এই বছর আলোচনায় ছিল যেসব ঘটনা

আপডেট: 03:59:37 27/12/2019



img
img

কাদির কল্লোল

অনেক ঘটনাপ্রবাহের সাক্ষী হয়েছে ২০১৯ সাল। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর টানা তৃতীয় বারের মতো আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে বছরের শুরুতে।
একটি অগ্নিকাণ্ডেই ৭০ জনের বেশি মানুষের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
অন্যদিকে ফেনীতে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে হত্যার ঘটনা আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।
ক্যাসিনো-বিরোধী অভিযান এবং পেঁয়াজের দামের ঝাঁঝ নিয়েও তোলপাড় হয়েছিল।
বছরের শেষে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল রাজাকারের তালিকা।

টানা তৃতীয় দফায় আওয়ামী লীগের সরকার গঠন
নির্বাচন ও তার ফলাফল নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের মধ্যে শুরু হয়েছিল ২০১৯ সাল।
মাত্র সাতটি আসন পেয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গণফোরাম এবং বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের রাজনৈতিক সব হিসাব নিকাশ পাল্টে গিয়েছিল।
তবে নির্বাচন নিয়ে অনেক প্রশ্ন এবং নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন করার নানান অভিযোগের মুখে আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করে।
টানা তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন শেখ হাসিনা। ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ তাকে এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ বাক্য পাঠ করান।
তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু এবং মতিয়া চৌধুরীর মতো আওয়ামী লীগের পুরনো রাজনীতিকরা এবং জোটের শরিকদের কেউ জায়গা পাননি এই মন্ত্রিসভায়।
বেশির ভাগ নতুন মুখ নিয়ে গঠিত এই মন্ত্রিসভা তখন নির্বাচন ঘিরে আলোচনাকে ছাপিয়ে দক্ষতা-অদক্ষতার প্রশ্নে ভিন্ন আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
মানবাধিকার কর্মী এবং বিশ্লেষক সুলতানা কামাল বলছিলেন, সরকার কোনো প্রশ্ন বা বক্তব্য আমলে না নিয়ে নিজেদের মতো করে চলেছে এবং তার নেতিবাচক প্রভাবটাই বেশি পড়ছে।
"যেহেতু নির্বাচনটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। তার ফলে সরকার গঠনের পর যে প্রবণতাটা তাদের মধ্যে দেখা গেছে, সেটা হচ্ছে, তারা নিজস্ব ভঙ্গিতে এবং নীতিতে সরকার চালিয়ে গেছে। সেখানে কিছু ভালো ফল হয়তো পাওয়া গেছে। কিন্তু জবাবদিহিতার জায়গাটা বিলুপ্ত হয়েছে।"

জাতীয় পার্টির বিরোধী দলে বসা
একাদশ জাতীয় সংসদ গঠিত হয় ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। শিরীন শারমিন চৌধুরীই আবার স্পিকার নির্বাচিত হন।
তবে বিগত দশম সংসদে আওয়ামী লীগের শরিক জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে বসেছিল এবং মন্ত্রিসভাতেও ছিল।
এবার জাতীয় পার্টি থেকে কাউকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়নি। জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ হয়েছিলেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা।

চুড়িহাট্টায় আগুন
২০১৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে যখন ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে শহীদমিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের আয়োজন চলছিল, সে সময়ই পুরনো ঢাকার চকবাজারে চুড়িহাট্টা এলাকায় ভায়বহ অগ্নিকাণ্ডে ৭০ জনের বেশি নিহত হয়।
অতীতে পুরনো ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম বা এর ব্যবসা সরানো নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও চুড়িহাট্টায় চারতলা একটি ভবনে থাকা রাসায়নিক গুদাম থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল।
ঘিঞ্জি সেই এলাকায় আশেপাশের ভবনে রাসায়নিক গুদাম থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল এবং মারাত্মক রূপ নিয়েছিল। সেদিন বেঁচে যাওয়া স্থানীয় একজন বাসিন্দার বক্তব্য ছিল, সেই ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর মিছিল বা ভয়াবহতা তারা মেনে নিতে পারছিলেন না।

নুসরাত হত্যা এবং রায়
দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল দুটি হত্যাকাণ্ড। এর একটি ঘটেছিল ফেনীতে মাদরাসায় এবং অন্যটি হয়েছে ঢাকায় বুয়েটে।
ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহানের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল ৬ এপ্রিল। চারদিন পর ১০ এপ্রিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার সাত মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ২৪ অক্টোবর স্থানীয় আদালতে বিচার শেষ হয়েছে। বিচারিক আদালতে মাদরাসার অধ্যক্ষসহ আসামি ১৬ জনেরই ফাঁসির রায় দেওয়া হয়েছে। সেই রায়ের পর তখন প্রতিক্রিয়ায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসা সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি দাবি করেন, আইনগত পরের প্রক্রিয়াগুলো যেনো দ্রুত হয়।

বুয়েটে আবরার হত্যা
আবরার ফাহাদকে হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন।
বুয়েটের শেরেবাংলা আবাসিক হল থেকে আবরার ফাহাদের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল ৭ অক্টোবর। তাকে রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পিটিয়ে বা নির্যাতন চালিয়ে হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছিল ২৫ জনের বিরুদ্ধে।
এই অভিযুক্তদের বেশিরভাগই বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিলেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে বুয়েট প্রায় এক মাস সময় ধরে অচল ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ওই বিশ্ববিদ্যারয়ে ছাত্ররাজনীতিই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অবশ্য ঘটনার মাসখানেক পরেই পুলিশ মামলার ২৫ জনকেই অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছে।
আবরার ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুন তখন প্রতিক্রিয়ায় দ্রুত বিচার দাবি করেছেন।

২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচন
দীর্ঘ সময় পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাপক উৎসাহের মাঝে নানা শংকাও ছিল।
তবে এই নির্বাচনে মেরুকরণটা ছিল ভিন্ন রকম।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছিল কোটা পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে আন্দোলনকারীদের ফোরাম।
সেই আন্দোলনে নেতা হিসেবে পরিচিত সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রার্থী নুরুল হক ছাত্রলীগের সে সময়ের সভাপতি রেজওয়ানুল হককে হারিয়ে ডাকসু'র ভিপি নির্বাচিত হন।
তবে ডাকসু'র জিএস'সহ অন্য পদগুলোতে ছাত্রলীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন।
ডাকসু এবং হলগুলোর সংসদেও কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারীদের সঙ্গেই ছাত্রলীগের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে।
ছাত্রসংগঠনের বাইরে কোনো ফোরামের মুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকার বিষয়কে বিশ্লেষকরা একটা নজির হিসেবে দেখেন।
ডাকসু'র নির্বাচন নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিল ছাত্রলীগের বিরোধীরা।
শেষপর্যন্ত নির্বাচিত ভিপি নুরুল হকসহ বিভিন্ন সংগঠন ফলাফল মেনে নেয়।

ডাকসুর ভিপির ওপর বছরের শেষেও হামলা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর ভিপি নুরুল হকের ওপর ২২ ডিসেম্বর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় নুরুল হকসহ কমপক্ষে ছয়জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলে।
২০১৯ সালেই এরআগেও কয়েকবার নুরুল হকের ওপর হামলার অভিযোগ আলোচনায় এসেছিল।
সুলতানা কামাল মনে করেন, সরকারের সামনে যেহেতু বিরোধী দলের কোনো চ্যালেঞ্জ নেই, সেকারণে সরকার সমর্থকরা এ ধরনের বিভিন্ন ঘটনা ঘটাচ্ছে।

ক্যাসিনো-বিরোধী অভিযান : বিভিন্ন সংগঠনে আতংক
নানা ইস্যুর মাঝে ক্যাসিনো-বিরোধী অভিযান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল।
ছাত্রলীগের শীর্ষ দুইজন নেতাকে চাঁদাবাজির অভিযোগে সরিয়ে দেওয়ার পর সরকার সিদ্ধান্ত নিয়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করেছিল ৪ সেপ্টেম্বর।
সেই অভিযানে একের পর এক ক্লাব বা ক্রীড়া সংস্থায় অবৈধ ক্যাসিনো-বাণিজ্য ধরা পড়ে। ঢাকার এসব ক্লব বন্ধ হয়ে থাকে লম্বা সময় ধরে।
আওয়ামী লীগের সহযোগী যুবলীগের ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটসহ সংগঠনটির বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
কৃষকলীগ এবং সেচ্ছ্বাসেবকলীগেরও কয়েকজন ধরা পড়ে।
ফলে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের অনেকের মাঝে এই অভিযান নিয়ে একটা ভয় তৈরি হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের নেতাদের অনেকে এটাকে তাদের দলের নেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নিজেদের সংগঠনগুলোতে শুদ্ধি অভিযান বলে বর্ণনা করে আসছিলেন।
তখন আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছিলেন, তাদের দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী আলোচনা করেছেন এবং তার ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়।
ক্লাবগুলোতে এবং বিভিন্ন ব্যক্তির বাড়িতে এই অভিযানে লাখ লাখ টাকাও উদ্ধার করা হয়েছিল।
আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরের বাইরে কীভাবে এসব ক্যাসিনো চলেছে- এই প্রশ্নও অনেকে তোলেন।

পেঁয়াজের বাজার নিয়ে হুলুস্থুল
অক্টোবরের শেষে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশে এর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে এবং এনিয়ে হুলুস্থুল লেগে যায়।
প্রতি কেজি পেঁয়াজ আড়াইশ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হতে দেখা যায়।
পেঁয়াজের ঝাঁঝ সামলাতে সরকারের পক্ষ থেকে টিসিবি ঢাকা নগরীর রাস্তায় রাস্তায় এবং দেশের বিভিন্ন এলাকায় ট্রাকে করে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি শুরু করে।
পেঁয়াজ বিক্রির এই ট্রাকগুলোকে ঘিরেও ক্রেতাদের ভিড় থাকতো চোখে পড়ার মতো।
দাম বেশি হওয়ায় ক্ষেত থেকে পেঁয়াজ চুরি হতে পারে, এই ভয়ে দেশের অনেক এলাকায় কৃষকদের জমি পাহারা দেওয়ার ঘটনাও খবর হয়েছে।
লম্বা সময় ধরে পেঁয়াজের ঊর্ধ্বমুখী বাজারের প্রেক্ষাপটে অনেকে এর ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছিলেন। রান্নায় পেঁয়াজ বাদ দেওয়া বা না খাওয়া—এমন বক্তব্য নিয়েও আলোচনা হয়।
সে সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গিয়ে পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং তা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল।

জেনারেল এরশাদের মৃত্যু
সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন গত ১৪ জুলাই।
মৃত্যুর সময় তিনি সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন।
তিনি নয় বছর ক্ষমতায় ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানে তার সরকারের পতন হয়েছিল ১৯৯০ সালের শেষে।
এরপরও প্রায় তিন দশক ধরে তিনি বাংলাদেশের ক্ষমতা এবং ভোটের রাজনীতিতে নিজেকে প্রাসঙ্গিক রাখতে পেরেছিলেন।
ফলে তার মৃত্যু নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় ছিল।
৯০ বছর বয়সে জেনারেল এরশাদের মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি এবং দল জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ কী দাঁড়াবে- তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে।
যদিও তার মৃত্যুর পর পরই তার ভাই জি এম কাদের দলের নেতৃত্বে এসেছেন।

রাজাকারের তালিকা নিয়ে তোলপাড়
বছরের শেষটা ছিল রাজাকারের তালিকা নিয়ে ক্ষোভ-প্রতিবাদ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর এবার বিজয় দিবস উদযাপনের আগে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় রাজাকার-আলবদরসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা প্রকাশ করে।
সেই তালিকায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ট্রাইবুনালের প্রধান আইনজীবীসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার নাম আসায় এনিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় হয়।
প্রয়াত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা প্রতিবাদে নেমেছিলেন।
তারা এমন তালিকা তৈরির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে তাদের শাস্তি দাবি করেন।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তালিকা স্থগিত করা হয়। তবে এনিয়ে বিতর্কের জের রয়ে যায়।
সূত্র : বিবিসি