গণমাধ্যমকে ভীতি প্রদর্শন ত্রাণ চোরদের সমৃদ্ধ করবে

আপডেট: 09:43:51 07/05/2020



img

রিয়াজ আহমদ

কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় দীর্ঘায়িত লকডাউন কার্যকর করার পাশাপাশি বাংলাদেশের কর্মশক্তি বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক ও আধা-আনুষ্ঠানিক খাতের দিনমজুরদের কাছে সম্ভাব্য সকল উপায়ে ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। তবে মহামারির বিরুদ্ধে জাতির ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের মধ্যেও অসৎ সরকারি কর্মচারী ও তৃণমূল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদেরকে দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ চুরি করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ ত্রাণ চুরির খবর প্রকাশ ও প্রচার হওয়ার পর তা আমলে নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার।
কোভিড পরবর্তী সময়ে তীব্র খাদ্য সংকটের সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে অনেকবারই খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিতে দেখা গেছে। যথাযথ সময়ে এবং কার্যকরভাবে খাদ্য বিতরণ নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
‘ডেমোক্র্যাসি অ্যাজ ফ্রিডম' এ নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, গণতন্ত্রের দেশে দুর্ভিক্ষ হয় না। তিনি লিখেছেন,‘বিশ্বের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর কোনও দেশে কখনও দুর্ভিক্ষ হতে দেখা যায়নি।’
বিশ্বের অন্যান্য জায়গার মতো বাংলাদেশেও দৃঢ় গণতন্ত্র বিদ্যমান থাকার মাপকাঠি হলো কর্তৃপক্ষের ছোটখাটো দোষগুলোকে তুলে ধরতে পারার মতো মুক্ত গণমাধ্যমের পরিবেশ বিরাজমান আছে কিনা। এ প্রক্রিয়ায় একমাত্র প্রত্যাশিত বিষয় হলো গণমাধ্যমে আসা সমালোচনাকে ভালোভাবে নেওয়া। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হঠকারিতা বা অন্যায্য কিছু ঘটে যেতে পারে,কারণ মানুষ মাত্রই ভুল করে, আর সংবাদকর্মীরা এর বাইরে নয়। তবে আমাদেরকে থমাস জেফারসনের একটি কথা মনে রাখতে হবে। তিনি বলেছেন, ‘কোনও সরকারই সেন্সরশিপের বাইরে থাকতে চায় না। আর সংবাদমাধ্যম যদি স্বাধীন হয় তাহলো তো কোনও কথাই নেই।’
যদিও সরকার সবসময় মুক্ত গণমাধ্যমের পরিবেশ তৈরি করা নিয়ে গর্ব করে থাকে, তবে সেরকম পরিবেশ কার্যত অনুপস্থিত। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা দেওয়ার প্রবণতা বেড়েছে, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে। গ্রেফতারের পর দোষী প্রমাণের আগেই তাদের জেলে পাঠানো হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় বাধা তৈরি করে।
এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও ৫৪ ধারার আওতায় পাঁচ সাংবাদিককে গ্রেফতারের পর পরই জেলে পাঠানো হয়েছে। ঢাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার আট সপ্তাহ পর ফটো সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলের সন্ধান মিলেছে। পুলিশের দাবি, দেশের একটি আন্তর্জাতিক সীমান্তের কাছে তাকে পাওয়া গেছে। অবশ্য তার পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীরা সে দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। আমরা বিস্মিত হয়ে গেছি যে আদালত থেকে জামিন পাওয়ার সাথে সাথে তাকে ৫৪ ধারার নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
সাংবাদিক কাজলকে খুঁজে পাওয়ার একদিন আগে নরসিংদীর তিন সাংবাদিককে জেলে পাঠানো হয়েছে। তারা হলেন দৈনিক গ্রামীণ দর্পণের বার্তা সম্পাদক রমজান আলি প্রামাণিক, এর স্টাফ করেসপন্ডেন্ট শান্ত বণিক ও অনলাইন নিউজ পোর্টাল নরসিংদী প্রতিদিনের প্রকাশক ও সম্পাদক শাওন খন্দকার শাহীন। গত ২৯ এপ্রিল ঘোড়াশালে পুলিশের হেফাজত থেকে ফিরে যাওয়ার পর এক সিএনজিচালকের মৃত্যু নিয়ে খবর প্রকাশ করেছিলেন তারা। লকডাউন ভাঙার অভিযোগে ওই চালককে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছিল পুলিশ। আব্দুল মান্নান নামের ওই সিএনজিচালকের স্বজনরা অভিযোগ করেছিলেন, এ মৃত্যুর জন্য পুলিশই দায়ী। আর এ খবরটি প্রকাশ করেছিলেন ওই তিন সাংবাদিক। একে ‘বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ রিপোর্ট দাবি করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় ওই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল স্থানীয় পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ দাবি করেছে, ‘হার্ট অ্যাটাক’ এ মৃত্যু হয়েছে ওই চালকের। নরসিংদীর একটি আদালত তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
এর কয়েকদিন পর সুনামগঞ্জভিত্তিক সংবাদপত্র ‘হাওরাঞ্চলের কথা’ এর সম্পাদক ও একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদকর্মী মাহতাব উদ্দিন তালুকদারকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। একটি রাজনৈতিক দলের ইউনিয়ন পর্যায়ের এক নেতা মামলাটি করেছেন। তার অভিযোগ, মাহতাব একজন আইনপ্রণেতার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার যখন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে, তখন অনেকে নতুন এ আইনটি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিলেন।
সাইবার অপরাধ মোকাবিলার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পূর্ববর্তী সময়ে আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারার অপব্যবহার হওয়ায় আগে থেকেই এ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। অতীতে দেখা গেছে সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে তৈরি করা এ আইনের অপব্যবহার হতে; অনেক নিরীহ মানুষকে ৫৭ ধারার আওতায় মামলা করে ফাঁসানো হয়েছে। এ ধারার আওতায় কারও বিরুদ্ধে মামলা করা হলে এবং আদালত যদি বাদীর আবেদনে সন্তোষ প্রকাশ করে তবে অন্ততপক্ষে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার আগে পর্যন্ত ওই ব্যক্তিকে জেলে থাকতে হয়।
 
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা কী?
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো করা হয়েছে তাতে দুইটি বিষয় দেখা যাচ্ছে-
১. মামলা দায়েরের পরপরই তাদেরকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হচ্ছে। পরে হয়তো তারা নির্দোষ প্রমাণিত হচ্ছেন ঠিকই কিন্তু মাঝখানের এ সময়টাতে তাদেরকে গুরুতর যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে।
২. অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ওই বাদী নিজে কথিত ভুক্তভোগী নন, এমনকি ওই ভুক্তভোগীর সঙ্গে তার কোনও সম্পর্কও নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা কোনও রিপোর্ট বা মন্তব্য প্রকাশের কারণে কারও ‘ভালো ভাবমূর্তি’ ক্ষুণ্ন হয়েছে মনে করলে সে ব্যক্তির ভাবমূর্তি ‘সুরক্ষার দায়িত্ব’ নিজেরাই নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়।
মুক্ত গণমাধ্যমের চর্চা গণতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করে। তবে যুক্তিহীন ‘ভাবমূর্তি’ ইস্যুতে জনসাধারণকে হয়রানি করা, সাংবাদিকদের হয়রানি করা যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর মুক্ত গণমাধ্যমকে ভীতি প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট এ ধরনের পরিবেশ শুধু ত্রাণ চোরদেরকেই সমৃদ্ধ করবে।
[ঢাকা ট্রিবিউন থেকে বাংলা ট্রিবিউনের অনুবাদ]

আরও পড়ুন