গাছ চাপা পড়ে এক গ্রামেই পাঁচজনের মৃত্যু

আপডেট: 05:26:24 22/05/2020



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে গোটা মণিরামপুর। বুধবার সন্ধ্যা থেকে রাতভর চলা তাণ্ডবে উপজেলাজুড়ে ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট, সবজিক্ষেত, গাছপালা, বিদ্যুৎ সংযোগসহ আমের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে, আম্পানে ঘরের ওপর গাছ পড়ে উপজেলার মশ্মিমনগরের পারখাজুরা গ্রামে বৃদ্ধ দম্পতি, বাবা-ছেলেসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে নিহতদের বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সমবেদনা জানান উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নাজমা খানম।
নিহতরা হলেন, ওই গ্রামের ঋষিপাড়ার খোকন দাস (৭০) ও তার স্ত্রী বিজন দাসী (৬০), দফাদারপাড়ার ওয়াজেদ আলী (৫০) ও তার ছেলে ইছা (১৫) এবং একই পাড়ার মৃত জবেদ আলীর স্ত্রী আছিয়া বেগম (৭০)।
রাজগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের এসআই ফতেউর জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবের সময় নিহতরা সবাই ঘরেই ছিলেন। রাতের কোনো একসময় তাদের ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ে। তখন চাপা পড়ে পারখাজুরা গ্রামে পৃথক তিন পরিবারে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
এসআই ফতেউর বলেন, ‘বৃহস্পতিবার দুপুরে খবর পেয়ে আমরা এলাকায় যাই। ততক্ষণে নিহতদের তিনজনের দাফন শেষ হয়েছে। বাকি দুইজনকে শ্মশানে সৎকারের কাজ চলছিল।’
মণিরামপুর থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই দেবাশীষ গাছ চাপা পড়ে পাঁচজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, এই ঘটনায় থানায় ডায়রি করা হয়েছে।
আম্পানের প্রভাবে মঙ্গলবার রাত থেকে মণিরামপুরে থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হয়। এরপর বুধবার সন্ধ্যা থেকে তাণ্ডব শুরু হয়। বৃষ্টির সঙ্গে থেমে থেমে প্রবল বেগে ঝড় বইতে থাকে ভোর পর্যন্ত। এতে উপজেলার প্রতিটি অঞ্চলে কাঁচা ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে। উড়ে গেছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট, স্কুল, মাদরাসা ও কলেজের চালের টিন। বড় বড় গাছ উপড়ে পড়েছে বসতঘরসহ সড়কের ওপর। ফলে রাতেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা। স্থানীয়দের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বৃহস্পতিবার সকাল থেকে গাছ কেটে রাস্তায় চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছেন।
এছাড়া বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে ও তার ছিড়ে পড়ায় বুধবার রাত থেকে বন্ধ রয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ।
যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর সদর দপ্তরের (মণিরামপুর) এজিএম (অপারেশন ও মেইন্টেনেন্স) মো. শফিক বলেন, আম্পানে মণিরামপুরে ২৮২টি বিদ্যুতের পোল ভেঙে পড়েছে। ৩১টি স্পটে মেইন সংযোগের তারের ওপর গাছ ভেঙে পড়েছে। ঠিকাদারসহ আমাদের ৩৫০ জন কর্মী কাজ করছেন। ঈদের আগে বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক করতে উপরের নির্দেশনা রয়েছে।’
বৃহস্পতিবার সকাল থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ শরিফী ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তবে আম্পানের প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ণয় করা যায়নি।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, আম্পানে ৩৬০ হেক্টর জমির পেঁপে, ১২৪ হেক্টর জমির কলা, ১১০ হেক্টর জমির আম এবং ১৫২ হেক্টর জমির তিলের ক্ষতি হয়েছে।
উপজেলার শ্যামকুড় ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান মনি বলেন, ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা তিনি ঘুরেছেন। সাইক্লোনে কাঁচা ও টিনের ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
হরিদাসকাঠি ইউপি চেয়ারম্যান বিপদভঞ্জন পাড়ে বলেন, ‘আম্পানে আমার ঘরের ওপর জামগাছ উপড়ে পড়েছে। এছাড়া ইউনিয়নের কাঁচা ও টিনের বহু ঘরবাড়ি ভেঙে পড়েছে। গাছপালা ভেঙে রাস্তা আটকে থাকায় এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় এখনো ক্ষয়ক্ষতি নিরুপন করা যায়নি।’
নেহালপুর ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুস সাদৎ বলেন, ঝড়ে বড় বড় অনেক গাছ ভেঙে পড়েছে। এছাড়া কাঁচা ঘরবাড়ি যে কত ভেঙেছে তার কোনো হিসেব নেই।
মণিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হীরককুমার সরকার বলেন, ‘সকালে পৌর এলাকার কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেত পরিদর্শন করেছি। ঝড়ে পেঁপে ও কলাগাছ ভেঙে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করতে কাজ করছেন।’
মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ শরিফী বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে গাছ পড়ে উপজেলার প্রতিটি রাস্তা আটকা গেছে। অনেকের চালের টিন উড়ে গেছে। আবার দুর্বল ঘর পড়ে গেছে অনেক। মোবাইল ফোনের সংযোগ না থাকায় সব এলাকা থেকে তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনই নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে না।
‘ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বাররা তথ্য নিচ্ছেন। আশা করি, দ্রুত সব তথ্য পেয়ে যাব। ঘর ভেঙে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে,’ বলছিলেন ইউএনও শরিফী।

আরও পড়ুন