কী ঘটেছিল সেই ১৯ ঘণ্টায়

আপডেট: 07:12:27 13/01/2021



img

স্টাফ রিপোর্টার : দু’দিন ধরে যশোরে আলোচনার কেন্দ্রে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান বিপু। নতুন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কাছে সৃষ্ট একটি ঘটনা, তাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া এবং সবশেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারযোগে ঢাকা পাঠানো- এসব নিয়ে আলোচনার শেষ নেই।
কিন্তু কী ঘটেছিল সেই ১৯ ঘণ্টায়? এনিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রয়েছে। বিপু দাবি করছেন, যা নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত, তিনি তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। একইসঙ্গে তিনি এও বলছেন, তাকে বেদম পিটিয়েছে পুলিশ। আওয়ামী লীগ নেতারাও নির্যাতনের অভিযোগ তুলছেন। একইসঙ্গে নেতাদের বাড়িতে বাড়িতে গভির রাতে পুলিশি হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ তাদের।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বিপুকে পেটানোর অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। জানানো হয়েছে, ঘটনা সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে একটি তদন্ত কমিটিও কাজ করছে। তাছাড়া সেই রাতে পুলিশ আসামি ধরতে অভিযানে গিয়েছিল, কিন্তু কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটায়নি বলে দাবি করা হচ্ছে।
ডাক্তাররা অবশ্য বিপুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা বলছেন। তবে তা গুরুতর নয় বলে তাদের ভাষ্য।
সোমবার (১১ জানুয়ারি) রাত আটটার দিকে শহরের পুরাতন কসবায় নতুন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। সাদা পোশাকে থাকা কয়েক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গোলযোগ হয়। সেই সময় নিজের পরিচয় দিয়ে ও পরিচয়পত্র দেখিয়ে পুলিশ কনস্টেবল ইমরান এর প্রতিবাদ করেন। কিন্তু অভিযোগ, আওয়ামী লীগ কর্মীরা ক্ষ্যান্ত না হয়ে তাকে মারপিট করে এবং অপহরণ করে পাশের আবু নাসের স্মৃতি সংসদ নামে একটি ক্লাবে নিয়ে যায়। ওই ঘটনার সময় সেখানে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান বিপুও ছিলেন।
কনস্টেবল ইমরানের অভিযোগ, ক্লাবে নিয়ে ফের মারপিট করা হয় তাকে। খবর পেয়ে পুলিশের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ইমরানকে উদ্ধার ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদ হাসান বিপুসহ চারজনকে হেফাজতে নেয়। প্রায় ১৯ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার দুপুরের পর মাহমুদ হাসান বিপুকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর রাতেই তাকে চিকিৎসার জন্য যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মাহামুদ হাসান বিপুর অভিযোগ, পুলিশ হেফাজতে নিয়ে তাকে বেধড়ক মারপিট করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘ঘটনার সময় আমি আবু নাসের স্মৃতি সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন শহর আওয়ামী লীগের এক প্রবীণ নেতা এসে বলেন, ‘শহীদ মিনারের সামনে মারামারি হচ্ছে; পারলে ঠেকাও।’ আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি একটি ছেলেকে কয়েকজন মিলে মারধর করছে। আমি গিয়ে ছেলেটাকে সেফ করি। অন্যদের বলি, কেন মারছো, চলে যাও সব। ওরা বলে, ‘আমাদের মেরেছে, এজন্য...।’ পরে আমি তাদের চলে যেতে বলি। তখন দেখি আরো অনেকে দৌড়ে আসছে। তখন আমি ভাবি, ছেলেটাকে রক্ষা করতে হবে। এসময় আমি একটি মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে বলি, ‘ছেলেটাকে একটু কাঁঠালতলা অফিসে পৌঁছে দেন।’ ওই অফিসটা জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি শাহীন চাকলাদারের। আমি মনে করেছি, ওখানে পাঠালে কেউ ছেলেটাকে মারতে পারবে না। এবং আমি ওসি সাহেবকে খবর দিয়ে ছেলেটাকে তাদের হাতে দিয়ে দেবো। ওসি সাহেবকে ফোন দিতে দিতে পুলিশ চলে আসে। পুলিশকে বিষয়টি বর্ণনা করি। এরপর ওই ছেলেটাকে কাঁঠালতলা অফিস থেকে ফিরিয়ে এনে পুলিশের কাছে দিয়ে দেই। এরপর ওসি ঘটনাস্থলে আসে। তিনি এসে কে পুলিশের ওপর হাত দিয়েছে জানতে চায়। তখন আমি জানলাম, আক্রান্ত ছেলেটি পুলিশ। এরপর হঠাৎ আমার ঘাড়ে লাঠি দিয়ে আঘাত করে পুলিশ। আমি বললাম, ‘এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি করছেন?’ এরপর আমাকে ধরে থানায় ও পরে ডিবি অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে পুলিশের একজন পদস্থ কর্মকর্তা গালিগালাজ করে এবং অস্ত্র বের গুলি করবে বলে হুমকি দেয়।’’
‘‘তখন আমি বললাম, ‘আমার গোষ্ঠীতে সাতজন মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। আমি ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে আজকে শহর আওয়ামী লীগের নেতা। আমাকে ‘কাউয়ালীগ’ বলবেন না। এরপর সাত-আটজন মিলে মৌমাছির মতো ২০-২৫ মিনিট ধরে আমাকে নির্মমমভাবে মারপিট করেছেন,’’ বলছিলেন বিপু।
তার ভাষ্য, ‘‘পরে আক্রান্ত পুলিশ সদস্যকে নিয়ে আসা হয়। সে কর্মকর্তাদের সামনে জানায়, আমি তাকে সেফ করেছি। এর আধাঘণ্টা পর আবার আমার চোখ বেঁধে মারপিট করা হয়েছে। আমার কোনো অপরাধ ছিল না। আমি আওয়ামী লীগের কর্মী অথচ আমাকে চোরের মতো মারপিট করা হয়েছে। একপর্যায়ে আমি বললাম, ‘আমার মাথায় বাড়ি মারেন।’ পরে ওরা চলে গেল। আমার চোখ বাঁধা, হাত পেছনে হ্যান্ডকাপ দিয়ে বাঁধা। পা দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। আধাঘণ্টা পরে পানি খেতে চাইলে পানি দেয়। কিন্তু চোখ খোলেনি। রাত পৌনে তিনটার দিকে আবার একটি টিম এসে বলে, ‘পুলিশের গায় হাত দিস। আমি বললাম পুলিশের হাবিলদার থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আমার সুসম্পর্ক। আমার সাথে কারো কোন দ্বন্দ্ব নেই। এরপর তারা বলে, ‘তোর বাহিনী মেরেছে।’ এরপর আবার মারপিট শুরু হয়। আমি বলি, ‘আমি অপরাধ করিনি। তারপরও যদি আপনাদের মনে হয়, তাহলে আমার মাথায় বাড়ি মেরে আমাকে মেরে ফেলেন। তবু এভাবে নির্যাতন করেন না। বিএনপি আমলে আমাকে ধরে এনে মাত্র চারটে বাড়ি মারছিল। আর আপনারা যা করছেন, তার থেকে আমারে মেরে ফেলেন। আমি অপরাধ করিনি। আমি পুলিশ ভাইটিকে সেফ করেছি। এটাই আমার কাল হলো।’’
এদিকে, বিপুকে চিকিৎসা প্রদানকারী অর্থোপেডিক সার্জন আব্দুর রউফ জানান, বিপুর শরীরের একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া তার ডায়বেটিস ধরা পড়েছে। তার সুস্থ হতে সময় লাগবে।
শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোহাম্মাদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিপুকে নির্মম নির্যাতন করে পুলিশ ক্ষ্যান্ত হয়নি। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোমবার রাতে শহরের অনেক আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে পুলিশ।’
এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত করে বিচার দাবি করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, ‘বিপুর অবস্থা খুবই গুরুতর। চিকিৎসকরা তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন। এজন্য আজ বুধবার তাকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।’
অবশ্য পুলিশ সুপার মুহাম্মাদ আশরাফ হোসেন বলেন, পুলিশ সদস্যকে মারপিট ও আটকে রাখার ঘটনায় মামলা হয়েছে। এ অপরাধের সাথে জড়িতদের ধরতে ওই রাতে (সোমবার) অভিযান চালানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সত্য নয়। আমার জানা মতে, কোনো আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়নি। সিসিটিভির ফুটেজ আমি দেখেছে। সেখানে পুলিশের টিম কেবল যাচ্ছে। তারা বেআইননিভাবে ভাঙচুর করেছে- এমন কোন ছবি নেই। এমনকি পুলিশ হেফাজতে বিপুকে কোনো প্রকার মারপিটের ঘটনা ঘটেনি। উনি একজন সম্মানিত লোক। জিজ্ঞাসাবাদের কিছু নিয়ম আছে সেগুলো মেনেই আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি।
‘ওনাকে হেফাজতে মারার কোনো কারণ থাকতে পারে না। তারপরও অভিযোগ যেহেতু আসছে, সেকারণে সিনিয়র কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত টিম করে দেওয়া হয়েছে। ফলে কোনো ব্যত্যয় হলে তা তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পরই বলা সম্ভব হবে,’ বলছিলেন পুলিশ সুপার।
এদিকে পুলিশ সদস্যকে মারপিটের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় বিপুর সাথে আটক শাহিনুজ্জামান তপু ও ইমামুল হককে আসামি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। এছাড়া অন্যরা নিরাপরাধ হওয়ায় তাদের আসামি করা হয়নি।

শহীদ মিনারের ঘটনা নিয়ে পুলিশের ভাষ্য
পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বলা হচ্ছে একটি মেয়েকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে। আসলে সেটা সত্য নয়। ওই ঘটনায় কোনো মেয়ের সম্পৃক্ততা ছিল না। জান্নাত নামে একজন পুরুষ পুলিশ কনস্টেবলকে নারী ভেবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘কনস্টেবল ইমরান ও জান্নাত ডিসির বাসভবনের গার্ড। মিল অফ থাকায় তারা বাইরে খাবার খাওয়ার উদ্দেশে বের হয়। এছাড়া তাদের অস্ত্র পরিষ্কার করার জন্য কিছু মালামাল কেনার কাজও ছিল। তারা শহীদ মিনার এলাকায় পৌঁছুলে পুলেরহাটে দায়িত্বপ্রাপ্ত আশরাফুল নামে অপর এক কনস্টেবল তাদের ফোন দেয়। সেও অস্ত্র পরিষ্কার করতে কিছু মালামাল কেনার জন্য বের হয়েছিল। ইমরান তাকে শহীদ মিনারে আসতে বলে। সেখানে আসার পর তারা শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলছিল। ওই সময় শহীদ মিনারে থাকা কয়েক যুবক তাদের ওই এলাকা ছেড়ে যেতে নির্দেশ করে। এসময় ইমরান জানায়, তারা ছবি তুলছে, তাতে তাদের কী সমস্যা? তখন ওই যুবকদের মধ্যে একজন এসে ইমরানকে চড় মেরে বলে, ‘চলে যেতে বলেছি, চলে যা।’ এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। এরপর সাদা পোশাকে থাকা তিন পুলিশ সদস্য নিজেদের পরিচয় দিলেও তাদের মারপিট করা হয়। একপর্যায়ে কনস্টেবল জান্নাত ও আশরাফুল নিজেদের রক্ষা করে পালিয়ে আসে। কিন্তু ইমরানকে ওই যুবকরা ধরে নিয়ে আবু নাসের স্মৃতি সংসদ অফিসে নিয়ে মারপিট করে। সেখানে আওয়ামী লীগ নেতা বিপুও ছিলেন।’’
পুলিশ সুপার বলেন, তবে বিপু ছেলেটিকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন বলে পরে প্রতীয়মান হয়েছে। পরে জান্নাত ও আশরাফুলের দেওয়া তথ্য মতে পুলিশ ইমরানকে উদ্ধার করে।

আরও পড়ুন