দুর্নীতির আখড়া চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর

আপডেট: 01:57:32 06/03/2021



img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে চুয়াডাঙ্গা পরিবার-পরিকল্পনা উপ-পরিচালকের নতুন কার্যালয় নির্মাণ কাজ। অথচ কর্মকর্তাদের সহায়তায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তুলে নিয়েছে বিলের সোয়া কোটি টাকা। এমনকী কাজ না করিয়ে ডে টু ডে প্রকল্পের ২০ লাখ টাকা ভাগভাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এ প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কুষ্টিয়া স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয় চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর স্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তর। এ অধিদপ্তরের অধীনে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে চার কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে চুয়াডাঙ্গা পরিবার পরিকল্পনা উপ-পরিচালকের নতুন কার্যালয় নির্মাণ কাজের অনুমোদন হয়। এরপর মাটি ভরাট ও চারদিকে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়। চারতলা ভবনের নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করতে ২০১৮ সালের ৮ মার্চ সিরাজগঞ্জ জেলার 'মেসার্স পিয়াস কনস্ট্রাকশন'কে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। সেই মোতাবেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, তারা শিডিউল টেম্পারিং করে নির্মাণ কাজে পাথরের বদলে ইটের খোয়া ব্যবহার শুরু করে। গোপনে এই খবর পেয়ে ঢাকা ও খুলনা থেকে তদন্ত দল এসে সরেজমিনে অভিযোগের সত্যতা পায়।
সূত্র আরো জানিয়েছে, পাথর আর ইটের খোয়ার পার্থক্য ১২৬ টাকা। এছাড়াও ওই কাজে আরো অসংগতির প্রমাণ পায় তদন্ত দল। এরপর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কয়েকজন ঠিকাদার জানান, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলার আওতাধীন কুষ্টিয়া স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে দিনাজপুর জেলায় কর্মরত) এএফএম আনিসুর রহমান ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী গণেশচন্দ্র সিংহ আর্থিক সুবিধা নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স পিয়াস কনস্ট্রাকশন এর পক্ষে শিডিউল টেম্পারিং করে দেন। শিডিউলে পাথরের বদলে ইটের খোয়া ব্যবহারের কথা লিখে দেন তারা। ওই শিডিউল ফটোকপি করে তা ব্যবহার করে নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করতে থাকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এই বিল্ডিংয়ের প্রায় সবকিছুই ত্রুটিপূর্ণ অবস্থায় নির্মাণ করা হয়েছে; যা তদন্ত দলের কাছে ধরা পড়ে।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে শিডিউল টেম্পারিংয়ের অভিযোগ অস্বীকার করছেন নির্বাহী প্রকৌশলী এএফএম আনিসুর রহমান ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী গণেশচন্দ্র সিংহ। তারা বলেন, ক্ষমতার কারণে অনেক সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর খবরদারি করা সম্ভব হয় না। সে কারণেই এই সমস্যাটি হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে সদ্য যোগদান করা সহকারী প্রকৌশলী হাসান আল মামুন জানান, সম্প্রতি একটি দল এসেছিল অর্ধনির্মিত ভবন পরিদর্শন করতে। তাতে বোঝা গেছে, খুব তাড়াতাড়ি ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হবে।
কুষ্টিয়া স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জলিলুর রহমান বলেন, এই কাজ শুরু হওয়ার বিষয়টি এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কোন দিন থেকে নির্মাণ কাজ শুরু হবে তা প্রধান দপ্তর থেকে লিখিতভাবে জানায়নি। সে কারণে কাজ শুরু এখনো অনিশ্চিত। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
এদিকে, চুয়াডাঙ্গার কয়েকজন ঠিকাদার প্রমাণসহ অভিযোগ করেছেন যে, গত ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ডে টু ডে প্রকল্পের কোনো কাজ না করেই ২০ লাখ টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়া হয়েছে। এই ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে কুষ্টিয়া নির্বাহী প্রকৌশলী ও চুয়াডাঙ্গার তৎকালীন উপ-সহকারী প্রকৌশলী গণেশচন্দ্র সিংহের মধ্যস্থতায়।
সূত্র জানায়, কুষ্টিয়া স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জলিলুর রহমান ২০ লাখ টাকার মধ্যে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলায় আট লাখ টাকা বরাদ্দ দেন এবং নিজে ১২ লাখ টাকা রেখে দেন। এই টাকা মূলত হাসপাতাল, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন স্থানে প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু চুয়াডাঙ্গা জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকে নিজস্ব কয়েকজন ঠিকাদারের প্যাড ব্যবহার করে বিলের টাকা উঠিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। উঠিয়ে নেওয়া বিলের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জনের দপ্তরে নতুন এসি সরবরাহের বিলও রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন এএসএম মারুফ হাসান বলেন, তার দপ্তরে কোনো নতুন এয়ারকন্ডিশনার লাগানো হয়নি। জেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয় থেকে বিলের টাকা উঠিয়ে নেওয়ার প্রমাণ দেখালে তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান।
এ প্রসঙ্গে উপ-সহকারী প্রকৌশলী গণেশচন্দ্র সিংহ বলেন, যে কোনো কারণে এটা একটা ভুল হয়েছিল। সিভিল সার্জন বলার পরে সেটা অন্যভাবে সমাধান করে দেওয়া হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সমাধানের কথা বলার পরও ওই দপ্তরে কোনো নতুন এয়ারকন্ডিশনার লাগানো হয়নি।
এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জলিলুর রহমান বলেন, কাজ না করে বিলের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ ঠিক নয়। বিলের টাকা উঠাতে হলে কাজ তো করতেই হবে। চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ না করে বিলের টাকা উঠিয়ে নেওয়ার প্রমাণের বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি বলেন, 'এটা কীভাবে সম্ভব বুঝতে পারছি না।'

আরও পড়ুন