গরিবের কার্ড বিতরণে বেপরোয়া অনিয়ম দুর্নীতি

আপডেট: 02:54:15 30/09/2020



img

নড়াইল প্রতিনিধি : জেলার মাউলি ইউনিয়নে বয়স্ক ও বিধবাসহ বিভিন্ন ভাতা কার্ডের তালিকা তৈরিতে ইউপি চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা সমাজসেবা এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর তদন্ত শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কালিয়া উপজেলার মাউলি ইউনিয়নে বয়স্ক, বিধবা, মাতৃত্বকালীন, প্রতিবন্ধী, দলিত-হরিজন ও বেদে ভাতা কার্ডধারী রয়েছেন এক হাজার ৪০৭ জন। কিন্তু ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও তার লোকজন, কয়েক মেম্বারসহ সংশ্লিষ্টরা মিলেমিশে টাকার বিনিময়ে নির্ধারিত বয়স না হলেও বয়স্ক ভাতা, স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় স্ত্রীর বিধবা ভাতা, গর্ভবতী না হওয়া সত্ত্বেও মাতৃত্বকালীন ভাতা, প্রতিবন্ধী না হয়েও প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ড করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ইউনিয়নের আট নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ মহাজন গ্রামের রঞ্জন বিশ্বাস জানান, তার এবং স্ত্রী যমুনা বিশ্বাসের বয়স্ক ভাতার কার্ড করতে মোট ৪২ হাজার টাকা নিয়েছেন ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার জাহাঙ্গীর খাঁ।
মহাজন গ্রামের খোকন দাস (৩৭) বলেন, স্থানীয় এক ব্যক্তি তাকে এবং তার আপন ভায়রা মহাজন বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী নৃপেন সাহাকে (৪৬) বয়স্ক ভাতা কার্ড করে দিয়েছেন। বয়স্ক ভাতা কার্ড করতে গেলে যে বয়স ৬৫ বছর হতে হয়, তা তিনি জানতেন না বলে দাবি করেন।
দক্ষিণ মহাজন বাজারের গুরুদাসী বিশ্বাসের স্বামী প্রভু বিশ্বাস। স্বামী জীবিত থাকা সত্ত্বেও তিনি বিধবা ভাতার কার্ড করেছেন।
গুরুদাসীর ছেলে সজীব বিশ্বাস বলেন, তার মা অশিক্ষিত বিধায় না বুঝেই এ কার্ড করেছেন। ১২ হাজার টাকার বিনিময়ে এ কার্ড করেছেন বলে জানান তিনি।
উত্তর মহাজন গ্রামে গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা ভূমিহীন মমতাজ বেগম বলেন, তার স্বামী মুজিবর মোল্যার বেদে কার্ডের জন্য স্থানীয় সুজল মেম্বারকে ছয় হাজার টাকা দেন। কিন্তু কার্ড পাননি। জুয়েল মেম্বার বলেছেন, আরো চার হাজার টাকা লাগবে। এই অর্থবাণিজ্যের প্রতিবাদ করতে গেলে মেম্বার তাকে মারতে তেড়ে আসেন বলেও অভিযোগ মমতাজের।
এ ইউনিয়নের সাত নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নদী ভাঙনে প্রায় নিঃস্ব হওয়া ৭৩ বছরের হেমায়েত বিশ্বাস, ৯৮ বছরের নির্মলা বর্মণ, বাদাম বিক্রেতা বিধবা শ্যামলি বিশ্বাস (৪০), বিছানায় শয্যাশায়ী পঙ্গু নিরঞ্জন বর্মণ (৬০) কোনো কার্ড পাননি।
একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা ৭৫ বছরের বড়– বিবি সংশ্লিষ্ট মেম্বার সুজলকে চার হাজার টাকা দিতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু টাকা কম হওয়ায় তাকে কার্ড দেননি মেম্বার।
আট নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ মহাজন গ্রামের বাসিন্দা ৮৫ বছরের চারুবালা দাস, ৮০ বছরের ভানু সাহা, ভূমিহীন দীপ্ত বিশ্বাসের গর্ভবতী স্ত্রী অন্বেষা বিশ্বাস, নয় নম্বর ওয়ার্ড ঘসিবাড়িয়া গ্রামের ভ্যানচালক তপন পালের স্ত্রী গর্ভবতী পুষ্প পাল, একই ওয়ার্ডের কলাগাছি গ্রামের সবজি বিক্রেতা বিধবা আরতি বিশ্বাসও (৫০) কার্ড পাননি।
এদিকে সাত নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার সুজল ঠাকুর স্ত্রী ইতিকা ঠাকুরকে ২০১৭-১৮ সালে গর্ভবতী দেখিয়ে তার নামে মাতৃত্বকালীন ভাতা কার্ড করে নেন। যদিও সেই সময়ে তিনি গর্ভবতী ছিলেন না বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
তবে এই বিষয়ে সুজল মেম্বার বলেন, তার স্ত্রী সে সময় গর্ভবতী ছিলেন। এ কারণে তিনি কার্ড নিয়েছিলেন।
এছাড়া সুজল মেম্বার তার বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগ ‘মিথ্যা ও বানোয়াট’ বলে দাবি করেন।
নড়াগাতি থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি উত্তমকুমার সাহা বলেন, এ ইউনিয়নে প্রায় ৪০০ কার্ড বিতরণে নয়ছয় হয়েছে। এ চক্রটি ফেরি করে কার্ড বিক্রি করছে। যে বেশি টাকা দেয় তারাই কার্ড পায়। এইসব অনিয়ম-দুর্নীতি অভিযোগ তদন্ত করলেই সত্য বলে প্রমাণিত হবে।
এ ব্যাপারে মাউলি ইউপি চেয়ারম্যান এবং কার্ডের তালিকা প্রস্তুত কমিটির সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘নিয়মতান্ত্রিকভাবেই কার্ড করা হয়েছে। ভুল-ত্রুটি বা দু-একটিতে সমস্যা হতে পারে। অনিয়ম-দুর্নীতির কথা যতটা বলছেন, ততটা নয়।’
সুজলের ওয়ার্ডে এসব অভিযোগে বেশি শোনা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন চেয়ারম্যান। তবে কোনো উপকারভোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।
জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক রতন হালদার বলেন, মাউলী ইউনিয়নে কার্ড বিতরণে কিছু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর তদন্ত চলছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে বা যাবে তাদের কার্ড বাতিল করা হবে।
তিনি জানান, কার্ড বিতরণে একটি কমিটি থাকে। প্রত্যেক ইউনিয়নে ইউপি চেয়ারম্যান এর সভাপতি। কার্ড বিতরণে অনিয়মের সঙ্গে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা অভিযুক্ত হলেও তাদের দায়ী করার ক্ষমতা আমার নেই। এক মাস আগে ইউনিয়ন সমাজকর্মী হারুনর রশিদকে বদলি করা হয়েছে। তবে তাকে প্রশাসনিক কারণে বদলি করা হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন