বেনাপোল দিয়ে মাছ রপ্তানি বাড়ছে

আপডেট: 02:33:21 10/09/2020



img
img

স্টাফ রিপোর্টার, বেনাপোল (যশোর) : ভারতে মিঠা পানির সাদা মাছের চাহিদার কারণে বেনাপোল দিয়ে দিনের পর দিন মাছ রপ্তানি বেড়েই চলেছে। তবে দাম কম থাকায় ভারত থেকে রুই জাতীয় কিছু মাছ এখনো আসছে।
মৎস্য বিভাগ ও মাছ চাষিরা বলছেন, দেশে উৎপাদিত মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। এখন আর ভারত থেকে মাছ আমদানির প্রয়োজন নেই। তারপরও আমদানি হচ্ছে। এটি বন্ধ হলে আমাদের দেশের চাষিরা লাভবান হতেন।
গত তিন বছরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারতে রপ্তানি হয়েছে দুই কোটি ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ২০৫ মার্কিন ডলার মূল্যের এক কোটি ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ৬৮২ কেজি মাছ। একই সময় ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ৯৫ লাখ ৪৭ হাজার ২৯৭ ডলার মূল্যের এক কোটি ৩০ লাখ ৬৮ হাজার ৯১৮ কেজি মাছ।
বেনাপোলের ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান বলেন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ভারতে মাছ রপ্তানি হয়েছে ৩২ লাখ ৬৭ হাজার ৪৪ কেজি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৬৩০ কেজি এবং গেল অর্থবছরে (২০১৯-২০) রপ্তানি হয়েছে ৫২ লাখ ৪৫ হাজার আট কেজি মাছ। আর ভারত থেকে এদেশে মাছ আমদানি হয়েছে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩৫ লাখ ১৬ হাজার ৩২৫ কেজি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৭ লাখ ২৮ হাজার ৬৭৮ কেজি ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৪৮ লাখ ২৩ হাজার ৯১৫ কেজি।
করোনার কারণে এপ্রিল ও জুন মাসে বাংলাদেশ থেকে মাছ রপ্তানি হয়নি। জুলাই মাসে রপ্তানি হয়েছে দুই লাখ সাত হাজার ৩৯২ কেজি মাছ। যার দাম পাঁচ লাখ ১৮ হাজার ৪৮০ ডলার। জুন ও জুলাই মাসে আমদানি হয়েছে ২০ লাখ ৪৭ হাজার ২৫৭ কেজি। যার দাম ১৪ লাখ ৭০ হাজার ৬৭৯ মার্কিন ডলার। গেল আগস্ট মাসে রপ্তানি হয়েছে তিন লাখ আট হাজার ৯৬৬ কেজি মাছ; যার দাম সাত লাখ ৭২ হাজার ৪১৫ মার্কিন ডলার। একই মাসে ভারত থেকে আমদানি হয়েছে ১৬ লাখ ৯০ হাজার ৪৭৫ কেজি মাছ; যার দাম ১১ লাখ ৯১ হাজার ৯১৬ মার্কিন ডলার।
শার্শা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল হাসান জানান, ভারত থেকে আমদানি হয় রুই, কাতলা, সামুদ্রিক ও স্বাদু পানির মাছ। আর বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয় পাবদা, গুলশা, টেংরা, পাঙাস, হিমায়িত চিংড়ি, কার্প, ভেটকিসহ অন্যান্য মাছ। এর মধ্যে পাবদা মাছের চাহিদা বেশি হওয়ায় মোট রপ্তানির ৪০ শতাংশই পাবদা। পাবদা মাছ বেশি উৎপাদিত হয় যশোর জেলায়।
‘ভারত থেকে যেসব মাছ আমদানি হচ্ছে এগুলো এখন স্থানীয়ভাবেই ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। আমদানি করার প্রয়োজন নেই। আমদানি বন্ধ হলে আমাদের দেশের চাষিরা ব্যাপক লাভবান হতেন।’
যশোরের শার্শা উপজেলায় চাহিদার তিন গুণ বেশি মাছ উৎপাদন হচ্ছে জানিয়ে আবুল হাসান বলেন, উপজেলার ১৫টি বাঁওড়, ২৭১টি ঘের, দশটি বিল ও ছয় হাজার ৬১৯টি পুকুর মিলে মোট ছয় হাজার ২৩৯ হেক্টর জলাশয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা হচ্ছে। এখানে বছরে ২২ হাজার ৪৮৫ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। কিন্তু স্থানীয় চাহিদা মাত্র সাত হাজার ৫৭২ টন। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর অতিরিক্ত মাছ অন্যান্য এলাকায় ও ভারতে রপ্তানি করা হয়।
যশোরের শার্শা উপজেলার ‘সততা ফিস’-এর স্বত্বাধিকারী ও মাছ রপ্তানিকারক আবদুল কুদ্দুস বলেন, ‘ভারতে পাবদা ও কার্প জাতীয় মাছের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমরা সাধারণত পাবদা, টেংরাসহ অন্যান্য মিঠা পানির মাছ রপ্তানি করে থাকি।’
যশোরের শার্শায় ‘আফিল অ্যাকোয়া ফিস’-এ প্রতিদিন দশ মেট্রিক টন মাছ ও পোনা উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৬০ দিনে আট লাখ পিচ মাছ উৎপাদিত হয়। যার মধ্যে রয়েছে শিং, মাগুর, পাবদা, রুই, কাতলা ও মৃগেল মাছ।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক কৃষিবিদ শফিকুল ইসলাম জানান, ‘আমরা প্রাকৃতিক উৎস থেকে রেণুপোনা সংগ্রহ করে থাকি। পরে ট্যাঙ্কের মাধ্যমে রেণু নার্সিং করে পুকুরে মজুদ করার পর বিভিন্ন প্রজাতির মাছ উৎপাদন হয়ে থাকে। এসব মাছ আমরা দেশের বাজারের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করে থাকি।’
এব্যাপারে যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিছুর রহমান জানান, দাম কম হওয়ার কারণে ভারত থেকে রুই-কাতলা মাছ আমদানি হচ্ছে। এসব মাছের থেকে আমাদের দেশের রুই মাছের স্বাদ অনেক ভালো। ভারত থেকে মাছ আমদানি প্রয়োজন হয় না। এটি বন্ধ হলে আমাদের দেশের চাষিরা লাভবান হতেন। এক সময় ভারতে প্রচুর ইলিশ মাছ রপ্তানি হতো। ইলিশ পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের কাছে প্রিয় হলেও দেশের চাহিদা বিবেচনায় বিভিন্ন সময় তা রপ্তানি বন্ধ রাখে বাংলাদেশ সরকার। ২০১২ সালের আগে ভারতে ইলিশ রপ্তানি করা হতো। তবে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ২০১২ সালের পর ইলিশ রপ্তানি বন্ধ করে দেয় সরকার। ইলিশ রপ্তানি নিষিদ্ধ হলেও গতবছর দুর্গাপূজা উপলক্ষে ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেয় সরকার। তার প্রথম চালান গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর ভারতে যায়। এরপর থেকে আবারো বন্ধ রয়েছে ইলিশ রপ্তানি।
বর্তমানে আমাদের দেশে থেকে মূলত পাবদা, গুলশা, টেংরা ও পাঙাস মাছ রপ্তানি হয়ে থাকে। এর মধ্যে পাবদা মাছের চাহিদা বেশি। মোট রপ্তানির ৪০ শতাংশ যায় পাবদা। পাবদামাছ বেশি উৎপাদন হয়ে থাকে যশোর জেলায়। এছাড়া সাতক্ষীরা, খুলনা, ময়মনসিংহ, মাগুরা ও ফরিদপুর থেকে আসা মাছও রপ্তানি হচ্ছে।

আরও পড়ুন