পিলখানা হত্যাকাণ্ড : হাইকোর্টের রায়ের পর যে অপেক্ষা

আপডেট: 10:21:03 25/02/2021



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মামলায় ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় (ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের ওপর) প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। সে রায়ের বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে জমা পড়েছে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আপিল আবেদন। তাই নিয়ম অনুসারে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দণ্ডিতদের সাজা কার্যকরে অপেক্ষা করতে হবে আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের।
ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এই রায়টি ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের সে রায়ে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৫২ আসামির মধ্যে ১৩৯ জনের ফাঁসির রায় বহাল রাখা হয়। একইসঙ্গে আট জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন ও চার জনকে খালাস দেওয়া হয়। অন্যদিকে এ মামলার অন্যতম আসামি বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন পিন্টু হাইকোর্টের বিচার চলাকালীন সময়ে মারা যান।
পাশাপাশি বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন পাওয়া ১৬০ জন আসামির মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এদের মধ্যে দুই আসামির মৃত্যু এবং ১২ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
এছাড়াও জজ আদালতে খালাস পাওয়া ৬৯ আসামির মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের ভিত্তিতে ৩১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে এ মামলায় চার জনকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং ৩৪ জনকে খালাসের বিচারিক আদালতের রায় হাইকোর্ট বহাল রাখেন।
এরপর ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের স্বাক্ষরের পর রায়টি প্রকাশিত হয়। রায়টি ছিল মোট ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠার।
ওই রায়ে পিলখানায় ঘটে যাওয়া ঘটনার ব্যাপারে বিজিবি কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা ইউনিটের ব্যর্থতা তদন্ত করে তা জনসস্মুখে প্রকাশ করতে হবে বলে রায়ে সুপারিশ করেছিলেন হাইকোর্ট।
তবে একই বছরের ৯ জানুয়ারি বহুল আলোচিত পিলখানা হত্যাকাণ্ড মামলাটির জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. শওকত হোসেন অবসরে গেছেন। সংবিধান অনুসারে বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের বয়স ৬৭ বছর পূর্ণ হওয়ায় তিনি অবসরে যান।
এদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এ রায়ের অনুলিপি সংরক্ষণের জন্য বাংলা একাডেমিতে হস্তান্তর করে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। মূল রায়টি ২৯ হাজার ৫৯ পৃষ্ঠায় লেখা হলেও এর মধ্যে মাতৃভাষা বাংলায় লেখা ১৬ হাজার ৫৫২ পৃষ্ঠার রায়ের অংশটুকু বাংলা একাডেমিতে হস্তান্তর করা হয়।
এরইমধ্যে রায়টির নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা খালাস চেয়ে এবং খালাস ও কম দণ্ডের আসামিদের দণ্ডবৃদ্ধিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন জানিয়েছেন যথাক্রমে আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। ফলে আইনি বিধি-বিধান অনুসারে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলে তবেই রায়টি কার্যকর করা সম্ভব হবে।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে মোট ২০টি আপিল দায়ের করা হয়েছে। যেহেতু একেকটি আপিলের পৃষ্ঠা সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার পৃষ্ঠা, তাই আপিল দায়েরের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। আসামিদের মধ্যেও অনেকে আপিল দায়ের করেছেন। আশা করছি, চলতি বছরেই সব আপিল আবেদনের ওপর শুনানি শুরু করতে পারবো।’
আসামিপক্ষের অন্যতম আইনজীবী আমিনুল ইসলাম জানান, ‘প্রতিটি আপিল অসংখ্য পৃষ্ঠার সমন্নয়ে তৈরি করা হয়েছে। তবুও যথাসময়ে আমরা আমাদের আপিল আবেদনে বেশকিছু যুক্তিতর্ক উপস্থাপনও করেছি। এখন শুনানির দিন নির্ধারণ হলেই আমরা আদালতে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরবো। সর্বোচ্চ আদালতে ন্যায়বিচার পাবো বলেও আমরা বিশ্বাস রাখি।’
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস-বিডিআরের (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ- বিজিবি) সদর দফতর পিলখানায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করে সংস্থাটির বিপদগামী সদস্যরা। হত্যাযজ্ঞ ছাড়াও চালানো হয় লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ।
পিলখানা হত্যাকাণ্ডের তিন দিন পর ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর লালবাগ থানায় ছয় জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা দায়ের করে পুলিশ। পরে মামলাটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১০ সালের ১২ জুলাই পিলখানা হত্যা মামলায় ৮২৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। পরে সম্পূরক অভিযোগপত্রে আরও ২৬ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করায় আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৫০ জনে।
এছাড়াও বিস্ফোরক আইনে ৭৮৭ জনকে অভিযুক্ত করে আলাদা একটি অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। এরপর সম্পূরক চার্জশিটে আরও ২৬ জনকে আসামি করা হয়। বর্তমানে এ মামলার আসামি রয়েছে ৮৩৪ জন।
রাজধানীর বকশিবাজারে মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিশেষ এজলাসে এই দু'টি মামলার একসঙ্গে বিচারকাজ শুরু হয় ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে হত্যা মামলাটির রায় দেন এই বিচারিক আদালত। এরপর হত্যা মামলাটি হাইকোর্টে গেলে আপিল করেন আসামি পক্ষ। আপিল শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর আপিলের রায় দেন বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারের বেঞ্চ। এ বছরের ৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। এই রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। এছাড়া যাবজ্জীবন দণ্ড দেওয়া হয় ১৮৫ জনকে। ২০০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। খালাস দেওয়া হয় ৪৫ জনকে। নিম্ন ও উচ্চ আদালতে হত্যা মামলার সাড়ে ৮শ’ আসামির মধ্যে খালাস পান ২৭৮ জন। মামলার বিচার চলাকালে মারা যান চার জন।
অন্যদিকে, বিস্ফোরক আইনের মামলাটি এখনও নিম্ন আদালতের বিচারাধীন। বকশিবাজারের মহানগর দায়রা জজ আদালতের সেই বিশেষ এজলাসে এর শুনানি চলছে।
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন