করোনা-কালে কৃষকের সহায় যোগাযোগ প্রযুক্তি

আপডেট: 11:08:33 11/05/2020



img
img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : কোন পোকার জন্য কোন কীটনাশক; কোন সময় সেচ দিতে হবে; ফসলের ক্ষেতে কোপনভ সমস্যা হচ্ছে কি-না- এ সমস্ত সমস্যার সমাধান ফসলের ক্ষেতে দাঁড়িয়েই মোবাইল ফোনকল বা মেসেজের মাধ্যমে পেয়ে যাচ্ছেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শংকরচন্দ্র ইউনিয়নের হানুরবাড়াদি গ্রামের কৃষক স্বপন আলী। তিনি মুখীকচু, শসা, তরমুজ ও ধান মিলিয়ে আট বিঘা জমির আবাদ করেছেন।
একই গ্রামের দলিলউদ্দিন তার হাতের স্মার্ট ফোন দেখিয়ে বললেন, কৃষিবিষয়ক কয়েকশ’ ভিডিও সেভ করা আছে এখানে। ইউটিউবে প্রকাশ করা নতুন নতুন কৃষিভিত্তিক ভিডিও প্রতিবেদন দেখে কৃষিকাজে অনেক উপকার পাচ্ছেন এই চাষি।
গাড়াবাড়ীয়া গ্রাামের কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, ‘‘উপজেলা কৃষি অফিস থেকে আমাদের গ্রামে ‘কৃষক সংগঠন’ ও ‘ডিজিটাল কৃষি পাঠাগার’ স্থাপন করা হয়েছে। ‘ডিজিটাল কৃষি পাঠাগারে’ সদর উপজেলা কৃষি অফিসার ৩২ ইঞ্চি এলইডি টিভি দিয়েছেন। সেখানে আমরা পেনড্রাইভ ব্যবহার করে দিয়ে কৃষিবিষয়ক ভিডিও দেখি সবাই। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের কৃষিবিষয়ক সংবাদ দেখি। ‘কৃষিকথা’ ও বই-পুস্তক পড়ি। এটা আমাদের খুব কাজে লাগছে।’’
শহরের শিক্ষিত কৃষি উদ্যোক্তা হাফেজ আব্দুল কাদের সোহান তার স্মার্ট ফোন দেখিয়ে বলেন, ‘কৃষি অফিস থেকে আমার মোবাইল ফোনে কয়েকটা অ্যাপস দিয়েছে। সেগুলো দেখে দেখে আমি বাগানের পরিচর্যা করি।’
এভাবে মোবাইল ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারে করোনাকালীন বিপর্যয়ের সময়েও কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন কৃষকেরা। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে যখন সারা দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে, তখন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার কৃষি অফিস খোলা থাকছে নিয়মিত। ইন্টারনেট, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে গতানুগতিক কৃষি পরামর্শ সেবাকে ডিজিটাল সেবায় পরিবর্তন করেছেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ তালহা জুবাইর মাসরুর।
করোনাকালীন সময়ে যখন বাইরে বের হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ এবং জনসমাগম পরিহার করে বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি মেনেচলা প্রয়োজন, সেক্ষেত্রে কৃষকদের জন্য কীভাবে কাজ করছেন তিনি?
কৃষি অফিসার তালহা জুবাইর মাসরুরের জবাব, এই দুঃসময়ে কৃষকদের পরামর্শ সেবা সহজ করা ও মোবাইল ফোনে হটলাইন সেবা চালু করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিসারের ফোন নম্বরসহ চারটি নম্বরকে ‘কৃষি সেবা হটলাইন’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কৃষকেরা তাদের সমস্যা নিয়ে এই নম্বরগুলোতে কল করছেন। সরাসরি অথবা এসএমএসের মাধ্যমে কৃষি পরামর্শ সেবা প্রদান করা হচ্ছে। নাম্বারগুলোতে প্রতিদিন শতাধিক ফোন কল আসে বলে তিনি জানান।
তিনি জানা, এছাড়া চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার প্রত্যেক ইউনিয়নের বাজার, কীটনাশকের দোকান ও মোড়ে উপসহকারী কৃষি অফিসারদের মোবাইল নম্বরসহ পোস্টার সাঁটা হয়েছে। কৃষকেরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে তাদের সমস্যার সমাধান পাচ্ছেন মাঠে বসেই।
করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে যখন ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে, তখন আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে কৃষিপ্রযুক্তি ও পরামর্শ সেবা প্রদানের কাজ করা হচ্ছে। যেখানে মানুষ ঘরে বসেই মাঠ, ফসল, বসতবাড়ি কিংবা ছাদকৃষি সমস্যার সমাধান সম্পর্কে জানতে পারছেন। কৃষি অফিসার তার নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল ‘কৃষি বায়োস্কোপ’ এবং ফেসবুক পেজে মৌসুমভিত্তিক কৃষির বিভিন্ন সমস্যা ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ভিডিও প্রচার করছেন; যা দেখে সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে কৃষি সংশ্লিষ্ট অনেকেই উপকৃত হচ্ছেন।
গত ১৭ এপ্রিল আধুনিক ধান কাটা যন্ত্র কম্বাইন্ড হারভেস্টার নিয়ে এই কর্মকর্তা একটা ভিডিও আপলোড করেন যা ইউটিউব ও ফেসবুক মিলিয়ে দেখেছেন দশ লাখেরও বেশি মানুষ। অনেকেই উদ্বুদ্ধ হয়ে সরকারি ভর্তুকিতে যন্ত্রটি কেনার জন্য কৃষি অফিসে যোগাযোগ করছেন। এছাড়া আম, লিচু, মাল্টা, পেয়ারা ও অন্যান্য ফলগাছের পরিচর্যাসহ যখন যে ফসল আবাদ হয় তখন সেই ফসল বিষয়ে শিক্ষামূলক ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে সেখানে।
কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ আফরিন বিনতে আজিজ জানান, করোনাভাইরাসে করোনা-কালে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উপসহকারী অফিসারদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সাপ্তাহিক মিটিং আয়োজন করা হচ্ছে নিয়মিত। কিছু কিছু আধুনিক কৃষক ভিডিও কল ও গাছের ছবি পাঠিয়ে পরামর্শ নিচ্ছেন। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার রিপোর্ট রিটার্ন, সার মনিটরিং সিস্টেম ও ওয়েদার ফোরকাস্ট কম্পিউটারাইজড করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
ইন্টারনেট-ভিত্তিক গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে; যেখানে কোনো বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করলে একসঙ্গে সকলেই জানতে পেরে তাদের মতামত দিতে পারছেন। মাঠের সমস্যা ও অবস্থা সম্পর্কে জানাতে পারছেন। ছবি ও ভিডিও শেয়ার করতে পারছেন।
করোনা-কালে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জ। সেই ক্ষেত্রে বাজারসংযোগে সহায়তা ও কৃষিপণ্য পরিবহনের প্রত্যয়নপত্র দিচ্ছে উপজেলা কৃষি অফিস। কৃষিপণ্য ও সবজির আড়তগুলো খোলা রাখা ও ঢাকাসহ দেশের পাইকারি বাজারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কৃষিপণ্যের পরিবহন ও যাতায়াত অবাধ করা ও স্থানীয় সবজি বাজারগুলো খোলা রাখার বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে।
কৃষি অফিসার তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, করোনার এই দুঃসময়ে যখন বহু শিল্প, কলকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে আছে, অর্থনীতির চাকা প্রায় স্থবির, দেশের কৃষি ও কৃষকই তখন আশার আলো দেখাচ্ছে। এই সময় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কৃষকের সঙ্গে থেকে, পাশে থেকে তাদের সাহস দেওয়া, কারিগরি পরামর্শ দিয়ে ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়াটা নিশ্চিত করা।
‘কৃষি অফিসারেরা সেই কাজগুলো করলে কৃষকেরা আত্মবিশ্বাসী হবে। করোনা-পরবর্তী সম্ভাব্য বৈশ্বিক খাদ্য সংকট পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কৃষকদের আত্মবিশ্বাসী হয়ে খাদ্য উৎপাদনে অধিক মনোযোগী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহায়তার এই ডিজিটাল উদ্যোগগুলো সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া দরকার,’ বলছিলেন কৃষি কর্মকর্তা মাসরুর।

আরও পড়ুন