চৌগাছায় পানির নিচে ধান, কৃষকের কান্না

আপডেট: 09:33:18 08/05/2020



img

রহিদুল ইসলাম খান, চৌগাছা (যশোর) : চৌগাছায় বৃষ্টি ও কৃষকের বোবা কান্নার অশ্রুতে ভিজে একাকার সোনালি ধানের ক্ষেত। গত কয়েকদিনের হালকা, মাঝারি ও ভারি বৃষ্টিপাতে কয়েক হাজার হেক্টর ধানের জমি তলিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।
করোনার থাবায় কার্যত বিশ্বজুড়ে চলছে লকডাউন। থেমে গেছে বিশ্ব অর্থনীতির চাকা। স্থবির হয়ে পড়েছে কর্মচঞ্চল মানুষের জীবনধারা। বন্ধ হয়ে গেছে সব ব্যবসা-বাণিজ্য। সকল ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে কৃষক ফসল ফলাতে পরিশ্রম করেছেন দিনরাত। কিন্তু বৃষ্টির পানিতে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে হাজার হাজার কৃষকের স্বপ্ন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে পৌর এলাকাসহ ১১টি ইউনিয়নে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১৭ হাজার ৮২০ হেক্টর জমিতে। যার সম্ভাব্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক লাখ ছয় হাজার ৯২০ মেট্রিক টন। কিন্তু ফলন ভালো শেষ দিকে এসে ঝড়-বৃষ্টির কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষি অফিস।
কয়েকদিনের অতিবৃষ্টি‌তে ধান‌ক্ষেত ত‌লি‌য়ে যাওয়ায় দিশেহারা হ‌য়ে প‌ড়ে‌ছেন উপজেলার কৃষকরা। একদিকে, করোনাভাইরাস অন্যদিকে বাজ পড়ার আতঙ্কে ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। মাঠের পাকা ধান কেটে বাড়ি আনতে তিনগুণ পরিশ্রম করতে হচ্ছে কৃষককে। ফলে চোখের সামনেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কষ্ট করে তৈরি করা হাজার হাজার একর জমির ধান। ফলে কৃষকের বুকে জমছে চাপা আর্তনাদ। চোখে-মুখে ফসল হারানোর শঙ্কার ছাপ।
বৃহস্পতিবার রাতের ঝড়-বৃষ্টিতে কিছু কিছু এলাকায় ধানগাছ নুয়ে পড়েছে। আবার কোথাও ভেসে গেছে কাটা ধান, ঝড়ের আঘাতে ঝরে গেছে ধান, কোথাও ভারি বৃষ্টিতে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে পাকা ধান।
শুক্রবার ধানক্ষেতের কাটা ভেজা ধানের শীষ জড়িয়ে কৃষকদের কাঁদতে দেখা গেছে উপজেলার চাঁদপাড়া গ্রামের মাঠে। কথা হয়, চাষি হোসেন কারিগর, আবু সালাম, রিজাউল, জাকির হোসেনসহ কয়েকজনের সঙ্গে। তারা জানান, উৎপাদন খরচ বাদে বৃষ্টির কারণে এক বিঘা জমির ধান ঘরে তুলতে অতিরিক্ত ৪-৫ হাজার টাকা খরচ হবে। মণপ্রতি এক হাজার টাকার ওপরে ধান বিক্রি করতে না পারলে কৃষকের লোকসান হবে বলে জানান তারা। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য দামে ধান কেনার দাবিও করেন তারা।
ধা‌নের অবস্থা জান‌তে চাই‌লে উপ‌জেলার সিংহঝু‌লি গ্রা‌মের সা‌বের আলী সরদার, জে‌হের আলী সরদার, মাওলানা আব্দুল গফুর, ট‌নিরাজ, সাগর খান, সাইফুল ইসলাম প্রমুখ কৃষ‌ক ব‌লেন, মা‌ঠে গি‌য়ে ধা‌নের অবস্থা দেখ‌লে দু‌চোখ দি‌য়ে পা‌নি আস‌ছে। পা‌নির ওপর থে‌কে ধান কে‌টে নি‌য়ে আসা যা‌বে। কিন্তু সে‌ক্ষে‌ত্রে গো-খা‌দ্যের চরম সংকট দেখা দে‌বে।
কৃষক সামছুল হুদা দফাদার, আব্দুল আজিজ বাদল, স‌রোয়ার হো‌সেন দফাদার প্রমুখ ব‌লেন, হা‌রভেস্টার দি‌য়ে ধান কে‌টে নেওয়া যা‌চ্ছে। কিন্তু এতো ধান রো‌দে শুকা‌নোর জায়গা কোথায়?
উপ‌জেলার সবচেয়ে বড় ধানচাষি হুদাফ‌তেপুর গ্রা‌মের মাওলানা আলী আকবর ব‌লেন, 'ধান চা‌ষে ক্রমাগত লোকসান গুন‌তে গুন‌তে গত বছর ২০ বিঘা জ‌মি‌তে মা‌ছের ঘের ক‌রে‌ছি। এরপর এ বছর যে ধান চাষ ক‌রে‌ছি, তা পা‌নি‌তে হাবুডুবু খা‌চ্ছে। পা‌চ্ছি না শ্র‌মিক। তারপর প্র‌তি‌দিন হ‌চ্ছে বৃ‌ষ্টি। সব মি‌লি‌য়ে না‌জেহাল অবস্থায় আ‌ছি।'
চৌগাছা প্রেসক্লা‌বের সা‌বেক সভাপ‌তি অধ্যক্ষ আবু জাফর ব‌লেন, 'বা‌ড়ি‌তে দুটি গাভি পালন ক‌রি। নি‌জে‌রা খাওয়ার জন্য তিন বিঘা জ‌মি‌তে ধান চাষ ক‌রি। তা এবার যা অবস্থা, তা‌তে বিঘাপ্র‌তি ৬-৭ হাজার টাকা লোকসান গুন‌তে হ‌বে।'
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রইচ উদ্দীন বলেন, 'আমরা কৃষকদের আগে থেকেই আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। উপজেলার বেশির ভাগ কৃষকই পশু খাদ্যের জন্য পাকা ধানের শুকনো বিচালিসহ ধান সংগ্রহ করে থাকেন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এবছর বিচালি বাদেই ধান কেটে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।'

আরও পড়ুন