কেরুর সাড়ে তিনশ' পাহারাদার বরখাস্ত

আপডেট: 11:35:12 12/07/2020



img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : দেশের ঐতিহ্যবাহী চুয়াডাঙ্গার দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানির (চিনিকল) কৃষি খামারে পাঁচ বছরে সাড়ে আঠারো কোটি টাকা লোকসানের কারণ দেখিয়ে ‘অবৈধভাবে নিয়োগ করা’ সাড়ে তিনশ পাহারাদারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ কারণে খামারগুলো এখন পাহারাদারশূন্য হয়ে পড়েছে।
পাহারাদারদের অভিযোগ, বিগত সময়ে কেরু অ্যান্ড কোম্পানি চিনিকলের শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কোটি কোটি টাকার অর্থবাণিজ্যের সহায়তায় চিনিকলের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দিন হাজিরার ওইসব পাহারাদারকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তাদের কাছে থেকে জনপ্রতি তিন থেকে চার লাখ টাকা করে নেওয়া হয়।
কেরু অ্যান্ড কোম্পানির কৃষি খামারগুলো থেকে গত পাঁচ বছরে ১৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে চার কোটি ৫০ লাখ, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তিন কোটি ৯৫ লাখ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দুই কোটি ৯০ লাখ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তিন কোটি ৬৭ লাখ, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তিন কোটি ৫১ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে বলে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলাকার আখচাষিদের আখ ও কেরুর নিজস্ব বাণিজ্যিক খামারগুলোতে প্রতি বছর প্রায় দেড় হাজার একর জমিতে আখ চাষ করা হয়ে থাকে; যা থেকে প্রায় ২৫ হাজার টন আখ পাওয়া যায়। যার বাজার মূল্য সাত কোটি ৭৫ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এ পরিমাণ আখ উৎপাদন করতে প্রতি বছর চিনিকলের গড়ে খরচ হয় ১১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। সে হিসেবে প্রতি বছর এ বাবদ গড়ে তিন কোটি ৭০ লাখ টাকা লোকসান হয়ে থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লোকসানের পরেও চিনিকল চালিয়ে রাখার জন্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নানামুখী অনিয়মের আশ্রয় নেয়। কৃষি খামারের শিডিউল অনুযায়ী শ্রমিকরা কাজ না করেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজসে অতিরিক্ত বিল উত্তোলন, বেশ কয়েকবার খামারের সার চুরি, সেট-আপ অনুযায়ী কৃষি খামারে যে পরিমাণ পাহারাদার প্রয়োজন তার চেয়ে তিন গুণ বেশি পাহারাদারের বিল উত্তোলন করার কারণে প্রতি বছর খামারের লোকসান বেড়েই চলেছে।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, শুধু চিনিকল কৃষি খামারের পাহারাদারের বিল বাবদ প্রতি বছর দুই কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়ে থাকে। তাছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোনো পাহারাদারই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কৃষি খামারে সর্বক্ষেত্রে নানা অনিয়ম, বছরের পর বছর লোকসান, প্রভাব খাটিয়ে অতিরিক্ত দৈনিক পাহারাদার দিয়ে কৃষি খামারগুলোতে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ পায় বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন ।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন সম্প্রতি কেরু অ্যান্ড কোম্পানি চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে এ বিষয়গুলো রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। সে মোতাবেক চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রতিষ্ঠানের ডিজিএম (ফার্ম) মো. হুমায়ুন কবীরসহ সব ফার্ম ইনচার্জকে জানিয়ে দেন, দৈনিক পাহারাদারদের খামারে আসার দরকার নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দৈনিক পাহারাদাররা ফার্ম ইনচার্জদের কাছ থেকে এমন খবর শোনার পর টাকা খরচ করে চাকরি নেওয়া পাহারাদাররা উত্তেজিত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ আবার আহাজারি করতে থাকেন।
বাদপড়া পাহারাদাররা সংবাদিকদের জানান, তারা দিন হাজিরায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির কোটি কোটি টাকার স¤পদ রক্ষা করতেন। তাদের বাদ দিলেই কি লোকসান কাটিয়ে উঠবে?
এদিকে, কেরুর দশটি কৃষি খামারের মধ্যে নয়টি দৈনিক হাজিরার প্রায় সাড়ে ৩০০ পাহারাদার কাজ থেকে বাদ পড়লেও চিনিকলের আকন্দবাড়ীয়া পরীক্ষামূলক খামারের প্রায় অর্ধশত দৈনিক হাজিরার পাহারাদার বহাল রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করে বলেন, আকন্দবাড়ীয়া পরীক্ষামূলক খামারের শ্রমিকদের (দৈনিক গড় হাজিরা ২৫০+১২৫=৩৭৫ টাকা) দেখিয়ে চিনিকলের অনেক কর্মকর্তার বাড়িতেই একজন বা দুইজনকে বাজার করা, বাড়িতে মালির কাজসহ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত কাজে লাগানো হয়ে থাকে। হয়তোবা এ কারণেই আকন্দবাড়ীয়া পরীক্ষামূলক খামারের পাহারাদারদের এখনো বাদ দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবু সাইদ জানান, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কৃষি খামারগুলোতে লাগাতার লোকসান কমিয়ে লাভে ফিরিয়ে আনার জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া যারা বাদ পড়েছেন তারা দিন হাজিরায় কাজ করতেন। প্রতিদিন হাজিরা দিয়ে কাজ করানো হয়।
চিনিকলের আকন্দবাড়ীয়া পরীক্ষামূলক খামারের শ্রমিকদের কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত কাজে বা বাড়ির কাজে লাগানোর অভিযোগ সঠিক নয় দাবি করে তিনি বলেন, সেখানকার শ্রমিকরাও বাদ পড়বেন।

আরও পড়ুন