ঝড়ের পর আসছে ক্ষয়ক্ষতির হিসেব

আপডেট: 02:08:39 10/11/2019



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে উপড়ে গেছে বহু গাছ, বিধ্বস্ত হয়েছে কাঁচা ঘরবাড়ি। ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলের ক্ষেত। অনেক জায়গায় পোল ভেঙে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রন্ত হয়েছে।
দমকা হাওয়ায় গাছচাপা পড়ে খুলনা ও পটুয়াখালীতে তিনজনের প্রাণ গেছে। এছাড়া বরগুনা সদর উপজেলায় একটি আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।
ঘণ্টায় ১১৫ কিলোমিটার থেকে ১২৫ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে বাংলাদেশ সময় শনিবার রাত নয়টায় পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগর দ্বীপ উপকূলে আঘাত হানে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল।
পুরোপুরি স্থলভাগে উঠে আসার পর সুন্দরবনের ভারতীয় অংশের কাছ দিয়ে এ ঝড় পশ্চিমবঙ্গ উপকূল অতিক্রম করে। তারপর রোববার ভোর পাঁচটার দিকে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছায়। বৃষ্টি ঝরিয়ে শক্তি হারিয়ে সকালে বুলবুল পরিণত হয় গভীর স্থল নিম্নচাপে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মহসিন জানিয়েছেন, বিভিন্ন জেলা থেকে আসা তথ্য সমন্বয় করে দুপুরের দিকে তারা ক্ষয়ক্ষতির একটি প্রাথমিক চিত্র দিতে পারবেন।
ঘূর্ণিঝড়ের কারণে শনিবার রাত পর্যন্ত যে ২১ লাখ মানুষকে উপকূলী অঞ্চলের পাঁচ হাজার ৫৮৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছিল, তারা ধীরে ধীরে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন বলে অতিরিক্ত সচিব জানিয়েছেন। 

সাতক্ষীরা
ঘূর্ণিঝড় বুলবুল উপকূল অতিক্রম করার পর সাতক্ষীরায় ঝড়ের দাপট শুরু হয় ভোর পৌনে চারটার দিকে। প্রবল ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে শুরু হয় ভারী বর্ষণ।
সাতক্ষীরা জেলা আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জুলফিকার আলী রিপন বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল সাতক্ষীরার উপকূলীয় এলাকা অতিক্রম করার সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮১ কিলোমিটার।
জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, ঝড়ে শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এসব অঞ্চলে মাছের ঘের ও ফসলি জমির পাশাপাশি রাস্তঘাটেরও ক্ষতি হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে জেলায় ২৫ হাজার হেক্টর আমন ধান, এক হাজার ২০০ হেক্টর জমির সবজি, ৫০০ হেক্টর জমির সর্ষে, ২০০ হেক্টরের কুল ও ১২০ হেক্টর জমির পান নষ্ট হওয়ার তথ্য পাওয়ার কথা বলেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক অরবিন্দ বিশ্বাস।
এ জেলায় মোট এক লাখ ৮৫ হাজার মানুষকে ঝড়ের আগে আশ্রয়কেন্দ্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। বিপদ কেটে যাওয়ার পর তাদের অনেকে ফিরে যেতে শুরু করেছেন। পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও সেনাবাহিনী উদ্ধার কাজ শুরু করেছে বলে জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন।
উপকূলীয় বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ভবতোষকুমার মণ্ডল বলেন, “ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে আমার ইউনিয়ন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। বাতাসের তীব্রতা এত বেশি ছিলে যে অধিকাংশ গাছ উপড়ে গেছে। কাচাঁ ঘর সব নষ্ট হয়ে গেছে, ঘরের টিন ও বেড়া উড়ে গেছে। চিংড়ি ঘের ও ধানের জমি পানিতে একাকার হয়ে গেছে।”
ওই এলাকার কিছু বেঁড়িবাধ ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, “নদীতে পানি বাড়ায় সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা বাঁধ মেরামত করার চেষ্টা করছি। এখন জোয়ার চলছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে।”
শ্যামনগরের উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামরুজ্জামান বলেন, তার এলাকার অধিকাংশ কাঁচা ঘর ঝড়ে নষ্ট হয়েছে। মাছের ঘের ও ধানের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। গাছ ভেঙে পড়ে কিছু এলাকায় সড়ক বিচ্ছিন্ন রয়েছে। গাছ সরিয়ে যাতায়াতের ব্যবস্থা হলেই উদ্ধার কাজ শুরু হবে।
গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গাজী মাসুদুল আলম বলেন, “আমার ইউনিয়নের চার হাজার ঘর ভেঙে গেছে। মাছের ঘের তলিয়ে গেছে। অনেক গাছ উপড়ে গেছে।”
রাতে ঝড়ের মধ্যে গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামে আবুল কালাম নামে ৪০ বছর বয়সী এক মাছচাষি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, “তার মৃত্যুর সাথে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কোনো সম্পর্ক নেই।”
রাস্তার ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে আশাশুনি ও কালিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও। শ্যামনগরের খানপুর, চণ্ডিপুর, সদর, উত্তর বাঁধঘাটা, ইসমাইলপুর, হাইবাতপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা গাছ সরাতে কাজ করছেন। 

পটুয়াখালী
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে পটুয়াখালীতে দমকা হওয়ায় গাছ উপড়ে বসতঘরের ওপর পড়ে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার রাত রাত সাড়ে তিনটার দিকে মির্জাগঞ্জ উপজেলার মাধবখালী ইউনিয়নের উত্তর রামপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সরোয়ার হোসেন জানান।
নিহত হামেদ ফকিরের বয়স ৬৫ বছর। পেশায় তিনি ছিলেন একজন মৎস্যজীবী।
স্থানীয়দের বরাত দিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, রাতে দমকা হাওয়ার শুরু হলে একটি রেইন্ট্রি ও একটি চাম্বলগাছ উপড়ে ঘরের ওপর পড়লে চাপা পড়েন ওই বৃদ্ধ। তাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে রাত থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে পটুয়াখালীতে, সেই সঙ্গে দমকা বাতাস। নিরাপত্তার কারণে উপকূলীয় কয়েকটি উপজেলায় বিদ্যুৎ বন্ধ রাখা হয়েছে বলে পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

লক্ষ্মীপুর
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলির আঘাতে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার মেঘনা নদীর তীরে ২৫টি ঘর বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে উপজেলা র্নিবাহী কর্মর্কতা আব্দুল মমিন জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, রোববার সকাল থেকে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছ্ সেই সঙ্গে বইছে দমকা হাওয়া। কিছু জায়গায় বৃষ্টিতে পানি জমে যাওয়ার এবং গাছ ভেঙে পড়ার  খবর খবর পাওয়া গেছে।
সূত্র : বিডিনিউজ