বেপরোয়া মানুষের ঢল যশোরের বাজারে

আপডেট: 02:59:41 19/05/2020



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : যশোর শহরে আজ ঢল নেমেছিল মানুষের। দোকানগুলোতে ছিল না পা ফেলার জায়গা। শহরের প্রধান সড়কে ফিরে এসেছিল চিরচেনা যানজট।
কাল মঙ্গলবার আর কোনো দোকান খুলবে না- জেলা প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত জানার পর আজ লাখো মানুষ প্রচণ্ড খরতাপ উপেক্ষা করে ছুটেছিলেন বাজারে-দোকানে, শপিংমলে। কোথায় করোনা, কোথায় শারীরিক দূরত্ব? কোনো কিছুর ধার ধারেনি বেপরোয়া মানুষ। নির্ধারিত দূরত্ব মানা তো দূরের কথা, গায়ে গায়ে মানুষ। তাদের সামলাতে প্রশাসনের কোনো তৎপরতাও চোখে পড়েনি।
বিশেষ করে শহরের কেন্দ্রস্থল দড়াটানা থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত তিনটি সড়ক- হাজী মুহম্মদ মহসিন রোড, কাপুড়িয়াপট্টি রোড এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র রোডে ছিল জনস্রোত। মধ্যবর্তী স্থানের ছোট ছোট রাস্তা ও গলিও ছিল লোকে লোকারণ্য। এই সব এলাকার মার্কেট, শপিংমলে ঢোকার মতো কোনো পরিবেশও ছিল না।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে যশোরেই এখন পর্যন্ত করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এই জেলায় করোনা রোগীর (যারা শনাক্ত হয়েছেন) সংখ্যা একশ’ ছুঁইছুঁই করছে। পরিস্থিতি সামলাতে গত মাসের শেষার্ধ্বে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যশোরকে লকডাউন করেন। কিন্তু ঈদ সামনে রেখে সরকার ১০ মে থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় যশোরেও তা কার্যকর হয়।
মার্কেট খোলার পর পরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরে মাইক নামিয়ে লোকজনকে করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ জানানো হতে থাকে। কিন্তু তাতেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। উপায়ন্তর না পেয়ে রোববার ‘করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংক্রান্ত জেলা কমিটি’ বৈঠকে বসে মঙ্গলবার থেকে যশোরে নিত্যপ্রয়োজনীয় ছাড়া সব ধরনের দোকানপাট বন্ধ থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়।
নতুন করে দোকানপাট বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা বৈঠক শেষ হতেই পাঠকপ্রিয় নিউজপোর্টাল সুবর্ণভূমির মাধ্যমে জেনে যান মানুষ। ঈদের আগে আজ সোমবারই শুধু দোকানপাট খোলা থাকছে- এমন খবরে আজ সকালেই বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়েন হাজারো মানুষ। বিশেষ করে তৈরি পোশাকের দোকানগুলোতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। পরিস্থিতি ছিল ঠিক ঈদের আগমুহূর্তের মতো।
আজ দুপুরের দিকে যশোর শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিপণীবিতানগুলো ঘুরে দেখা যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। বাজারে কথা হয় বেশক’জন ক্রেতার সঙ্গে। তারা বলেন, কাল থেকে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যাবে। তাই আজ বাজারে এসেছেন।
শহরের পুরাতন কসবা এলাকার গৃহবধূ শারমিন তার সন্তানকে নিয়ে একটি নামী শপিংমলে কেনাকাটা করছিলেন। সুবর্ণভূমির প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কী করব ভাই, বাবু তো ছোট! আমার জন্য না, বাচ্চার জন্যই কিছু পোশাক কিনতে এসেছি।’
এমন পরিস্থিতিতে বাচ্চাকে নিয়ে বেরুনো ঠিক হয়েছে কিনা জানতে চাইলে শিক্ষিতা এই নারী চুপ থাকেন।
শাহেলা আফরিন নামে এক গৃহবধূ এসেছিলেন সদর উপজেলার রূপদিয়া এলাকা থেকে। তিনি বলেন, ‘কাল থেকে লকডাউন হয়ে যাবে শুনে আজ বাজারে এসেছি। কিন্তু কোনো দোকানে ঢুকতে পারছি না মানুষের ভিড়ের কারণে।’
করোনা পরিস্থিতিতে এমন ঝুঁকি নিচ্ছেন কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বোঝেন তো, ঈদ। বছরের একটা দিনে যদি ছেলে-মেয়ের জন্য কেনাকাটা করতে না পারি তাহলে কি হয়?’
একই কথা আফজাল হোসেন নামে আরেক ক্রেতার। ঝিকরগাছা থেকে আসা এই ব্যক্তি বলেন, ‘বাজারে এতো মানুষ হবে তা বুঝতে পারিনি। খুব কষ্টে তিন জোড়া স্যান্ডেল কিনেছি। এখন ছেলেদের জন্য পোশাক কেনার জন্য কালেক্টরেট মার্কেটে যাব।’
আফজাল বলেন, দড়াটানা মোড় থেকে কাপুড়িয়াপট্টি পর্যন্ত পৌঁছাতে তার সময় লেগেছে আধা ঘণ্টারও বেশি।
এদিকে বাজারে ক্রেতাদের ব্যাপক ভীড় হলেও ব্যবসায়ীরা মোটেও খুশি ছিলেন না। তাদের অভিযোগ, শেষ বাজারে এসে যারা ভীড় জমিয়েছেন এদের অধিকাংশই গ্রামের খেটেখাওয়া বা নিম্নবিত্তের মানুষ। ঈদের বাজারের প্রধান ক্রেতা যারা, সেই শহুরে মধ্যবিত্তরা করোনার ভয়ে আসেননি। তাই বেচাকেনাও কম হয়েছে।
যশোর ছিটকাপড় ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবু হোসেন বলেন, ‘এবার ঈদে আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। মার্কেট বন্ধ ছিল, ভালোই ছিল। কিন্তু খুলে আবার মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়ায় আমরা চরম লোকসানে পড়েছি। এখন কর্মচারীদের বেতন আর ঘর ভাড়া দেবো কীভাবে ভেবে পাচ্ছি না।’
এই সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও মডার্ন ক্লথ স্টোরের মালিক বিশ্বনাথ দত্ত সুবর্ণভূমিকে বলেন, ‘লোকসান হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। আমরাও বুঝতে পারছি, মানুষের জীবনের ঝুঁকি আছে। লোকজন স্বাস্থ্যবিধি না মানায় দোকান মালিক-কর্মচারীরাও ঝুঁকিতে পড়েন। ফলে যা হওয়ার তাই হলো।’
শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি চিন্ময় সাহা বলেন, ‘লকডাউন চলছিল, ভালোই ছিলাম। কিন্তু দোকান খোলার অনুমতি দিয়ে আবার প্রত্যাহার করে নেওয়াতে ব্যবসায়ীদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। না পারলাম মাল বিক্রি করতে, না পারলাম স্বাস্থ্য সুরক্ষা করতে। সামনের দিনগুলো কীভাবে যাবে, এখন সেই চিন্তায় আছি।’
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ শফিউল আরিফ বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও মানবিক বিবেচনায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলার কারণে ফের বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছি।’

ছবি : তারিক হাসান বিপুল

আরও পড়ুন