করোনাযোদ্ধা ডাক্তার লিমন

আপডেট: 01:02:20 14/05/2020



img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : ‘আমরা আমাদের বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকি আর ছেলে অনেকদিন হয়ে গেল নিচ তলায় একটি রুমে একা থাকে। হাসপাতাল থেকে বাড়িতে এসে আলাদাভাবেই তার রুমে চলে যায়। এরপর তার জামাকাপড় নিজে নিজেই সব পরিষ্কার করে। কতদিন হয়ে গেল ছেলে আমাদের সঙ্গে খাবারও খায় না। আমি নিজে গিয়ে নিচের রুমে দূর থেকে তাকে খাবার দিয়ে চলে আসি। সন্তান কাছে থেকেও দূরে- এটা যে কতটা কষ্ট, বলে বোঝাতে পারবো না।’
আবেগজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন, ডাক্তার লিমন পারভেজের মা নাসিমা হোসেন।
ডাক্তার লিমন ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঝিনাইদহ জেলা শহরের কাঞ্চনপুর এলাকার মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহাদৎ হোসেনের ছেলে ডা. লিমন পারভেজ।
১৯৭১ সালে বাবা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশ স্বাধীন করতে। পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে পেয়েছিলেন জাতীয় বীরের মর্যাদা। এখন ছেলে যুদ্ধ করছেন অদৃশ্য ভাইরাস করোনার বিরুদ্ধে। মহাসংক্রামক করোনা ভাইরাসকে ইতিমধ্যে বৈশ্বিক মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ইতিমধ্যে বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে দুই লক্ষাধিক মানুষ এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৪৩ লাখ।
জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও পরিবার-পরিজন রেখে করোনাযুদ্ধে নেমেছেন ডাক্তার লিমন। দিন-রাত রোগীর সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
শাহাদৎ হোসেনের দুই সন্তানের মধ্যে ছোট লিমন পারভেজ। ছোটবেলা থেকেই তার ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হয়ে মানুষকে সেবা করার।
করোনার এই মহামারিতে সম্মুখযোদ্ধা ডাক্তাররা। এখন পর্যন্ত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন বহু ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী। মারাও গেছেন দেশের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক।
এমন পরিস্থিতে ছেলের বিষয়ে কথা হয় বার্ধক্যে উপনীত হওয়া শাহাদতের সঙ্গে। ছেলের এমন কাজে গর্বিত এই বাবা। ছেলেও তার মতো যুদ্ধ জয় করবে বলে বিশ্বাস করেন শাহাদৎ।
তিনি বলছেন, ‘অনেক রোগী তথ্য গোপন করে চিকিৎসা নিতে আসছেন। কোথা থেকে কখন কী হয়ে যায়- এটা নিয়ে আমরা একটু চিন্তিত। তারপরও সন্তানকে বলি, তুমি ভয় পাবে না। সব সময় মন শক্ত রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। তোমার পাশে আমরা আছি। ছেলেকে সব সময় বলি, বাবা তুমি আমার সন্তান। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমার সন্তানকে এ যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে। এভাবেই তাকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাচ্ছি। আমরা যেমন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, ঠিক তেমনি তুমি এক যুদ্ধে নেমেছ।’
‘তুমি ডাক্তার হয়েছ মানুষের সেবা করার জন্য, দুস্থ অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। যে কোনো দুর্যোগকালে জাতীয় সংকটে মানুষের পাশে থেকে কাজ করতে হবে তোমাকে। তুমি দেশের সংকটময় এ মুহূর্তে করোনাযুদ্ধ জয় করে ঘরে ফিরবে, ছেলেকে সবসময় এই কথাই বলি,’ বলছিলেন শাহাদৎ।
ডাক্তার লিমন পারভেজের মা নাসিমা হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে যখন করোনা সংক্রমণ শুরু হয়, সে সময় পরিবারের সবার কথা চিন্তা করে লিমন তার ১৫ মাসের একমাত্র সন্তান শেহজাদ পারভেজ ও স্ত্রী ইশরাত আযম তিশাকে যশোরে তার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। এমনকি ছেলে আমাদের থেকে আলাদা থাকার চেষ্টা করতো। ঝিনাইদহে যখন প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়, তারপর থেকে ছেলে আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে না বললেই চলে। তাকে নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে থাকি।’
‘আবার নিজের মনকে শক্ত করি। দেশের যে অবস্থা কেউ করোনা আক্রান্ত হলে তার পরিবার পর্যন্ত তার পাশে থাকছে না। এমন সময় তাদের একমাত্র ভরসা ডাক্তার। আমি ভাবি, তারাও তো কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। তাদের পাশে আমার ছেলেকে যদি না পাঠাই তাহলে কীভাবে সুস্থ হয়ে মায়ের বুকে ফিরে যাবে তারা। এ যুদ্ধে লিমনের মনোবল শক্ত করার জন্য তাকে বলি, নিজের ভাই বা বোন ভেবে তুমি রোগীদের সেবা করবে। মায়ের দোয়া তোমার সাথে সব সময় আছে।’
ডা. লিমন পারভেজ জানান, পরিবারের সুরক্ষার কথা ভেবে তিনি পরিবার থেকে নিজেকে আলাদা রেখেছেন। পরিবারের সংস্পর্শে যান না তিনি। ১৫ মাসের একটি সন্তান ও স্ত্রীকে পাঠিয়ে দিয়েছেন বাবার বাড়িতে। মাঝে মাঝে ভিডিও কলে কথা হয় স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ‘ভিডিও কলে আমাকে দেখেই কোলে আসার জন্য দুই হাত বাড়িয়ে দেয় আমার সন্তান। কিন্তু একটু কোলে নিতে পারি না। আমার সন্তানকে খুব আদর করতে ইচ্ছা করে। বাবা হয়ে সন্তানকেও একটু কোলে নিতে পারছি না- এটা যে কত কষ্টের, কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন। দেশের মানুষের কথা ভেবে এ যুদ্ধে যখন নেমেছি, ইনশাল্লাহ সফল হবোই।’