এভাবেই বেঁচে থাকে মানবতা, জয়ী হয় মনুষ্যত্ববোধ

আপডেট: 09:51:42 26/05/2020



img
img
img
img
img
img

আহসান কবীর

মৃতদেহ দাফন বা সৎকারে মানুষের আকাল পড়েছে- গঙ্গাবাহিত পললভূমিতে এমনটি বোধকরি কখনো ঘটেনি। বরাবরই স্বজন-প্রতিবেশিরা ছুটে আসেন বিপন্ন পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে। এটাই ধর্মীয় শিক্ষা। এই জনপদের সংস্কৃতিও বটে।
তাই তো বাংলাদেশে নাম না-জানা মরদেহ দাফনের জন্য গড়ে ওঠে ‘আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম’-এর মতো সংগঠন। দেশের আনাচে-কানাচে ‘কবর খনন সংস্থা’র মতো শত শত সংগঠন/সংস্থা গঠিত হয়; যারা শুধু কবর খনন করেই দায়িত্ব শেষ করে না, বরং দাফন-কাফনেও এগিয়ে আসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। শুধু যে সওয়াব পাওয়ার আশায় এই সব সংগঠন/সংস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, তা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত গভীর মানবতাবোধ, সমাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা, আর্তের পাশে দাঁড়ানোর আকুতি।
কিন্তু ব্যতিক্রমী সময় এখন। গণমাধ্যমে প্রায়ই উঠে আসছে, সন্তান তার মুমূর্ষু বাবা বা মাকে ফেলে আসছে কোনো নির্জন স্থানে। মৃত ব্যক্তির দাফনে অংশ নিচ্ছে না সন্তানসহ স্বজনেরা। এর দৃশ্যমান কারণ একটি। আর তা হলো- মানবজাতির ভয়ানক শত্রু হয়ে আবির্ভূত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র করোনাভাইরাস। অসম্ভব রকমের সংক্রামক প্রাণঘাতী এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। ইতিমধ্যে মারা গেছেন প্রায় তিন লক্ষ মানুষ; যার মধ্যে বাংলাদেশের রয়েছেন ৫২২ জন (সরকারি হিসেবে)। প্রবাসে মৃত বাংলাদেশির সংখ্যাও এর কাছাকাছি।
যিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন, তার মতো হতভাগ্য বুঝি চরাচরে কেউ নেই। তার অন্ত্যেষ্টিতে লোক নেই, বাড়িতেও দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না সেই চিরচেনা দৃশ্য- যেখানে লোকেরা স্বেচ্ছায় দায়িত্ব নিয়ে নেন স্বজন হারানো পরিবারটির। বরং এখন পালিয়ে নিজেকে রক্ষা করতে ব্যাকুল ‘সৃষ্টির সেরা জীব’।
মৃত সন্দেহভাজন করোনা রোগীদের ক্ষেত্রেও অবস্থা তথৈবচ। যে ব্যক্তির স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, সেই মরদেহও অলীক ভীতি সঞ্চার করছে জীবিতদের।
তথাকথিত সভ্য দুনিয়ার এ এক ক্রান্তিলগ্ন। ভোগবাদ উসকে দেওয়া সমাজে মানুষ যে চরমভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে, নিজের ভালো-মন্দ ছাড়া কিছুই বুঝবে না- চলমান সংকট তা আরেকবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো বিশ্বকে।
মহাসংক্রামক করোনাভাইরাসের হাত থেকে মানবসমাজকে বাঁচাতে বিশ্বসংস্থা, রাষ্ট্র, সরকার যে দাওয়াই দিয়েছে, বর্তমান অবস্থা তৈরির পেছনে তার কি কোনো অবদান নেই? নিশ্চয় আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নিদান দিলো, সংক্রমণ থেকে বাঁচতে মানুষকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখতে হবে। কী আশ্চর্য কাণ্ড! মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সামাজিক জীব। এই প্রেসক্রিপশনে সে তো অসামাজিক হয়েই উঠবে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক কার্যক্রমগুলো দেখভাল করা বিশ্ব সংস্থাটি অবশ্য পরে তাদের এই বক্তব্য সংশোধন করে। বলে ‘সামাজিক দূরত্ব’ নয়, ‘শারীরিক দূরত্ব’ অবলম্বন করতে হবে। কিন্তু ততোদিনে যা হওয়ার হয়ে গেছে। করোনা আক্রান্ত মানুষকে তার নিকটজনরাই শত্রু ঠাওরাতে শুরু করেছে। আরো আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশ সরকারের মেশিনারিজ-গুলো আজও মানুষকে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখতে তাগাদা দিচ্ছে। অর্জিত গৌরব জলাঞ্জলি দেওয়া গণমাধ্যমও সেটিই প্রচার করছে। এই প্রপাগান্ডায় প্রভাবিত হয়ে সন্তান তো তার রোগগ্রস্ত বাবা-মাকে শত্রুই ভাববে।
এমন ঘোর প্রদোষেও আশার আলোকরশ্মির দেখা যে মিলছে না, তা নয়। একজন গার্মেন্ট মালিক তার কারখানার শ্রমজীবীদের মজুরিবঞ্চিত করে সরকারি প্রণোদনার টাকায় নিজের পুঞ্জিভূত সম্পদ স্ফীত করেন; আর একজন মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার তার প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের উদ্ভাবিত কিট দিয়ে করোনা রোগী শনাক্ত করার অনুমোদন পেতে দ্বারে দ্বারে ধরনা দিতে দিতে ক্লান্ত। জবরদস্তি করে ‘নির্বাচিত’ একজন এমপি ভাইরাস-আতঙ্কে নির্জনবাস বেছে নেন, আর একজন ভটভটি-চালক পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই তৈরির জন্য উদয়াস্ত মেহনত করে উপার্জিত সমুদয় টাকা তুলে দেন করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে গঠিত তহবিলে। গরিবের জন্য বরাদ্দ চাল চুরি করে জেলে যান ইউপি চেয়ারম্যান, আর একজন ভিখারি তার সঞ্চিত টাকা দান করে দেন মানবতার সেবায়। বেসরকারি ক্লিনিকের ফটকে তালা ঝুলিয়ে মালিক-চিকিৎসকরা যখন নিজ নিজ নিরাপত্তা তালাশে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন, তখন ডাক্তার মঈন করোনা রোগীদের বাঁচাতে বীরের মতো লড়াই করে জীবন দেন।
বিপদকালে আল মারকাজুল ইসলামী বা কোয়ান্টাম ফেডারেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা যখন এগিয়ে আসে করোনাভাইরাসে মৃত মানুষের দাফন-কাফনে, তখন তা আশা জাগায়। ঈদ-আনন্দ পরিত্যাগ করে যখন স্থানীয় উদ্যোগে গঠিত শফিকুল ইসলাম জুয়েলের ‘দাফন-যোদ্ধা’রা গোরস্থানে হাজির হন মৃতদেহ কবরস্থ করতে, তখন বোঝা যায়, সব মানুষ ‘দায়িত্বহীন’ হয়ে যায়নি। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রসূতি ও তার অনাগত সন্তানকে বাঁচাতে যখন একজন ডাক্তার এমিলি তার সঙ্গীদের নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে ঢোকেন, তখন বোঝা যায় সব ডাক্তার ‘কসাই’ হয়ে যাননি।
নিরন্তর দ্বন্দ্বের মাঝে এভাবেই বেঁচে থাকে মানবতা। জয়ী হয় মনুষ্যত্ববোধ। সমাজ এগিয়ে চলে প্রগতির দিকে।

লেখক : সম্পাদক, সুবর্ণভূমি। সেক্রেটারি, প্রেসক্লাব যশোর
ছবি : মীর মোশাররফ হোসেন বাবু, শফিকুল ইসলাম জুয়েল, খান-এ আলম মানিক

আরও পড়ুন