একের পর এক কয়লাবোঝাই কার্গোডুবি, বিপর্যয়ে পরিবেশ

আপডেট: 02:25:41 02/03/2021



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক: সুন্দরবন সংলগ্ন মংলার পশুর নদীতে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে ৭শ’ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে ডুবে যায় কার্গো বিবি ১১৪৮। যা উদ্ধারে এখনও কোনও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ২ মার্চ উদ্ধার কাজ শুরু হওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। একের পর এক সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় এভাবে কয়লাসহ কার্গোডুবির ঘটনা ঘটছে। গত ৪ বছরে এ ধরনের ছয়টি ঘটনায় সুন্দরবন এলাকার নদ-নদীর পানিতে ডুবেছে প্রায় ৩ হাজার ৫শ’ মেট্রিক টন কয়লা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়ছে কয়লা বিষ। এতে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে জলজপ্রাণীর পাশাপাশি মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ডুবে যাওয়া কার্গোর কয়লা ভিজে রাসায়নিক বিষ পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে। তিন দিন ভিজে থাকার পর কার্গোটি তোলা হলেও বিষ পানিতেই থেকে যাবে। উঠবে কেবলমাত্র কয়লা। কয়লার রাসায়নিক পদার্থ সব পানিতেই মিশে থাকবে। এই রাসায়নিক উপাদানগুলো পানি থেকে মাটিতে সহজেই জমে যাবে। কয়লা পানির সংস্পর্শে যাওয়ার পরই এর রাসায়নিক পদার্থ দ্রুত পানিতে মিশে যায়। যা পানির সঙ্গে ছড়াতেই থাকে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, ‘কয়লায় সিসা, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, পারদ ও আর্সেনিক থাকে বেশি মাত্রায়। যা মারাত্মক ক্ষতিকর পদার্থ। এর সামান্য পরিমাণও জলজপ্রাণীর মধ্যে গেলে ক্ষতি হবে। এই বিষযুক্ত জলজপ্রাণী খেলে মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এগুলো মাটিতে মিশে মাটির গুণগুণ নষ্ট করবে। কোনও কিছুতে লাগলে তাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এগুলো পানির সঙ্গে ছড়াবে। মাটিতেও দ্রুত মিশে যাবে। মাটি এগুলোকে শুষে নেবে। এই মাটিতে অঙ্কুরোদগম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বংশ বিস্তারের ভ্রূণ নষ্ট হবে। এ ক্ষতি অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি এবং ক্ষতির হার বেশি। কয়লার রাসায়নিক পদার্থ পানি, মাটি সর্বত্র মিশবে এবং ছড়াবে। এর সামান্যতম অংশও মানুষের দেহে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
তিনি বলেন, ‘হারবাড়িয়া এলাকা ইরাবতী ডলফিনের বিচরণ ক্ষেত্র। কয়লামিশ্রিত পানির সংস্পর্শে এলে এ প্রাণীটির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া এ সময় কুমিরের প্রজনন মৌসুম হওয়ায় ঠিকমতো ডিম নাও ফুটতে পারে। তাই এ দুর্ঘটনা ডলফিন ও কুমিরের জীবনচক্রে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি জলজ ও বনজপ্রাণীর ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। মাছসহ অন্যান্য প্রাণী ভেতর থেকে আক্রান্ত হবে। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই বিষ খাদ্যচক্রে যুক্ত হবে। জলজ প্রাণীর প্রজনন হুমকিতে পড়বে। মাটিতে মিশে গুণাগুণ নষ্ট করবে। কয়লা বিষে আক্রান্ত মাছ খাওয়া ডলফিন, কুমিরসহ সব প্রাণীর দেহে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ প্রবেশ করবে। জলজ ও বনজ প্রাণী মরে পচে থাকবে। যা সাদা চোখে বোঝা যাবে না। এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।’
জলজপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর পণ্যসহ কার্গোডুবি প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘২০০৭ সালের শুরুতে কয়রার কাছে ফ্লাই অ্যাশসহ একটি কার্গো ডুবেছিল। ফ্লাই অ্যাশে কয়লার রাসায়নিক পদার্থের অধিকাংশই উপস্থিত থাকে। ২০১৫ সালের শুরুতে শরণখোলা এলাকায় এমওপি সার নিয়ে একটি কার্গো ডুবেছিল। এমওপি সার লাল রংয়ের। যা গাছের জন্য ক্ষতিকর না। কিন্তু অতিমাত্রায় হলে তা ক্ষতিকর হতে পারতো। কিন্তু জলজপ্রাণীর জন্য হুমকি।’
এদিকে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে মোংলা বন্দরের পশুর নদীতে ডুবে যাওয়া কয়লাবোঝাই কার্গো জাহাজ ১ মার্চও উদ্ধার হয়নি। এ বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ মুসা জানান, ২ মার্চ কার্গোটি উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হবে। এজন্য বরিশাল থেকে একটি উদ্ধারকারী ক্রেন রওনা হয়েছে। মংলা বন্দরের হারবার মাস্টার কমান্ডার ফখরউদ্দিন জানান, কার্গোটি কার্গোটি পশুর চ্যানেলের মূল চ্যানেলের বাইরে ডুবেছে। ফলে নৌযান চলাচলে মূল চ্যানেল নিরাপদ রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের গত ১৫ এপ্রিল ভোর রাতে ৭৭৫ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে হারবাড়িয়া ৫ ও ৬ নং বয়ার মধ্যবর্তী স্থানে এমভি বিলাস নামে লাইটার ডুবোচরে আটকে কাত হয়ে ডুবে যায়। এ দুর্ঘটনার পর বন্দর কর্তৃপক্ষের উদ্ধারকারী নৌযান ও একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও উদ্ধার কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যেই এ ঘটনায় মংলা থানায় তিনটি সাধারণ ডায়রি (জিডি) করা হয়েছে। কয়লা মালিক, কার্গো পক্ষ ও বন বিভাগ থেকে জিডি তিনটি করা হয়। মংলা বন্দরের হারবার বিভাগ থেকে কার্গো মালিককে উদ্ধার তৎপরতা শুরুর আহ্বান জানিয়ে চিঠিও দেওয়া হয়। তাতে ১৫ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এরপর কার্গোটি বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতায় চলে যাবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে হিরণপয়েন্ট ফেয়ার বয়ার কাছে কয়লাবোঝাই এমভি আইচগাতি ডুবির ঘটনা ঘটে। সে ঘটনায়ও মংলা থানায় দুটি জিডি করা হয়। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিকালে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের শ্যালা নদীর ‘হরিণটানা’ বন টহল ফাঁড়ির কাছে ১২৩৫ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে ‘এমভি সী হর্স-১’ ডুবে যায়। ২০১৫ সালের ২৭ অক্টোবর বিকালে মংলা বন্দরের হারবাড়িয়া ৩ থেকে ৫১০ মেট্রিক টন কয়লা নিয়ে যশোরের উদ্দেশে ছেড়ে আসা মিনি কার্গো জিয়া রাজ রাত ৮টার দিকে মংলা বন্দরের পশুর চ্যানেলের জয়মনিরঘোল এলাকার সাইলোর অদূরে ডুবে যায়। এ ঘটনায় বন কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বাদী হয়ে ২৮ অক্টোবর কার্গো মালিক দিখ খান ওরফে হোসাইন খান ও মাস্টার ভুলু গাজীর নামে মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় ৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করা হয়। এরপর পুলিশ মাস্টার ভুলু গাজীকে গ্রেফতার করে এবং ২৯ অক্টোবর জেল হাজতে পাঠায়। বন বিভাগের তদন্তে মাস্টার ও চালকের গাফিলতির কারণে কার্গোডুবি হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়ছিল। বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন