তুরস্ক-সিরিয়া যুদ্ধ অনেকটাই অনিবার্য

আপডেট: 04:00:08 26/02/2020



img

রাহুল আনজুম

সিরিয়ার ইদলিব শহরের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে তা নিয়ে মস্কো ও আঙ্কারার মধ্যে কয়েক দফা আলোচনা নিষ্ফল হয়েছে। উভয় পক্ষের অনড় অবস্থান ইদলিবে যুদ্ধাবস্থা জিইয়ে রেখেছে। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে সিরীয় সেনাবাহিনী রুশ বিমানের সহায়তায় ১২ তুর্কি সেনাকে হত্যা করা থেকে এই হাঙ্গামার শুরু। হামলায় রুশ বিমানবাহিনীর অংশগ্রহণের ঘটনায় মস্কো-আঙ্কারার বন্ধুতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে মস্কো-আঙ্কারার জোটের এই বিবাদ পশ্চিমাদের খুশি করেছে। ওয়াশিংটন, ব্রাসেলস থেকে আঙ্কারার প্রতি সমর্থনের রব উঠেছে এবং হামলার জন্য আসাদ ও রাশিয়াকে দায়ী করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতাকাঠামো ইসরায়েলকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। তাই রাশিয়ার পক্ষে কোনোভাবেই ইসরায়েলকে পাশ কাটিয়ে কাজ করার সুযোগ নেই। গত মাসে পুতিনের ইসরায়েল সফরের সময়ে নেতানিয়াহু ইসরায়েলের নিরাপত্তার কথা ভেবে সিরিয়ায় আঙ্কারা-মস্কোর মৈত্রীর বিষয়টি পুতিনের কাছে তোলেন এবং এই মৈত্রীর ইতি টানতে পুতিনকে রাজি করাতে সমর্থ হন। সেই সূত্র ধরেই ইদলিবে এই হাঙ্গামার অবতারণা বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
আল জাজিরার সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি এরদোয়ান-ট্রাম্প ফোনালাপ হয়েছে। তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তে সম্ভাব্য সিরীয়-রুশ যৌথ হামলা মোকাবিলায় তুরস্কের পক্ষ থেকে আমেরিকার প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের অনুরোধ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি। তবে ইদলিবে তুর্কি সেনাদের ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে অবরোধের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। আপাতত আঙ্কারা ওয়াশিংটনের এই অবস্থানে সন্তুষ্ট। কারণ, আঙ্কারা বড় দুই শক্তির কোনো এক দলের দিকে পুরোপুরি না ঝুঁকে ভারসাম্য রক্ষা করে নিজস্ব শক্তি বাড়াতে চায়। ভারসাম্য রক্ষার এই নীতি আঙ্কারাকে অনেক সময় সুবিধা দিলেও বন্ধুহীন করার বেলায়ও ইতিমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সিরিয়ার ইদলিব শহর আঙ্কারা-মস্কো এবং আসাদপন্থী ও আসাদবিরোধী বিদ্রোহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। মূলত তিনটি বিষয়ের জন্য আঙ্কারার কাছে ইদলিবের গুরুত্ব অসীম। প্রথমত, ইদলিবেই রয়েছে আসাদবিরোধী বিদ্রোহীদের সর্বশেষ ঘাঁটি, যারা তথাকথিত আরব বসন্তের শুরু থেকেই আসাদ পরিবারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলছে। দ্বিতীয়ত, ইদলিবেই রয়েছে সিরিয়ার সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার নানান প্রান্তের মানুষ জীবনের তাগিদে জড়ো হয়েছে ইদলিবে। তাই ইদলিব আসাদের দখলে গেলে জাতিসংঘের তথ্যানুসারে প্রায় সাত লাখ শরণার্থীকে জায়গা দিতে হবে তুরস্ককে। ইতিমধ্যেই তুরস্কে অবস্থানরত ৪০ লাখ সিরীয় শরণার্থীর সঙ্গে আরো সাত লাখ শরণার্থী যোগ হলে তার ভরণপোষণের ক্ষমতা আদতে আঙ্কারার নাগালের বাইরে। তৃতীয়ত, ইদলিব আসাদের করতলগত হলে তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্তবর্তী অঞ্চল পুনরায় দখল করার জন্য হামলা চালাবে আসাদ বাহিনী। তুর্কি সেনাবাহিনী এই অঞ্চল আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসীঘোষিত পিকেকের কাছ থেকে দখল করেছিল। পিকেকে ৪০ বছর ধরে তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে এবং আদর্শিক বোঝাপড়ার জায়গা বদল করে মার্কিনদের সহযোগী হয়েছে।
মার্কিনদের বন্ধুত্ব বিশ্বদরবারে পিকেকে-কে বিপ্লবীর খেতাব এনে দিলেও কুর্দিদের একটি অংশ এই খেতাব মেনে নেয়নি। রাশিয়ার কল্যাণে আসাদ ও পিকেকে অতীতের ঝামেলা মিটিয়ে তুরস্কের বিরুদ্ধে এক হয়েছে। তাই আঙ্কারার পক্ষ থেকে হিসাব পরিষ্কার। তুরস্ক সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আসাদের কর্তৃত্বের অর্থ পিকেকের বিজয়োল্লাস। তাই ইদলিব ধরে রাখার মধ্যেই আঙ্কারা নিজ সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা দেখছে।
তবে আসাদের ইদলিব দখলে রাশিয়ার জন্য এক ঢিলে দুই পাখি শিকার হবে। প্রথমত, বিদ্রোহীদের নিধনের মধ্য দিয়ে সিরিয়ায় আসাদ পরিবারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে, যে কর্তৃত্ব যুদ্ধ জয়ের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আসাদ মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারে ব্যয় করবেন। দ্বিতীয়ত, আঙ্কারাকে সিরিয়া থেকে বিদায় করা। কারণ তুরস্ক ন্যাটো সদস্য এবং সময়ের পরিবর্তনে আঙ্কারার ব্রাসেলস যাত্রা যে অনিবার্য, তা রাশিয়া ভালোভাবেই অবগত। তাই রাশিয়া সিরিয়ায় তুরস্ককে শক্তিশালী হতে দিতে নারাজ। ইদলিবের পাশাপাশি আসাদ এম-৪ এবং এম-৫ মহাসড়কের দখলও ফিরে পেতে চান। কারণ, এই দুইটি মহাসড়ক ঘিরেই সিরিয়ার বাণিজ্যের প্রায় ৬০ ভাগ সম্পন্ন হয়। এই সড়ক দামেস্কের সঙ্গে আলেপ্পোকে যুক্ত করেছে। তবে আসাদকে হামলার এই উসকানি দিয়ে মস্কো নিজেদের করা চুক্তিকেই ভেঙে ফেলল।
ওয়াশিংটন যখন সিরিয়া আর ইরাক যুদ্ধকে অমরত্ব দিয়ে চলছিল, তখন আঙ্কারা ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধ থামিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ মীমাংসার আবেদন নিয়ে রাশিয়ার দ্বারস্থ হয়। কারণ ইরাক আর সিরিয়ার যুদ্ধে তুরস্কের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তুরস্কের আবেদনে সাড়া দিয়ে ইরান ও রাশিয়া তুরস্কের সঙ্গে একযোগে সিরিয়া যুদ্ধের সমাধান খুঁজে বের করে। এবং পশ্চিমাদের বাইরে গিয়ে ২০১৭ সালের মে মাসে চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা আস্তানা চুক্তি নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে বহুবার এই চুক্তির আওতায় রাশিয়া, ইরান আর তুরস্ক মিলিত হয়েছে সোচি, জেনেভা আর ইস্তাম্বুলে। চুক্তির ধারা অনুযায়ী রাশিয়া, ইরান আর তুরস্ক মিলে সিরিয়ায় ‘স্ট্যাটাস কু’ রক্ষা করে ‘সংঘর্ষবিহীন অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠা করবে। সেই মোতাবেক শর্ত মেনে রাশিয়ার পাশাপাশি তুরস্ক ইদলিবে বিদ্রোহী আর সরকারি বাহিনীকে সংঘর্ষ থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে ১২টি ছোট ছোট সেনা পোস্ট স্থাপন করে। পশ্চিমাদের বিশেষ করে মার্কিনদের বাইরে রেখে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধকে থামাতে এটাই ছিল বড় ধরনের কোনো প্রচেষ্টা। যে প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার উপস্থিতি রাজনৈতিকভাবে বৈধতা পেয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিনবিরোধীরা তুরস্ক-রাশিয়া-ইরানের জোটের মধ্যে নতুন মার্কিনবিরোধী জোটের আশার আলো পেয়েছিল।
নতুন এই জোটের অবয়ব ধীরে ধীরে পরিষ্কার আকার ধারণ করে বিস্তৃত হয়েছিল লিবিয়া পর্যন্ত। কিন্তু কাশেম সোলাইমানির মৃত্যু আর মার্কিনদের ফিলিস্তিনকে কেন্দ্র করে শতবর্ষের চুক্তি ঘোষণা করার পর রাশিয়া আগের চুক্তিতে অটল না থেকে সিরিয়ার ভূখণ্ড থেকে তুর্কি সেনাদের প্রত্যাহার চাইছে। ইদলিব থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে আঙ্কারা অস্বীকৃতি জানালে রাশিয়ার সহযোগিতায় সিরীয় সেনারা তুর্কি সেনাদের ওপর আক্রমণ করা শুরু করে। তবে রাজনৈতিক সমালোচকেরা বলছেন অন্য কথা। পুতিন লিবিয়ায় হাফতারের বৈধতায় আঙ্কারার সম্মতি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে এবং ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার জন্য ইদলিবে আক্রমণ শুরু করে। আঙ্কারা শুরু থেকেই হাফতারের বৈধতার বিপক্ষে।
আস্তানা চুক্তি বাতিলের মধ্য দিয়ে রাশিয়া নিজেদের কল্পিত মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র অঙ্কনে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কোরীয় উপদ্বীপে সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ভুল করেছিল, সেই একই ভুল হালের নব্য জার ভ্লাদিমির পুতিন করতে চান না। পশ্চিমাদের মতো করেই বর্তমান সিরিয়া ভেঙে নতুন দুইটি রাষ্ট্র গঠনে মস্কোর আপত্তি নেই। ইরাক, সিরিয়াতে নতুন রাষ্ট্রের ওপর ভর করেই পুতিন মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ প্রভাব এবং স্বার্থ রক্ষা করতে চান। সেই স্বার্থ রক্ষায় আগত দিনগুলোতে তুরস্ক-সিরিয়া যুদ্ধ অনেকটাই অনিবার্য।
[লেখক : তুরস্কপ্রবাসী লেখক। প্রথম আলো থেকে।]