গাঁওঘরার ভোর আর সন্ধ্যা মুখরিত পাখির কলরবে

আপডেট: 08:31:54 02/12/2020



img
img
img

স্টাফ রিপোর্টার : ‘গাঁওঘরা’ যশোরের এই ছোট্ট গ্রামটি পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়। এখানে স্থায়ীভাবে বাসা করে ডিম পাড়ছে, ছানা,ফোটাচ্ছে বিপন্ন প্রজাতির শত শত পাখি। যার মধ্যে রয়েছে শামুকখোল, পানকৌড়ি ও কয়েক প্রজাতির বক।  গ্রামের পূর্বপাড়ার দুটি বাগান এদের কলোনি।  বড় বড় তেঁতুল, নিম, মেহগনি, রেইনট্রির ডালে ডালে এদের বাসা।
খুব ভোরে খাবারের সন্ধানে এরা উড়ে যায় আশপাশের জলাশয়ে। সন্ধ্যায় ফিরে আসে বাসায়। এরা ছাড়াও গ্রামজুড়ে গাছগাছালি ও বাঁশঝাড়ে বসবাস করে হাজারে হাজার শালিক, ঘুঘু, দোয়েল, চড়ুই, ফিঙে, মাছরাঙা, কানাকুয়োসহ নানা প্রজাতির পাখি।
গুলতি দিয়ে পাখি শিকার করা দুষ্টু বালক কিংবা ফাঁদে পাখি শিকারে অভ্যস্তরাও এখন এগিয়ে এসেছে পাখি রক্ষায়। গ্রামবাসীও উপভোগ করে পাখিদের চলাচল!
‘ইচ্ছেঘুড়ি ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠনের সদস্যদের প্রচেষ্টা, মানুষের সচেতনতা এবং ধর্মীয় নেতাদের সহযোগিতায় নির্ভয়ে রয়েছে পাখিদের চলাচল।
যশোর শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে ছোট্ট শান্ত গ্রাম ‘গাঁওঘরা’। এই গ্রামের ইউনুস আলী মোল্লা ও মুক্তার আলী মোল্লার বাগানে বড় বড় গাছের ডালে বড় জাতের পাখির বাসা। পশ্চিমাকাশে সূর্য ঢলে পড়লে ধীরে ধীরে ফিরতে শুরু করে পাখিরা।  
বাগানলাগায়ো বাড়ির গৃহবধূ কল্পনা আক্তার বলেন, ‘এসব পাখি খুব সুন্দর, মাথার উপর দিয়ে চক্কর দেয়। ডালে বসে। খুব ভালো লাগে।  বাচ্চাদের পাখি দেখাই। ওরাও খুশি হয়। এসব পাখি এখন এখানেই থাকে। কয়েক ছাপ্পা বাচ্চাও ফুটিয়েছে।’
ফাঁদ পেতে পাখি শিকারে গ্রামে একসময়ের খ্যাতিমান সজীব হোসেন বলেন, ‘আমার ফাঁদে পাখি মিস হতো না। ঘুঘু, বকসহ কত পাখি শিকার করেছি একসময়। তখন বুঝতাম না, এখন বুঝি। আবার মসজিদের ইমাম সাহেব জুম্মার নামাজে পাখি থাকার উপকারিতা বলেছেন। কেউ যদি শিকার করতে আসে তাকে বুঝাই, বাধা দিই।’
স্থানীয় মসজিদের ইমাম হাফেজ আব্দুর রাজ্জাক বললেন,‘পাখি আমাদের বিভিন্নভাবে উপকার করে। গ্রামের ছেলেরা পাখি রক্ষার অনুরোধ নিয়ে আমার কাছে আসে। তখন আমি জুম্মার নামাজের খুৎবায় পরিবেশ রক্ষায় পাখি থাকার উপকারিতা বর্ণনা করি। পাখি রক্ষায় সকলকে এগিয়ে আসার অনুরোধ করি। এরপর গ্রামের সবাই পাখি রক্ষায় এগিয়ে আসে।’
ইচ্ছেঘুড়ি ফাউন্ডেশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মোস্তাকিম আহসানুল বলেন, ‘আগে শুধু কয়েকটা ছোট বক থাকতো এই বাগানে। তখন আমাদের এখানে শিকারিদেরও উৎপাত ছিল। গ্রামের কয়েকজন ফাঁদ পেতে কিছু পাখি শিকার করতো। ‘দুষ্টু’ ছেলেরা গুলতি দিয়েও পাখি মারতো। গ্রামে পাখির সংখ্যা খুব কমে গিয়েছিল। জাতীয় পাখি দোয়েলের মতো কিছু পাখির দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না। এমন অবস্থায় পত্রিকায় বিভিন্ন পাখি বিলুপ্তির খবর পড়ে আমাদের পাখি রক্ষার ইচ্ছা জাগে। ২০১৬ সালে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য পাখি হত্যা বন্ধে আমরা ‘ইচ্ছেঘুড়ি ফাউন্ডেশনের সদস্যরা উদ্যোগ নিই। তখন গ্রামে থাকা কিছু বক, ঘুঘু, শালিক, চড়ুই এগুলো রক্ষায় কাজ শুরু করি। গ্রামবাসীকে বোঝাই। এখন গ্রামের মানুষ পাখি শিকার তো করেই না বরং বাইরের থেকে আসা শিকারিদের হাত থেকে এদের রক্ষা করে।’
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পাভেল রায়হান বললেন, ‘পাশের গ্রামের কয়েক প্রভাবশালী মাঝে এসেছিল পাখি শিকার করতে। তাদের বুঝিয়ে নিষেধ করা হয়। কিন্তু তারা ক্ষমতা দেখিয়ে পাখি শিকারের চেষ্টা করে। তখন আমাদের হাঁকডাকে গ্রামের মানুষ এগিয়ে আসে। এসময় বাধ্য হয়ে তারা ফিরে যায়। পাখি রক্ষায় গ্রামের সবাই এখন একজোট।’

আরও পড়ুন