পাঁচালি

আপডেট: 10:04:01 01/10/2020



img

গোলাম মুরশিদ

পাঁচালি কথাটা কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু পাঁচালি গান কী, তা নিয়ে বিতর্ক নেই। এক কথায়, পাঁচালি গান বলতে বোঝায় কাহিনী-ভিত্তিক বা আখ্যানমূলক লোকগীতি। এর আঙ্গিক অবশ্য এক রকমের নয়। বিষয়বস্তুও নানা ধরনের। পৌরাণিক কাহিনী থেকে সমসাময়িক ঘটনা—সবই এর বিষয়বস্তু হতে পারে। আঠারো শতক পর্যন্ত পৌরাণিক বিষয় নিয়েই পাঁচালি রচিত হতো। তারপর উনিশ শতকে এসে প্রবল প্রতিযোগিতার মুখে এর বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আসে। তা ছাড়া, আঙ্গিকেও আসে বৈচিত্র্য। কিন্তু তাতেও শেষ পর্যন্ত এর ভরাডুবি রক্ষা পায়নি।
এক সময়ে বঙ্গীয় সমাজ এবং সাহিত্যে পাঁচালি ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছিলো। নাচ আর গানের মাধ্যমে কাহিনী পরিবেশন করার নামই তখন ছিলো পাঁচালি। আর যে-কাহিনী সবচেয়ে সহজে শ্রোতাদের হৃদয় হরণ করতে পারতো, সে হলো রাধাকৃষ্ণের প্রণয় কাহিনী। একই সঙ্গে এ কাহিনীতে ঘটেছিলো বিচিত্র রসের সমাহার–মিলন-বিরহ, দেবদেবীর প্রেমের নামে আদিরসের ছড়াছড়ি এবং পুণ্যের নেশা। মোট কথা, রাধাকৃষ্ণের পাঁচালি শোনাকে সবাই মনে করতো একাধারে ইহকালের আনন্দ লাভ আর পরকালের পুণ্য অর্জন। আসলে, চৈতন্যদেব রাধাকৃষ্ণের কাহিনীকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তুলে বিদায় নিয়েছিলেন। তাই যারা বৈষ্ণব নয়, তারাও রাধাকৃষ্ণের পাঁচালি শুনতে যেতো, উপভোগ করতো।
কেবল রাধাকৃষ্ণের কাহিনী নয়, শ্যামাসংগীত যখন জনপ্রিয়তা লাভ করলো তখন আগমনী ও বিজয়ার উপাখ্যানও পাঁচালির মধ্যে ঢুকে পড়লো। এও পাঁচালির আকর্ষণ বৃদ্ধি করেছিলো। কিন্তু আঠারো শতকে তার ওপর ট্যাক্কা মারলেন গোঁজলা গুঁই (জন্ম ১৭০৫?)। তিনি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন খুব সম্ভব পাঁচালি দিয়ে। তাঁর জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। তবে অনুমান করা যায় তিনি খুব চতুর ব্যক্তি ছিলেন। উদ্ভাবনী ক্ষমতা তো তাঁর ছিলোই। তিনি ভেবে দেখলেন, পাঁচালির নিস্তরঙ্গ স্রোতে দুটো দল তৈরি করে দুই দলের মধ্যে একটা কবির লড়াই লাগিয়ে দিতে পারলে, সেই নতুন ধরনের গান রাতারাতি শ্রোতাদের হৃদয় হরণ করতে পারে। বাস্তবে হলোও তাই। কিন্তু একা তো কবির লড়াই হয় না! তিনি তাঁর দু-তিনজন শিষ্যকে কবিগানের কৌশল শিখিয়ে দিলেন। এই নতুন পালাগানের নাম হলো কবিওয়ালার গান অথবা কবি গান। তারপর এই পালাগান কয়েক দশকের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে গেলো।
আগেই বলেছি, মধ্যযুগে পাঁচালি পরিবেশন করতো একই ব্যক্তি। সেই ব্যক্তিই কখনো গান গেয়ে, কখনো ছড়া কেটে, কখনো আবৃত্তি করে, কখনো অভিনয় করে, এমন কি, কখনো নেচে নেচে কাহিনীটি পরিবেশন করতো। রাধাকৃষ্ণের আদিরসাত্মক কাহিনী তো ছিলোই, তার ওপর তখনকার জনপ্রিয় কাহিনীসমূহ ছিলো পাঁচালির বিষয়বস্তু। যেমন, বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যের কাহিনী অথবা আখ্যানকাব্যের গল্প। তফাত ছিলো কেবল আঙ্গিকে। মঙ্গলগীতি ছিলো অনেকটা যাত্রা গানের মতো। বহুজন মিলে তা উপস্থাপন করতো। অপর পক্ষে, পাঁচালি গোড়াতে ছিলো একজনের পরিবেশনা। পরে বৈচিত্র্য আনতে গিয়ে তাতে ‘অভিনেতা’র সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাদ্যযন্ত্রীও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে দলের মধ্যে।
উনিশ শতকে এসে পাঁচালির বিষয়বস্তু আর পৌরাণিক কাহিনীতে সীমাবদ্ধ থাকলো না। যেমন, এতে সমাজের সমসাময়িক প্রসঙ্গ আসতে আরম্ভ করে। ফলে সতীদাহ, বিধবাবিবাহ, বহুবিবাহ ইত্যাদির মতো একেবারে চলতি সামাজিক আন্দোলনও পাঁচালির বিষয়বস্তুতে পরিণত হলো। এমন কি, নীল আন্দোলনের মতো আধা-রাজনৈতিক ঘটনা নিয়েও পাঁচালি রচিত হয়েছিলো।
কয়েক শতাব্দীর পাঁচালির ইতিহাসে সবচেয়ে নাম-করা কবি ছিলেন সম্ভবত দাশরথি রায়। তিনি বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন উনিশ শতকের শুরুতে—আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে ১৮০২ সালে। লেখাপড়া শিখেছিলেন মামার যত্নে থেকে। তারপর তিনি স্থানীয় এক নীলকুঠিতে কেরানির কাজ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু কাব্য ও সংগীতে তাঁর ছিলো সহজাত আকর্ষণ ও দক্ষতা। বর্ধমানের নীলকুঠি তাঁকে আটকে রাখতে পারলো না। তিনি এসে কলকাতায় ঘর বাঁধেন। সেখানে তিনি এক কবিওয়ালার দলে যোগ দান করেন। তাঁর কবিত্ব ছিলো, গলায় সুরও ছিলো। তাই অচিরেই তাতে খ্যাতি ও সাফল্য অর্জন করেন। তাঁর কাজ ছিলো দলের জন্যে পালাগান রচনা করা এবং তারপর তা পরিবেশন করা। কিন্তু একবার প্রতিপক্ষের এক কবিয়াল মঞ্চে উঠে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ তুলে তাঁকে অপমান করেন। এটা তিনি সহ্য করতে পারেননি। তিনি তাই কবিওয়ালার দল ছেড়ে দেন।
কেবল দল ছেড়ে দেওয়া নয়, অতঃপর তিনি কবি গানই ছেড়ে দেন। গঠন করেন নিজের পাঁচালি দল। সেই দলের জন্যে তিনি অনেকগুলো পালা এবং গান রচনা করেছিলেন। তাঁর পালার সংখ্যা ৬৮ এবং গানের সংখ্যা ৬৭৫। এসব গানের মধ্যে কয়েকটি শ্যামাসংগীতও ছিলো। তবে তার থেকেও বড়ো কথা তিনি সামগ্রিকভাবে পাঁচালি গানের মানই উন্নত করেন। এবং কবি গানের কিছু চটকদার বৈশিষ্ট্য তিনি পাঁচালি গানে প্রয়োগ করেন। ফলে তাঁর পাঁচালি গান বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। সফল পাঁচালিকার হিসেবে তিনি অনেক টাকাপয়সাও উপার্জন করেন।
তিনি ভালো করে গান শিক্ষা করেছিলেন এবং নিজের দলের পাঁচালির আসরে নিজের লেখা গান পরিবশেন করতেন। অল্প দিনের মধ্যে কলকাতা এবং নবদ্বীপের পণ্ডিত সমাজ তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি দেন। বর্ধমানের মহারাজা এবং কলকাতার রক্ষণশীল হিন্দুদের নেতা রাধাকান্ত দেব সংস্কৃতিক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্যে তাঁকে পুরস্কারও দিয়েছিলেন। তাঁর রচনার মান বিবেচনা করে পরবর্তী শতাব্দীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর রচনাবলী প্রকাশ করে।
পাঁচালি গানে কেবল সমসাময়িক বিষয়বস্তু আমদানি করা নয়, উনিশ শতকে যাত্রা গানের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিলো। সেকালের অন্তত দুজন নাম-করা পাঁচালিকার প্রথমে যাত্রা দল গঠন করেছিলেন, তারপর পাঁচালি রচনায় মন দিয়েছিলেন। এই পাঁচালিকার দুজন হলেন ঠাকুরদাস দত্ত এবং ব্রজমোহন রায়। দুজনই উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সক্রিয় ছিলেন। ঠাকুরদাস প্রায় সমবয়সী (জন্ম ১২০৩ বঙ্গাব্দ) ছিলেন দাশরথি রায়ের। তিনি প্রথমে শখের এবং পরে পেশাদারী যাত্রা দল গঠন করেন। তাতে সাফল্যও আসে। কিন্তু পাঁচালির প্রতি আকর্ষণ তিনি এড়াতে পারেননি। তাই যাত্রাদল ভেঙে দিয়ে পাঁচালির দল গঠন করেন। অতঃপর একের পর এক পাঁচালি গান লিখতে থাকেন। যেসব পালা তিনি রচনা করেন, সেগুলোর বিষয়বস্তু প্রায় সবই পৌরাণিক। দেব-দ্বিজে বাঙালির ভক্তি কিংবদন্তীর মতো। পৌরাণিক বিষয় নিয়ে লেখা তাঁর পাঁচালিগান থেকে তাই তিনি এন্তার খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন।
আর-একজন পাঁচালিকারের কথা বলা দরকার। তাঁর নাম রসিকচন্দ্র রায়—দাশরথি রায়ের চেয়ে পনেরো বছরের ছোটো। তিনি ভারতচন্দ্র রায়ের অনুসারী ছিলেন। তাঁর সত্যিকার কবিপ্রতিভাও ছিলো। ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দরের অনুকরণে তিনি ‘জীবনতারা’ নামে একটি কাব্য রচনা করেছিলেন। ভারতচন্দ্রের কবিত্ব তাতে অবশ্য ছিলো না। কিন্তু তা বিদ্যাসুন্দরের অশ্লীলতাকে নিঃসন্দেহে ছাড়িয়ে গিয়েছিলো। মাইকেল মধুসূদন দত্তের মতো তিনি লিখেছিলেন যে, তিনি নতুন রসের কাব্য— মঙ্গলকাব্য রচনা করবেন। কিন্তু সে মঙ্গলকাব্য তাঁর কল্পনাতেই থেকে যায়। পাঁচালিতেও তাঁর কবিপ্রতিভার পুরো প্রতিফলন ঘটেনি। এখানে তাঁর পাঁচালি থেকে অশ্লীলতার একটা দৃষ্টান্ত দিই:
করে পয়োধর ধরে করে পয়োধর ধরে,
কান্ত করে দন্তাঘাত আদরে অধরে।
ক্রমে সহলে মহলে ক্রমে সহলে মহলে
রসিক ভ্রমর বসায় কমলে।
ঘনমুখামৃত পান ঘন মুখামৃত পান
নিতম্বে নিতম্বে যুদ্ধ গজের সমান।
দুইজনে মাতামাতি দুইজনে মাতামাতি
তিনবার কর্ম সাঙ্গ পোহাইল রাতি।
তবে পাঁচালিকারগণও তাঁদের গানের আঙ্গিকে নতুন নতুন চমক লাগিয়ে আর পুরোনো ও সমসাময়িক বিয়য়বস্তু আমদানি করে পাঁচালি গানকে নতুন যৌবন দিতে চেষ্টা করেছিলেন। অবাক হবার বিষয় হলো সবচেয়ে প্রতিভাবান পাঁচালিকারদের জ্ন্ম হলো আঠারো শতকের শেষ ভাগে নয়তো উনিশ শতকের প্রথম দিকে—ভোলা ময়রা, হরু ঠাকুর, রাম বসু, দাশরথি রায় প্রমুখ। শেষ জনকে বিবেচনা করা হয় সবচেয়ে প্রতিভাবান পাঁচালিকার বলে।
অপর পক্ষে, মনোমোহন বসুর জন্ম এঁদের সবার পরে আর তাঁর প্রতিভাও ছিলো বিচিত্রমুখী। তাঁর যাত্রা গানের অভিজ্ঞতা ছিলো। অভিজ্ঞতা ছিলো তখনকার ‘আধুনিক’ মঞ্চ নাটকেরও। তিনি পাঁচালির আসরে নামেন শতাব্দীর মধ্য ভাগে। তিনি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের শিষ্য। ঈশ্বরচন্দ্রের মধ্যে প্রাচীনত্ব ও আধুনিকতার যে-দ্বন্দ্ব ছিলো, সে দ্বন্দ্ব মনোমোহন বসুও তাঁর গুরুর কাছ থেকে উত্তরাধিকার-সূত্রে লাভ করেছিলেন। ১৮৬৭ সালে যে-জাতীয়তাবাদী ‘হিন্দু মেলা’র সূত্রপাত, তার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ঘটে। ফলে এই পথে তাঁর মধ্যে দেশাত্মবোধও দেখা দিয়েছিলো। তিনি কয়েকটি নাটক রচনা করেন। তাঁর আধুনিক নাটকের আঙ্গিকের সঙ্গে তিনি পুরোনো যাত্রা গান এবং পাঁচালির যোগাযোগ ঘটিয়েছিলেন। সত্যিকারভাবে, পাঁচালি তার গৌরব হারানোর আগে তিনি শেষ বারের মতো যাত্রা এবং নাটক থেকে নতুনত্ব আমদানি করে পাঁচালিতে মৃতসঞ্জীবনী দান করতে চেষ্টা করেছিলেন।
আসলে, পাঁচালির আঙ্গিকের মধ্যেই একঘেয়েমির সম্ভাবনা লুকানো ছিলো। সে জন্যে বারবার তার আঙ্গিকে পরিবর্তন ও সংস্কার এসেছিলো— কখনো কবি গানের মধ্যে যে-বিতর্কের নাটকীয়তা থাকে, তা থেকে। কখনো-বা যাত্রা গানের অভিনয় এবং গান-বাজনা ও নাচের অনুকরণে। কিন্তু পাঁচালির সময় আসলে ফুরিয়ে গিয়েছিলো। সে ধীরে ধীরে তার জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলে। তবে অবলুপ্তির আগে সে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় কিছুদিনের জন্যে টিকে থাকে।
[বিডিনিউজ থেকে]