প্রজন্ম ভুলতে বসেছে শিল্পী ও সুরকার কমল দাশগুপ্তকে

আপডেট: 07:19:36 12/01/2021



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : উপমহাদেশের সংগীতের ইতিহাসে কমল দাশগুপ্ত একটি স্মরণীয়-বরণীয় নাম। বরেণ্য শিল্পী, সুরকার ও সংগীত পরিচালক কমল দাশগুপ্ত ১৯১২ সালে ২৮ জুলাই তৎকালীন নড়াইল মহকুমার অধীন কালিয়ার পৌর এলাকার বেন্দা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কমল দাশগুপ্তের বাবার নাম তারা প্রসন্ন দাশগুপ্ত। তিনি আইন পেশায় নিযুক্ত ছিলেন।
সৃজনশীলতা, মেধা-মনন আর কঠোর সাধনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সংগীতকে আত্মস্থ করেছিলেন। তিনি একমাত্র শিল্পী, যিনি মাত্র ২৩ বছর বয়সে ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’ নামে বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানির সংগীত পরিচালক ও সুরকার হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এমন ঘটনা দ্বিতীয়টি নেই। অথচ, বর্তমান প্রজন্ম ভুলতে বসেছে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই বরেণ্য শিল্পীকে। প্রজন্ম জানেই না, কমল দাসগুপ্ত কে ছিলেন।
কালিয়া শহরের উপকণ্ঠে নবগঙ্গা নদীর ভাঙনে বহু বছর আগেই কমল দাশগুপ্তের পৈত্রিক বাড়িটি বিলীন হয়ে গেছে। তার কোনো স্মৃতিচিহৃ নেই আজকের কালিয়ার বেন্দা গ্রামে।
কমল দাশগুপ্ত ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি সংগীত চর্চার প্রতি ঝুঁকে পড়ে। শৈশবকালে সে বড় ভাই অধ্যাপক বিমল দাশগুপ্তের কাছে ‘খেয়াল’ গান দিয়ে সংগীত জীবনের সূচনা করে। এরপর তিনি প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ডি এল রায়ের ছেলে দিলীপ রায়, কৃষ্ণচন্দ্র দে এবং ওস্তাদ জমির উদ্দিন খাঁর কাছে ‘রাগ-রাগিনী’র তালিম নেন। এ সময় তিনি খেয়াল, ঠুমরী, দাদরা ও গজল রপ্ত করেন।
প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত কমল দাশগুপ্ত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের একান্ত সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম রচিত বহু গানের সুরস্রষ্টা ছিলেন তিনি। ১৯৩৪ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত তিনি তিনি কাজী নজরুল ইসলামের কাছে সুর ও সংগীতের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষাগ্রহণ করেন। ওই সময় তিনি একজন পেশাদার নজরুল সংগীত শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। নজরুল সংগীত অঙ্গনে তিনি ‘মাস্টার কমল’ নামে পরিচিত ছিলেন। দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত প্রায় ৩০০ গানে সুর দিয়েছেন কমল।
বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের নজরুলসংগীতের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী ফিরোজা বেগমের সাথে কমল দাশগুপ্তের সখ্য গড়ে ওঠে। সেই সূত্রে ১৯৫৫ সালে তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে ফিরোজা বেগমকে বিয়ে করেন। তাহসিন, হামিন ও শাফিন আহম্মেদ নামে তাদের তিন ছেলেসন্তান রয়েছে। হামিন ও শাফিন দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘মাইলস’র কর্ণধার হিসেবে সঙ্গীতাঙ্গনে সুপরিচিত।
কমল দাশগুপ্ত বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। বাংলা গানের পাশাপাশি তিনি হিন্দি ও উর্দু গজল, ভজন, উচ্চাঙ্গ সংগীত, হামদ ও নাথ পরিবেশন করে দর্শক-শ্রোতার মন জয় করেন। সংগীত পরিচালক হিসেবেও কমল দাশগুপ্তের সুনাম রয়েছে। প্রায় ৮০টি চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক ছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় দশ হাজার গানের সুর দিয়েছেন।
১৯৫৮ সালে তার সুরারোপিত গানের সংখ্যা সাত হাজার অতিক্রম করায় বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি কমল দাশগুপ্তের গানের ‘সিলভার জুবিলী উৎসব’ পালন করে- যা উপমহাদেশের সংগীতের ইতিহাসে একটি মাইলফলক।
প্রচারবিমুখ শিল্পী ও সুরকার কমল দাশগুপ্ত ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
নড়াইলের সিনিয়র সাংবাদিক কার্তিক দাস বলেন, ‘বরেণ্য এই শিল্পী ও সুরকারের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা উচিত। তাকে স্মরণ করা হলে জেলার তথা দেশের সংস্কৃতি সমৃদ্ধি হবে।’
নড়াইলের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শিক্ষক নাজমুল হাসান লিজা বলেন, 'কমল দাশগুপ্ত একটি প্রতিষ্ঠান, তার জন্ম নড়াইলে হওয়ায় আমরা ধন্য। তার নামে নড়াইলে একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আমি বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।'
কালিয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক যুগান্তরের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি শাহিদুল ইসলাম শাহি বলেন, গুণী এই শিল্পী ও সুরকারের জন্মভিটা নবগঙ্গা নদীর গ্রাসে বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমান প্রজন্ম তার সম্পর্কে কিছুই জানে না। তার জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী নড়াইলবাসীর পালন করা উচিত।
সঙ্গীতশিল্পী বাদল দাস বলেন, কমল দাশগুপ্তর মতো বরেণ্য শিল্পীর কর্মময় জীবন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রজন্মকে এই গুণী শিল্পী ও সুরকার সম্পর্কে অবহিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।

আরও পড়ুন