বিক্ষিপ্ত ভাবনা-৩: মুখে বাংলা সিনেমার সস্তা ডায়ালগ

আপডেট: 04:30:04 09/07/2021



img

আহসান কবীর

আমি গোলাম মাজেদের সাংবাদিকতা প্রত্যক্ষ করিনি। তিনি যখন লেখালেখির জগতে বিচরণ করেছেন তখন আমি হাফ প্যান্ট পরি। পরে আমি যখন সংবাদকর্মী হই, তার বেশ আগেই তিনি শহিদ হয়েছেন। সাংবাদিকতাজগতে আসার পর তার কিছু লেখা পড়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কী ধারালো লেখা, অসাধারণ প্রকাশভঙ্গি!
বাবা শহিদ হওয়ার পর জ্যেষ্ঠ সন্তান আর এম সাইফুল আলম মুকুল দৈনিক রানারের হাল ধরেন। সাংবাদিকতার এথিকস তিনি কতটা মানতেন তা নিয়ে অনেকের মতো আমারও প্রশ্ন আছে। কিন্তু বাবার সাহসটুকু তিনি পেয়েছিলেন শতভাগ। কাউকে পরোয়া করে চলেননি বেঁচে থাকার আগমুহূর্ত পর্যন্ত। জ্ঞানত অন্যায় করতেন না, অন্যায়কে প্রশ্রয়ও দিতেন না মুকুল ভাই। জীবনে একটি মাত্র কবিতা লিখেছিলেন, যা কালোত্তীর্ণ হবে সন্দেহ নেই। ক্ষণজন্মা এই মানুষটি প্রেসক্লাব যশোরের শীর্ষ নেতৃত্বেও ছিলেন।
আমি যখন গণমাধ্যমে এসেছি তখনও পর্যন্ত যশোরে এই জগতে বেশকিছু তারকা জ্বল জ্বল করছিল। তাদের আচার-আচরণ, চাল-চলন, কথা-বার্তা, বোঝা-শোনা আমাদের মতো নবীনদের চমৎকৃত করতো। স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তাদের পাণ্ডিত্য ছিল ঈর্ষণীয়।
রাজনৈতিক এবং অন্যান্য সূত্রে অনেক কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে নূরুল আলমকে; যিনি ‘দৈনিক দেশহিতৈষী’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। মধ্যবয়সে অনেকটা আকস্মিকভাবে আমেরিকায় থিতু হলেও ভদ্রলোকের সাথে আমার এখনও যোগাযোগ আছে। কদাচিৎ দেশে এলে সামনা-সামনি কথাও হয়।
যশোরে থাকাকালে নূরুল আলম কখনও সচ্ছলতার মুখ দেখেননি। সাদামাটা জীবনযাপনে অভ্যস্ত অসম্ভব ভদ্রলোক নূরুল আলম টাকা উপার্জনের চেষ্টা করেছেন বলেও আমার মনে হয়নি। এই মানুষটির ব্যক্তিত্ব ছিল (এখনও আছে) অসাধারণ। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে কখনও পিছুপা হতেন না। সদা হাস্যোজ্জ্বল আলম ভাইও প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
সাংবাদিকদের ইউনিয়ন করতেন যারা, তাদের মধ্যে কর্মজীবনের শুরুতেই আমি সান্নিধ্য পাই ফকির শওকত ও শামছুর রহমান কেবলের। আমি আজ যে সাংবাদিক ইউনিয়ন করি, তা এই দুইজনের হাত ধরেই। এই দুই ব্যক্তির আবার ভিন্ন চরিত্র, দুইজনের মেজাজ ভিন্ন। কেবল ভাই দিনের বেশিরভাগ সময় লেখালেখি নিয়ে থাকতেন। দিনের পর দিন তার লেখা পত্রিকায় গুরুত্বসহকারে ছাপা হতো। তরুণ বয়সে আমরা তার লেখার দক্ষতা দেখে বিমোহিত হতাম। আর ফকির শওকত ছিলেন পুরোই তার উল্টো। আড্ডাবাজ মানুষ। মাস ছয়েক তার অধীনে কাজ করেছিলাম। তখন দেখেছি, অসাধারণ তার রিপোর্টিং সেন্স। নিজে রিপোর্ট করতে আলস্যের পরিচয় দিলেও সহকর্মীদের দিয়ে ঠিকই সময়ের সেরা রিপোর্টটি বের করে আনতে পারতেন।
সেই সময় যারা সাংবাদিকতায় উজ্জ্বল, তাদের মধ্যে আরেকজনের কথা বলতেই হবে। তিনি হলেন আইয়ুব হোসেন। প্রফেসর আইয়ুব। রগচটা মানুষটি এখন অনেক শান্ত। তবে সেই সময় তার সাংবাদিকতা তথা সম্পাদনায় দক্ষতা আমার মতে অতুলনীয় ছিল। ফকির শওকত-আইয়ুব হোসেন জুটির নেতৃত্বে যশোরের এযাবৎকালের সবচেয়ে মানসম্পন্ন পত্রিকাটি দাঁড়িয়েছিল। পরে পরস্পর বৈরী দুটি পত্রিকায় বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে আমার সাথে প্রায় প্রতিরাতেই আইয়ুব ভাইয়ের কথা হতো ফোনে। সদুপদেশ দিতেন। আমি জুনিয়র হলেও কখনও কখনও আমার পরামর্শও শুনতেন।
গোলাম মাজেদের মতো বীর সেনানীর সান্নিধ্য আমার কপালে জোটেনি। কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয়নি আব্দুল হাসিবেরও। কিন্তু সান্নিধ্য পেয়েছি ভদ্রতায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী এস কে এম জমির আহমেদ টুনভাইয়ের। মাহমুদুল হক রাজধানীবাসী ছিলেন। বয়সের বিস্তর ব্যবধান সত্ত্বেও শেষ দিকে অবশ্য তাসের টেবিলে হক ভাইয়ের সাথে বসার সুযোগ হয়েছে। শেখ আব্দুস সবুর সাংবাদিকতা ত্যাগের পর আমার সাথে আলাপ।
যাদের সম্বন্ধে দুই-চার লাইন বললাম, তারা ছিলেন যশোরের সাংবাদিকতার কাণ্ডারী। প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে তারাই যশোরের গণমাধ্যমজগতের নেতা ছিলেন। প্রত্যেকেই সুশিক্ষিত। তাদের আলোচনা-সমালোচনা, কথা-বার্তায় সেই জ্যোতি বিচ্ছুরিত হতো। মাহমুদুল হক চোস্ত ইংরেজি বলতেন। কথায় কথায় শেক্সপিয়ার, মিল্টন, বায়রনকে উদ্ধৃত করতেন। নূরুল আলম, আইয়ুব হোসেনরা কার্ল মার্কস, ভিআই লেনিন, মাও জে দংদের কথা আওড়াতেন। শেখ আব্দুস সবুর তো শেক্সপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের দুই-দশটি নয়, শত শত কবিতা মুখস্ত বলে দিতেন। কেবল ভাইয়ের আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল ভারতীয় রাজনীতি। ফকির ভাই আগের মতো আজও জাতীয় বা বিশ্বব্যবস্থার বিশ্লেষণ করেন প্রচলিত চিন্তার বাইরে গিয়ে।
আমি মানুষকে বিচার করি তার শিক্ষা, রুচি, যোগ্যতা, আচরণ বিবেচনায় নিয়ে। তিনি যে মত-পথেরই হোন না কেন, উল্লিখিত যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষকে বরাবরই আলাদা চোখে দেখি।
উপরে বর্ণিত অনন্য উচ্চতার এসব মানুষের কিছু বৈশিষ্ট্য উত্তরসূরিরা বহন করবেন সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হতাশার সাথে বলতে হয়, তেমনটি আর ঘটলো কই! যদিও তার আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক- নানা কারণ বিদ্যমান।
আমরা যারা আজ যশোরের গণমাধ্যমজগতের নেতৃত্বে, পূর্বসূরিদের নখের যোগ্যও হয়ে উঠতে পারিনি। নেই লেখাপড়া, নেই শিল্প-সাহিত্য-ধর্ম-সংস্কৃতি-রাজনীতি-অর্থনীতি সম্বন্ধে জ্ঞান। কূপমণ্ডুকতা গ্রাস করেছে সমাজের আর দশটা পেশার মতো মিডিয়াকেও। সাংবাদিকদের ‘উন্নত মম শির’ আজ অমুক নেতা, তমুক নেতার পায়ের নিচে গড়ায়। ‘সম্মানবোধ’, ‘স্বাধীনচেতা’ শব্দগুলো এখন গণমাধ্যমজগতে অতীত। এখন আমাদের কোনো কোনো নেতার মুখ থেকে কথা তো নয়, যেন দুর্গন্ধ বের হয়। মনীষী-বচন নয়, তাদের মুখে এখন বাংলা সিনেমার সস্তা, স্থূল ডায়ালগ। মহল্লার বাটপার শ্রেণির কথিত নেতাদের বন্ধু পরিচয় দিতে এরা গর্ববোধ করেন! আর কত নিচে নামলে আমাদের বোধোদয় হবে?

দুই. তবে আমি আশাবাদী মানুষ। এই যশোরে এখনও সৃজনশীল লেখালেখির জগতে শাহাদত হোসেন কাবিল, মিজানুর রহমান তোতা (তিনি এই মুহূর্তে আইসিইউতে; আমরা তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি), মোস্তফা রুহুল কুদ্দুস, মহিউদ্দিন মোহাম্মদ, তহীদ মনি, মিলন রহমানেরা দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। সশিক্ষিত এইচএম সিরাজ তো নিজ যোগ্যতায় নজরুল গবেষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন দেশজুড়ে। নানা মাধ্যমে রিমন খাঁন (যিনি দূরারোগ্য ক্যানসারে আক্রান্ত; আমরা তার আশু সুস্থতা কামনা করি), তৌহিদ জামান (করোনার বিরুদ্ধে লড়াইরত), সরোয়ার হোসেন, শিকদার খালিদ, দেবু মল্লিকসহ আরো বেশকিছু তরুণ সংবাদকর্মীর (সবার নাম উল্লেখ করা সম্ভব নয়) লেখা তাদের প্রতিভার পরিচয় দেয়। অশোক সেনকে যদি সেই আমলের উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন সাংবাদিক ধরি, তাহলে আমাদের আমলের সাইফুর রহমান সাইফ, ফিরোজ গাজী, এইচ আর তুহিনেরা কম কীসে?
প্রিয় পাঠক বলুন তো, বহুমাত্রিক জ্ঞানচর্চা কেন্দ্র প্রাচ্যসংঘের প্রতিষ্ঠাতা বেনজীন খানের মতো বক্তা, লেখাপড়া জানা, সমাজবাস্তবতা বিশ্লেষণ করা মানুষ ঢাকার বাইরে কোথায় মিলবে? জাহিদ হাসান টুকুন, যিনি যশোরের সাংবাদিকদের শীর্ষ সংগঠনের সর্বোচ্চ নেতা, তার মতো জনকল্যাণকামী কয়জন আছেন? আমিরুল আলম খানের মতো জ্ঞানতাপস আবার শহর যশোরে সাংবাদিকতা শুরু করেছেন। ফলে অন্ধকার বিদূরিত হবে, আলো আসবেই। এই আশা নিয়েই আঁকড়ে রয়েছি গণমাধ্যমজগতে।

লেখক: সম্পাদক, সুবর্ণভূমি ও প্রেসক্লাব যশোর