প্রতিজ্ঞা রক্ষা হয়েছে শিক্ষক সত্যজিতের

আপডেট: 11:18:14 10/10/2021



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর): ৩৫ বছর আগে ১৯৮৬ সালে যশোরের অভয়নগর উপজেলার ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন মণিরামপুরের সত্যজিৎ বিশ্বাস। চাকরির শুরুতে প্রতিজ্ঞা ছিল কোনোদিন স্কুলে অনুপস্থিত থাকবেন না। কর্মস্থলে পৌঁছাবেন নির্ধারিত সময়ের আগে। সেই প্রতিজ্ঞা রেখেছেন সত্যজিৎ। শেষ কর্মদিবস পর্যন্ত একদিনের জন্যও তার প্রতিজ্ঞা ভাঙেনি।
গত শনিবার (৯ অক্টোবর) ছিল সত্যজিৎ বিশ্বাসের শেষ কর্মদিবস।
রোববার (১০ অক্টোবর) দুপুরে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় দেন। গুণী এই মানুষটির বিদায় নিয়ে কোনো আড়ম্বর আয়োজন চোখে পড়েনি। বিদায় অনুষ্ঠানে দেখা যায়নি বিশেষ কোনো অতিথিকেও।
তবে, বিদায় যেভাবে হোক- তা নিয়ে কোনো দুঃখ নেই সত্যজিৎ বিশ্বাসের। স্কুলের শেষদিন পর্যন্ত প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পেরেছেন এটাই তার কাছে বড় অর্জন। এই খুশির পাশাপাশি বিষণ্নতা ছুঁয়েছে তাকে। আর স্কুলে যেতে পারবেন না। প্রিয় শিক্ষার্থীদের সাথে আর সময় দিতে পারবেন না- এমনটি ভাবতে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছেন তিনি।
স্কুল ছেড়ে থাকতে কেমন লাগবে জানতে চাইলে সত্যজিৎ বিশ্বাস বলেন, ছাত্রজীবন কেটেছে বইখাতা নিয়ে। এরপর কর্মজীবনে পুরোটা সময় স্বপ্ন; সব ছিল ছাত্রছাত্রীদের ঘিরে। এখন তাদের ছেড়ে থাকতে খারাপ লাগবে। কচি মুখগুলোর অভাববোধ হবে সবসময়।
তিনি বলেন, ‘ওনারা আমাকে মাঝেমধ্যে স্কুলে যেতে বলেছেন। আগামী ২১ তারিখ স্কুল খুলবে। আমি যাব। স্কুল ছেড়ে কীভাবে থাকব ভেবে পাচ্ছি না।’
মণিরামপুর উপজেলার হরিদাসকাটির কুচলিয়া গ্রামে শিক্ষক সত্যজিতের বাড়ি। উপজেলার অন্য এলাকা দূরের কথা গ্রামের মানুষও ঠিকভাবে তাকে চেনেন না। কারো সাথে মিশতেও পারবেন না। একাকী থাকতে হবে- জানান তিনি।
এদিকে প্রিয় শিক্ষকের বিদায়ে চোখের পানি ঝরেছে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের। বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সাদিয়া খাতুন বলে, ‘স্যার আমাদের গণিত পড়াতেন। কোনো কিছু না বুঝলে বারবার বুঝিয়ে দিতেন। সন্তানের মতো দেখতেন। কোনো সময় আমাদের ওপর রাগ করেননি। তাকে পেয়ে আমরা গর্বিত। সত্যজিৎ স্যার আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তার ক্লাস আর করতে পারবনা- ভাবতেই চোখ ভিজে যাচ্ছে।’
ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, করোনা ও ব্যস্ততার কারণে বেশি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়ভাবে কয়েকজনকে নিয়ে সহকর্মী সত্যজিৎ বিশ্বাসকে বিদায় জানাতে হয়েছে।
সত্যজিৎ বিশ্বাস ১৯৮৪ সালে বিএসসি পাশ করার পর শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮৬ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর সহকারী শিক্ষক হিসেবে পাশের অভয়নগরের ধোপাদী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। এরপর থেকে নবম ও দশম শ্রেণির গণিত ও বিজ্ঞান পড়াতেন। কর্মজীবনের শুরুতে এই মানুষটি সঠিক সময়ে নিয়মিত কর্মস্থলে হাজির হওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। ভাবতেন, তিনি প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত না থাকলে শিক্ষার্থীদের গণিত আর বিজ্ঞান পড়াবেন কে?
সেই ভাবনা থেকে ৩৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনে একদিনও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেননি। বাড়ি থেকে সাইকেল চালিয়ে ৫-৬ কিলোমিটার দূরে স্কুলে হাজির হতে একদিনও দেরি হয়নি তার। এমনকী বাবার মৃত্যু এবং নিজের বিয়ের দিনও তিনি স্কুলে হাজির হয়েছেন।
২০১৫ সালে একই প্রতিষ্ঠানে সহকারী প্রধান হিসেবে যোগ দেন তিনি। বেড়ে যায় ব্যস্ততা। তারপরও কোনোদিন ক্লাস নেওয়া বাদ দেননি এই শিক্ষক।
এসব গুণের কারণে বহুবার পুরস্কৃত হয়েছেন সত্যজিৎ বিশ্বাস। দেশজুড়ে খ্যাতি ছড়িয়েছে তার। তার এই অসাধারণ কৃতিত্ব নিয়ে সম্প্রতি সুবর্ণভূমি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে