নয় মাথার খেজুরগাছে সারে রোগ-বালাই!

আপডেট: 03:19:16 19/08/2021



img

মণিরামপুর (যশোর) প্রতিনিধি: মণিরামপুরের মদনপুর গ্রামে সাত মাথা আর নয় মাথার দুটো খেজুরগাছে মানতের হিড়িক পড়েছে। বিশ্বাসীদের বক্তব্য, এতে তাদের মনোবাসনা পূরণ হয়।
একগাছে বহু মাথা গজানোয় বিষয়টি ‘সৃষ্টিকর্তার বিশেষ সৃষ্টি’ ভেবে লোকজন নানা কারণে এখানে এসে মানত করছেন। এখানে কেউ আসেন সন্তান চাইতে আবার কেউ আসেন রোগমুক্তির জন্য। ‍“নিয়ত নিয়ে কেউ এলে, তার মনের আশা পূর্ণ হয়”- বহুবছর ধরে এমন কথা চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। যদিও এটি শুধুই বিশ্বাসের ব্যাপার, কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বা প্রমাণ নেই।
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক বলছেন, কোনো কারণে গাছের মাথা ভেঙে গেলে সেখান থেকে একাধিক মাথা বের হতে পারে। এটি কোনো আধ্যাত্মিক ঘটনা নয়।
জনশ্রুতি রয়েছে, অনেক আগে এলাকাবাসী সাত মাথার খেজুরগাছে মধ্যরাতে সাদা পোশাকে এক দরবেশকে নামাজ পড়তে দেখেছেন।
সময়ের আবর্তনে সাত মাথার খেজুরগাছটি মারা গেছে। সেখানে এখন জঙ্গল সৃষ্টি হয়েছে। ভয়ে কেউ ওই জঙ্গল পরিষ্কার করেন না। দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন ওই জঙ্গলে গিয়ে ভিজে কাপড়ে সাতপাক দিয়ে মানত করে। রেখে যায় তেল, পানি। যা পরে ব্যবহারে মেলে মুক্তি- এমন বিশ্বাস রয়েছে তাদের।
মারা যাওয়া সাত মাথার গাছটি যে জমিতে ছিল ওই জমির অপরপ্রান্তে অনেক বছর পরে এসে অন্য একটি খেজুরগাছে দশ মাথার সৃষ্টি হয়েছে। এখন দশ মাথার গাছটিকে ঘিরে চলে আরাধনা।
জমির মালিক পশুপতি মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের ৫৭ শতক জমি ছিল। কয়েক বছর আগে বেচে দিছি। জমি-লাগোয়া এক শতক খাস জমিতে বনজঙ্গল হয়ে আছে। শুনিছি ওইখানে সাত মাথার একটা খেজুরগাছ ছিল। বহু বছর আগে গাছটি মারা গেছে। আমার বয়স ৬০-৬৫ বছর। ওই গাছ আমি দেখিনি। গাছ মরলিও সেই জমি আমরা চাষ করিনে। এখন সেখানে জঙ্গল।’
তিনি বলেন, ‘খেজুরগাছ যখন বেঁচে ছিল তখন থেকে মানুষ গাছতলায় এসে মানত করত। রোগবালাই সেরে গেলে খাসি বা মুরগি জবাই দিয়ে রান্না করে এলাকার পোলাপান ডেকে খাতি দিত। এখনো লোকজন ডেকে খাতি দেয়।’
পশুপতি আরও বলেন, ‘মরে যাওয়া খেজুরগাছটির অদূরে আমার জমির মধ্যি নয় মাথার একটি খেজুরগাছ আছে। ২০-২৫ বছর আগে চারা অবস্থায় তিন মৌসুম গাছে রস পাইছি। পরেরবার গাছ তোলাইছি (রস সংগ্রহের জন্য গাছ প্রস্তুত করা)। তখনো রস সংগ্রহ শুরু করিনি। একদিন কে বা কারা গাছটার আগা ভেঙে ফেলে। মাথার অল্পকিছু অংশ ছিল। তাতে আমি গোবর লেপে দিই। কিছুদিন পরে দেখি নতুন মাথা গজিয়ে বাঁকা হয়ে উঠতেছে। একে একে দশটা মাথা বের হয়েছে। এক মাথা মারা গেছে। এখন নয় মাথা আছে। সেই থেকে আর রস সংগ্রহ করিনে। গাছ রাইখে দিছি। মানুষজন এসে ওই গাছের আগায় তেল, পানি রেখে যায়। পরে এসে নিয়ে যায়। শুনি এতে নাকি উপকার হয়।’
মদনপুর গ্রামের বৃদ্ধ ওসমান গনি বলেন, ‘কারো বাচ্চা না হলি বা যেকোনো রোগ হলি আমাগের গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের লোকজন এখানে আসে। ভিজে কাপড়ে মহিলারা জঙ্গলের চারপাশে সাত পাক দিয়ে মানত করে। যে আইসে মানত করে তারটা পুরণ হয়।’
‘একবার মুক্তারপুর গ্রামের একজনের পেট ফুলিলো। ওষুধে সারিনি। তখন মরা গাছতলায় আইসে মানত করিল। পরে রোগ সারিল। কিন্তু মানত পুরণ না করায় আবারো ফোলা রোগ হইল।’
বৃদ্ধ আরও বলেন, ‘আমাগের বিশ্বাস হয়। কিন্তু মুসলমান পরিবার হওয়ায় আমরা কোনো সময় মানত করতি আসিনে।’
সালমা নামে এক নারী বলেন, ‘আগের সাত মাথা গাছ মরে যাওয়ায় হয়তো নয় মাথার খেজুরগাছটা হয়েছে। ভয়ে আমরা খেজুর গাছের শুকনো ডাল-পাতা কিছু পোড়াই না।’
‘মানুষ গাছের ডালে তেল-পানি রেখে যায়। পরে আইসে নিয়ে যায়। উপকার হয় বলে প্রায়ই মানুষ এখানে আসে। কেউ মুরগি এনে ছেড়ে দেয়। জঙ্গলে খাবার রেখে যায়। আবার অনেকে বাড়ি থেকে গোস্ত-ভাত রান্না করে এনে বাচ্চাদের ডেকে খেতে দেন। মানত করলে পূরণ হওয়ায় আমাগের বিশ্বাস খেজুরগাছে কোনো পীর ওলি আছে।’
অবশ্য মণিরামপুর সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুর রউফ মানুষের এই সব ধারণাকে ‘ভিত্তিহীন’ বলছেন। তিনি বলেন, ‘খেজুরগাছের একাধিক মাথা জন্মানো আধ্যাত্মিক কিছু না। কোনো কারণে গাছের মাথা ভেঙে গেলে, ভাঙা মাথা ভাগ হয়ে একাধিক মাথা জন্ম হতে পারে। খেজুরের এই গাছের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। এর সাথে রোগ-বালাই সারার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।’
স্থানীয় শিক্ষিত ব্যক্তিদের ভাষ্য, কেউ যদি বিশ্বাস নিয়ে কোনো কাজ করে, তাহলে তার মনে মানসিক প্রশান্তি আসতে পারে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

আরও পড়ুন