করা হয়নি।
আর ভারতের পক্ষ থেকে সেই বৈঠকের কথা বলা হলেও আলোচনার বিষয় স্পষ্ট করা হয়নি।
তবে সফরের শেষদিনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতের সচিব মি. শ্রিংলা দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েছিলেন। তাতে তিনি বলেছেন, "দুই দেশের মধ্যে যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন ভালো সম্পর্ক রয়েছে। এটা সোনালি অধ্যায় এবং আমরা এটা অব্যাহত রাখবো।"
দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন ইস্যু যেমন রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সহযোগিতা এবং সীমান্তে মানুষ হত্যার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে দুই সচিবের বৈঠকে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেছেন, সীমান্তে মানুষ হত্যা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ তারা তুলে ধরেছেন।
"ইরিটেন্স আছে আমাদের সম্পর্কের, যেমন বর্ডার কিলিংস একটা সমস্যা। সেই ব্যাপারেও আমি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। আগামী মাসে বিজিবি এবং বিএসএফ-এর ডিজি লেভেলের বৈঠকের চেষ্টা আমরা করবো। এবছরের প্রথম ছয় মাসে সীমান্তে মৃত্যু বেড়েছে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায়। এটার ব্যাপারে আমাদের উদ্বেগ আমরা প্রকাশ করেছি।"
বাংলাদেশ এবং ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ে বছরের পর বছর আলোচনা হলেও তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি না হওয়া এবং দ্বিপাক্ষিক কিছু ইস্যুতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশে এক ধরনের হতাশা রয়েছে।
সেই পরিস্থিতিতে সম্পর্কও যখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তখন ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের এই আকস্মিক সফর বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করার চেষ্টার অংশ ছিল বলে ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে।
কিন্তু আশ্বস্তের জায়গা কতটা সফল হয়েছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
[বিবিসির বিশ্লেষণ]

আরও পড়ুন