পাকা ঘরে বাস করা হলো না রুপাই বিবির

আপডেট: 09:26:31 14/12/2019



img

মৌসুমী নিলু, নড়াইল : শতেক তালির জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস আর ভিক্ষাবৃত্তি করেই কেটেছে উপজেলার কলাবাড়িয়া গ্রামের ভিক্ষুক রুপাই বিবির জীবন। সারা জীবনের বসবাসের দুর্দশা কাটাতে চেয়েছিলেন সরকারের দেওয়া একটি দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহে নাতি-নাতনি নিয়ে বসবাস করে।
কাঙ্ক্ষিত ও স্বপ্নের ঘরটি তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু নির্মাণ কাজে ঠিকাদারের বিলম্বের কারণে সেই ঘরে বাস করে যেতে পারেননি তিনি। তার আগেই তাকে এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হয়েছে।
হতদরিদ্রদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণ কাজের শেষ সময় ছিল গত ৩০ জুন। কিন্তু কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও নড়াইলের কালিয়ায় নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি।
নিয়ম লঙ্ঘন করে ঠিকাদার নিয়োগ করায় ওইসব বাসগৃহের নির্মাণ কাজ বিলম্বিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর বিলম্বে কাজ শুরু করার কারণে ওইসব ঘরের নির্মাণ কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন কথিত ঠিকাদার। হতদরিদ্রদের বাসগৃহ নির্মাণ এখন ওই ঠিকাদারের মর্জিতে বন্দি হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে কালিয়া উপজেলায় ৪২ জন হতদরিদ্রের জন্য দুর্যোগ সহনীয় ঘর নির্মাণে ঘরপ্রতি দুই লাখ ৫৮ হাজার টাকা হিসেবে মোট এক কোটি আট লাখ ৩৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। বরাদ্দ করা অর্থ গত ৩০ জুনের আগেই তুলে ইউএনওর ব্যাংক হিসাবে জমা করলেও গত বছরের আগস্ট মাসে একজন ঠিকাদার নিয়োগ করে ওইসব বাসগৃহ নির্মাণ কাজ শুরু করা হয়। শর্ত অনুযায়ী গত বছর ৩০ জুনের মধ্যে কাজটি শেষ করার কথা ছিল।
সরেজমিনে জানা গেছে, ওইসব ঘরের নির্মাণ কাজ অসম্পূর্ণ থাকলেও দুই মাসেরও বেশি সময় বন্ধ রয়েছে নির্মাণ কাজ। এর কোনোটিতে আংশিক দেয়াল তোলা হয়েছে, কোনোটিতে আবার ছাদে আংশিক টিন দেওয়া হয়েছে। আংশিক ও অর্ধনির্মিত ওইসব ঘরের দিকে তাকিয়ে সরকারি ঘরে বসবাসের আশায় বুক বেঁধে রয়েছেন হতদরিদ্ররা। কিন্তু সরকারের বরাদ্দ করা অর্থ ব্যাংকে জমা থাকলেও নির্মাণ কাজের অগ্রগতি নেই।
কালিয়ার ইউএনও ৪২টি বাসগৃহ নির্মাণের জন্য জনৈক মো. রেজাউল ইসলামকে মৌখিকভাবে ঠিকাদার নিয়োগ করেছেন। ঠিকাদারের মাধ্যমে নির্মাণাধীন বাসগৃহের নির্মাণ কাজও নিম্নমানের হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইউএনওর নিয়োগ করা ঠিকাদার রেজাউল ইসলাম বলছেন, গত কুরবানির ঈদের পর ইউএনও প্রতিটি ঘর নির্মাণের জন্য ৫০ হাজার টাকা হারে মজুরি দেওয়ার শর্তে তাকে মৌখিকভাবে কাজ দিয়েছেন। বৃষ্টির কারণে মালামাল পরিবহনের সমস্যা থাকায় যথাসময়ে ঘরগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ করতে পারেননি। অল্প সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে তিনি আশা করছেন।
ভিক্ষুক রুপাই বিবির ছেলে তারা মিয়া শরীফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সারা জীবন বসবাসের কষ্ট ভোগ করার পর তার মায়ের নামে দেওয়া হয়েছে একটি দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ। গত কুরবানির ঈদের পর ঘরটির নির্মাণ কাজ শুরু হলেও এখনো ইটের গাঁথুনির কাজই শেষ হয়নি। সারা জীবন জরাজীর্ণ ঘরে বসবাসকারী মা রুপাই বিবি নাতি-নাতনিকে নিয়ে নতুন ঘরে শুয়ে তার জীবনের সাধ মেটাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সময়মতো তার বাসগৃহটি নির্মাণ না হওয়ায় গরিব বৃদ্ধার ইচ্ছা পূরণ হয়নি। গত ৮ ডিসেম্বর তিনি পৃথিবী ছেড়েছেন।
অপরদিকে ওইসব বাসগৃহ পাওয়া একাধিক হতদরিদ্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাদের জন্য বাসগৃহের নির্মাণ কাজ শুরু হলেও রহস্যজনক কারণে সেগুলো মাসের পর মাস বন্ধ রয়েছে। সরকার সদয় হলেও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাদের দুর্দশা বুঝতে পারছেন না। তারা জানতে চেয়েছেন সরকারের দেওয়া বাসগৃহ বানাতে আর কত দিন লাগবে? আর তারা কবে থেকে বসবাস করতে পারবেন সরকারি নতুন ঘরে?
কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘মজুরির ভিত্তিতে জনৈক মো. রেজাউল ইসলামকে হতদরিদ্রের ওইসব বাসগৃহ নির্মাণের কাজ দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। খবর নিয়েছি হতদরিদ্রের বাসগৃহগুলো নির্মাণের কাজ চলছে। অল্প সময়ের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ হবে।’

আরও পড়ুন