জলাবদ্ধতায় নাকাল সাতক্ষীরার কৃষক

আপডেট: 08:01:33 13/01/2021



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : জলাবদ্ধতা কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরার জনজীবনে। জেলার অভ্যন্তরীণ নদী ও খালগুলো পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা হারিয়েছে। এতে সাতক্ষীরার কয়েক লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে শুধু সাতক্ষীরা জেলার ৪৬ হাজার ৮০৪ হেক্টর নিচু জমিতে বোরোর আবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেলার অধিকাংশ বিলের নিচু জমি পানিতে তলিয়ে আছে। পানি সরানোর জন্য কোথাও কোথাও সেচযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরায় মোট এক লাখ ৭৭ হাজার ৮১৪ হেক্টর জমির মধ্যে আবাদি জমি আছে এক লাখ ৩১ হাজার ৭৮৮ হেক্টর। এর মধ্যে স্থায়ী পতিত জমি রয়েছে ৪৫ হাজার ১১০ হেক্টর। এর বাইরে চাষযোগ্য জমির মধ্যে মাঝারি ও নিচু জমি ৩৬ হাজার ৮০৪ হেক্টর। এসব জমির বেশিরভাগ অংশ এখনো পানিতে নিমজ্জিত। ফলে জলাবদ্ধতায় রূপ নিয়েছে জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল।
কৃষকরা জানান, খাল, বিল ও নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ করার কারণে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। রবি মৌসুমে ধান, আলু, কপি, পেঁয়াজ, বেগুন, টমেটো, গম, খেসারিসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। পানির কারণে এখন তারা তা করতে পারছেন না।
সাতক্ষীরার সর্ববৃহৎ বিল দাঁতভাঙ্গা, মালিনি ও পদ্মবিলসহ ১৩টি বিল এখনো ফসলশূন্য। এসব বিল ও গ্রামের পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ সীমান্তের ইছামতি নদীর শাখরা স্লুইস গেট। ওই গেট দিয়ে পানি তো সরছেই না বরং গেটের তল দিয়ে জোয়ারের পানি উল্টো এলাকায় ঢোকে। এই গেটটি সংস্কার করা গেলে এলাকা বোরো চাষের উপযোগী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পাটকেলঘাটা আমিরুন্নেছা হাইস্কুলের শিক্ষক মুজিবুর রহমান জানান, তালার কপোতাক্ষ নদ-সংলগ্ন বিলগুলো এখনো পানির নিচে। ফলে পাটকেলঘাটা, শাকদহা, ইসলামকাটিসহ জেলার প্রত্যন্ত নিচু এলাকায় বোরো আবাদ অনিশ্চিত।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ২৪ হাজার ৫০০ হেক্টর, কলারোয়ায় ১৪ হাজার, তালায় ২০ হাজার, দেবহাটায় ছয় হাজার, কালিগঞ্জে পাঁচ হাজার ৫০০ হেক্টর, আশাশুনিতে আট হাজার এবং শ্যামনগরে দুই হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। গত বছর জেলায় আবাদ হয়েছিল ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে। জেলায় বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন লাখ ৫১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন।
কৃষি বিভাগের হিসাব মতে, জেলায় তিন লাখ ৮১ হাজার ৭৩০ হেক্টর ফসলি জমি আছে। এসব জমিতে তিন লাখ ৫৮ হাজার ৫৫০টি পরিবার কৃষি কাজ করে। এরমধ্যে ভূমিহীন চাষি রয়েছেন ৬৭ হাজার ২৩০ জন, প্রান্তিক চাষি এক লাখ ৩১ হাজার ৩৭, ক্ষুদ্র চাষি এক লাখ ৯৫৭, মাঝারি চাষি ৪৪ হাজার ৮৪২ এবং বড় চাষি রয়েছেন ১৪ হাজার ৪৮৪ জন। মোট ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ২০০ জন সরাসরি কৃষির সাথে জড়িত। এসব কৃষকের মধ্যে বর্তমান বোরো চাষের সাথে প্রায় দশ লাখ মানুষ জড়িত।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না। তবে পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। যেমন- বৈরী জলবায়ুর (লবণাক্ততা, বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতা ও অধিক তাপসহিষ্ণু) সাথে খাপ খাওয়ানোর মতো উচ্চফলনশীল ফসলের নতুন নতুন জাতের উদ্ভাবন ও ব্যবহার এবং এগুলোর চাষাবাদ বাড়াতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। নতুন শস্যপর্যায় ও অভিযোজন কৌশলের ওপর ব্যাপক গবেষণা জোরদার করা হয়েছে। কৃষিতে তথ্যপ্রযুক্তি, স্যাটেলাইট, মলিকুলার ও বায়োটেকনোলজি প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। শস্যবিমা চালু করার কথা ভাবছে সরকার।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নূরুল ইসলাম বলেন, জেলায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি জমিতে বোরোর আবাদ হতে চলেছে। প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও জেলার চাষিরা ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ করে রের্কড সৃষ্টি করবে। জলাবদ্ধতা না থাকলে বোরোর আবাদ আরো বাড়তো বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরো জানান, জেলা খামারবাড়ির দরজা কৃষকদের জন্য খোলা। কৃষকদের সার্বিক খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। তাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন